
মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি: মানিকগঞ্জের আরিচা নদী বন্দরের আওতাধীন ফোরশোর ভূমিতে পাটুরিয়া ফেরিঘাট এলাকার ১নং ও ২নং ঘাট দখল করে অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে বালু ও মাটির ব্যবসা। অবৈধ এই বালু ব্যবসার কারণে দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে ঘাটের গুরুত্বপূর্ণ দুইটি ফেরিঘাট। তবে এ অভিযোগ মানতে নারাজ কর্তৃপক্ষ।
জানা যায়, যমুনা সেতু চালু হওয়ার পর ২০০২ সালে ফেরিঘাট আরিচা থেকে পাটুরিয়ায় স্থানান্তর করা হয়। তখন পাটুরিয়া ঘাটে গাড়ির অতিরিক্ত চাপ থাকার কারণে তৎকালীন সরকার বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে ২১ জেলার প্রবেশদ্বার খ্যাত পাটুরিয়া এলাকায় পাঁচটি ঘাট তৈরি করে। তখন থেকেই ব্যস্ততম এলাকায় পরিণত হয় ঘাট এলাকা। গড়ে ওঠে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।
সেইসময় ওই এলাকার কিছু প্রভাবশালী মহল একটি শক্তিশালী চক্র তৈরি করে। সেই চক্রের মাধ্যমে ফোরশোর ভূমিতে অবৈধভাবে গড়ে তোলে বালু ও মাটির ব্যবসা। পদ্মা ও যমুনা নদী থেকে কোটি কোটি ঘনফুট বালু উত্তোলন করে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করে হাতিয়ে নয় লাখ লাখ টাকা। এসব বালু ব্যবসায়ীদের দখলের কারণে বছরের পর বছর ধরে ওই দুইটি ফেরি ঘাট দিয়ে চলাচল করতে পারছে না কোনো যানবাহন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পাটুরিয়া ঘাট এলাকার ১নং ও ২নং ফেরিঘাট এলাকা দীর্ঘদিন ধরে দখল করে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী বালু উত্তোলন করে ফোরশোর জায়গায় স্তূপ করেছে। দিন রাত ধরে পরিবহন করছে সেসব বালু। এই কর্মকাণ্ডের কারণে ওই ঘাটে কোনো যানবাহন যাতায়াত করতে পারে না। অধিক সময় ধরে ঘাটে যানবাহন চলাচল না করায় পন্টুন থেকে সংযোগ সড়কের উচ্চতা প্রায় পাঁচ ফুট উঁচু হয়ে আছে। আর সেখানে বিভিন্ন প্রজাতির আগাছা দিয়ে ভরে গেছে।
বিআইডব্লিউটিএর অফিস সূত্রে জানা যায়, সরকার ১৯৫৮ সালের অর্ডিন্যান্স মোতাবেক ১৯৮৩ সালে এক গেজেটের মাধ্যমে অন্যান্য নদী বন্দরের ন্যায় আরিচাকে নদীবন্দর ঘোষণা করে এবং বিআইডব্লিউটিএকে বন্দর সংরক্ষক নিযুক্ত করে। সেই মতে বিআইডব্লিউটিএ দ্যা পোর্ট অ্যাক্ট, ১৯০৮ এবং দ্যা পোর্ট রুলস, ১৯৬৬ অনুযায়ী বন্দর সীমানাভুক্ত এলাকার যাবতীয় কার্যক্রম বিআইডব্লিউটিএর এখতিয়ারভুক্ত। কর্তৃপক্ষের পূর্ব অনুমোদন ব্যতীত বন্দর সীমানার মধ্যে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বালু-মাটি উত্তোলন স্তূপীকরণ অথবা স্থাপনা নির্মাণ কিংবা অন্য কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করার এখতিয়ার নেই।