
শুরুটা হয়েছিল এক মাদক ব্যবসায়ীকে দিয়ে। ২০শে আগস্ট মাদক ব্যবসায়ী মিলান শরীফকে বিদেশি মদ ও বিয়ারসহ গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ। এ সময় তার গাড়িতে তল্লাশি করে একটি অস্ত্রের লাইসেন্স পান ডিবি’র অভিযানিক টিমের সদস্যরা। পরে তার বাসায় অভিযান চালিয়ে ৪৪ রাউন্ড গুলিসহ একটি পিস্তল পাওয়া যায়। ওই পিস্তলটি ছিল অত্যাধুনিক। মিলান শরীফের অস্ত্রের লাইসেন্সের বিবরণের সঙ্গে ওই পিস্তলের কোনো মিল খুঁজে পাননি ডিবি সদস্যরা। তাদের সন্দেহ বাড়ায় মোহাম্মদপুর থানায় একটি জিডি করে ডিবি। আদালতের নির্দেশেই তদন্তও শুরু করে ডিবি।
তার পরের তথ্য রীতিমতো ভয়ঙ্কর। বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে গোয়েন্দারা জানতে পারেন মাদক ব্যবসায়ী মিলান শরীফের কাছ থেকে যে পিস্তল উদ্ধার হয়েছে সেটি মোটেও সাধারণ পিস্তল নয়। ইসরাইলে তৈরি সেমি অটোমেটেড এই উজি পিস্তলটি মিলিটারি গ্রেডের। বিভিন্ন দেশের সামরিক বাহিনীর সদস্যরা পিস্তলটি ব্যবহার করেন। বেলজিয়ামের আর্মড ফোর্স এবং ইসরাইলের ডিফেন্স ফোর্সে পিস্তলটির বেশি ব্যবহার হয়। এটি বেসামরিক মানুষের হাতে থাকার কথা না। দেশের অস্ত্র আমদানিকারকরা মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে এই অস্ত্র আমদানি, মজুত ও বিক্রি করছেন।
গোয়েন্দা সূত্র বলছে, মিলিটারি গ্রেডের পয়েন্ট টুটু বোরের অত্যাধুনিক ইসরাইলি উজি পিস্তল শুধু ওই মাদক ব্যবসায়ীর কাছে নয়। এরকম আরো অনেক পিস্তল রয়েছে সারা দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে। কারণ মিথ্যা ঘোষণায় আমদানি করা ১১১টি উজি পিস্তল ও রাইফেলের মধ্যে ৫৩টি ইতিমধ্যে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান বিক্রি করে দিয়েছে। এসব অস্ত্র এখন সারা দেশের বিভিন্ন জেলার বেসামরিক মানুষ ও অপরাধীদের হাতে পৌঁছে গেছে। উজি পিস্তল বিভিন্ন দেশের সামরিক বাহিনীর সদস্যরা ব্যবহার করলেও হালে বাংলাদেশের বেসামরিক মানুষ এসব অস্ত্র ব্যবহার করে নানা অপকর্ম করছে। সম্প্রতি গোয়েন্দারা এমন তথ্য পেয়ে নড়েচড়ে বসেছেন। বেসামরিক মানুষের কাছে এসব অস্ত্র পৌঁছে যাওয়ায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠাও বেড়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন উজি পিস্তলগুলো কারা কিনেছেন এই তথ্য বের করে সেগুলো বাজেয়াপ্ত করা দরকার। কারণ বড় সন্ত্রাসী বা জঙ্গিদের কাছে এই মারণাস্ত্রটি থাকলে যেকোনো সময় বড় বিপর্যয় আসতে পারে।