স্থানীয়রা জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শিবালয় উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুর রহিম খান, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান রেজাউর রহমান খান জানু, শিবালয় ইউপি চেয়ারম্যান আলাল উদ্দিন আলাল, আরোয়া ইউপি চেয়ারম্যান মাসুম, শ্রমিক লীগ নেতা মিলন কাজী, রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ পৌরসভার সাবেক মেয়র নজরুল ইসলাম মণ্ডল দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করে আসলেও আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সেই ব্যবসার হাল ধরেছেন মিলন কাজীর ছোট ভাই আরিফ কাজী, মনতাজ মাস্টার, জসিম খান, ঠান্ডু কাজী, রবীন ও সুজন।
স্থানীয় বাসিন্দা লাভলু খান বলেন, ২০০২ সালে পাটুরিয়া ঘাট তৈরি করা হয়। তখন থেকেই ১নং ও ২নং ফেরিঘাট ব্যবহার করা হয় না। এর মধ্যে এক বছর ২নং ফেরি ঘাট কিছু দিন ব্যবহার করা হয়েছিল। তাছাড়া আমরা কোনোদিন দেখিনি এই ঘাট দিয়ে গাড়ি যাতায়াত করেছে।
সেলফি পরিবহনের স্টাফ দীলিপ সরকার বলেন, আমি সাত বছর ধরে পাটুরিয়া ঘাটে নিয়মিত যাতায়াত করি। ১নং ও ২নং ফেরিঘাট দিয়ে গাড়ি কখনো যাতায়াত করতে দেখিনি।
এ বিষয়ে বালু ব্যবসায়ী চক্রের প্রধান আরিফ কাজী বলেন, ওই জায়গার মালিকানা নিয়ে হাইকোর্টে রিট করা হয়েছে। দুইটি শুনানি হয়েছে। ১নং ঘাট এখনো উদ্বোধন করা হয়নি। আর ২নং ফেরিঘাট প্রয়োজন হয় না। পাটুরিয়া ঘাটে যে ঘাটগুলো সচল আছে সেই ঘাটগুলোতেই গাড়ির অপেক্ষায় ফেরি বসে থাকে।
চক্রের আরেক সদস্য মুনতাজ মাস্টার বলেন, আমি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত না। শিমুলিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আওয়াল ও লিটনকে লিখিতভাবে দিয়ে দিয়েছি। এখন তারাই ব্যবসা করছেন। শিমুলিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আওয়াল বলেন, আগে ব্যবসা করতাম,এখন ওই বালু ব্যবসার সঙ্গে আমি নেই। এইখানে তিন থেকে চারজন ব্যবসা করে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) পাটুরিয়া ঘাটের সহকারী ব্যবস্থাপক রুবেলুর জামান বলেন, এক নম্বর ঘাটে নাব্য সংকট আছে, ওই ঘাটে ফেরি ঢুকতে পারে না। দুই নম্বর ঘাটটিতে আমাদের কিছু জটিলতা আছে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) বন্দর ও পরিবহন বিভাগের আরিচা নদীবন্দরের উপপরিচালক মো. সেলিম শেখ বলেন, পাটুরিয়া ফেরি ঘাটের ১নং ও ২নং বন্ধ না। যেকোনো সময় চালু হবে। আমাদের ৩, ৪ ও ৫নং ফেরিঘাটে অপারেশন চলে। আর গত এক সপ্তাহ আগে একটি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। তিনটি ড্রেজার আটক করা হয়েছে। সেগুলো আরিচা ঘাটে রাখা আছে এবং ১৮ জনকে আটক করে মামলা দেওয়ার জন্য নৌপুলিশের কাছে দেওয়া হয়েছে।
বিআইডব্লিউটিসির উপমহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) নাসির মোহাম্মদ চৌধুরী বলেন, এক নম্বর ও দুই নম্বর ঘাট বন্ধ না। আমাদের ওইখানে ফেরি আছে। প্রয়োজন হয় না, এজন্য অপারেশন করি না। আমাদের তিন ঘাট থেকে অপারেশন নিশ্চিত হয় দেখে ওইখানে যাই না। ওইখানে গেলে আমাদের খরচ বেড়ে যায়।