এদিকে বিক্রি হওয়া পিস্তলগুলো কার কার হাতে আছে তার সন্ধান করছে গোয়েন্দা সংস্থা। ইতিমধ্যে আমদানিকারক ছয়টি প্রতিষ্ঠানের নথি থেকে বিক্রি হওয়া উজি পিস্তলের মালিকদের খোঁজ মিলেছে। ঢাকার বাইরের অনেক ক্রেতা উজি পিস্তল কিনেছেন। কিছু অস্ত্র ব্যবসায়ীও আমদানিকারকদের কাছ থেকে উজি পিস্তল কিনেছেন। গোয়েন্দারা এখন এই ক্রেতাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক স্ট্যাটাসের খোঁজখবর নিচ্ছেন। বিস্তারিত জানার জন্য বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের নথিতে দেয়া তাদের ঠিকানায় চিঠি দিয়ে পিস্তল ও রাইফেলের ৫৩ জন ব্যবহারকারীকে তলব করেছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। একজন মালিক ডিবি কর্তৃক গ্রেপ্তার হয়ে জেলহাজতে আছে। এসব মারণাস্ত্রের মালিকদের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট জেলার পুলিশ সুপারকেও অবগত করা হচ্ছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশ আসলে ভয়ঙ্কর এই মারণাস্ত্রের বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন গোয়েন্দারা।
গোয়েন্দা সূত্র বলছে, দেশের অস্ত্র আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো উজি রাইফেলের ঘোষণা দিয়ে উজি পিস্তল কাস্টমস থেকে খালাস করেছে। আমদানি নথিতে উজি রাইফেলের কথা উল্লেখ করা হলেও আসছে উজি পিস্তল। কাস্টমস থেকে অস্ত্র খালাসের সঙ্গে জড়িতরা অস্ত্র বিশেষজ্ঞ না হওয়াতে আমদানিকারকরা এসব অস্ত্র দেশে এনে মজুত করে বিক্রি করছেন। এক্ষেত্রে কাস্টমসের অসাধু কর্মকর্তারা জড়িত থাকতে পারেন বলেও আশঙ্কা করছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।
মহানগর গোয়েন্দা সংস্থার (ডিবি) তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) গোলাম মোস্তফা রাসেল মানবজমিনকে বলেন, রাইফেলের কথা বলে ইসরাইলি এসব পিস্তল দেশে আনা হয়েছে। মিলিটারি গ্রেডের এসব অস্ত্র সাধারণ মানুষের ব্যবহার করার কথা না। কিন্তু আমদানিকারক ছয়টি প্রতিষ্ঠান পিস্তল ও রাইফেল মিলিয়ে ৫৩টি অস্ত্র বিক্রি করে দিয়েছে। এসব অস্ত্রের ক্রেতা ঢাকার বাইরেও রয়েছে। আমরা আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে ৫৩ জন মালিককে চিঠি দিয়ে তলব করেছি। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট জেলার পুলিশ সুপারকেও অস্ত্রের মালিকদের বিষয়ে অবগত করেছি। তিনি বলেন, আমরা জানার চেষ্টা করছি যারা এসব অস্ত্র কিনেছে তারা কোন পেশার লোক, তাদের স্ট্যাটাস কী। এসব বিষয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আমরা পুলিশ সদর দপ্তরের মাধ্যমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করেছি।
উজি পিস্তল যেমন: উজি পিস্তল পয়েন্ট টুটু বোরের অত্যাধুনিক একটি পিস্তল। সেমি- অটোমেটেড এই পিস্তলে ২০ রাউন্ডের দু’টি ম্যাগাজিন আছে। উজি পিস্তল ও উজি রাইফেলের মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। এই অস্ত্র দু’টির স্পেয়ার পার্টস, ওজন ও দৈর্ঘ্য ছাড়া আরো অনেক ক্ষেত্রেই পার্থক্য। মিলিটারি গ্রেডের উজি পিস্তল বিভিন্ন দেশের সামরিক বাহিনীর সদস্যরা ব্যবহার করেন। বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে এমন ম্যাগাজিনের ধারণক্ষমতার অস্ত্র নাই। দেশে সর্বোচ্চ ১৫ রাউন্ড ধারণক্ষমতার পিস্তল আছে। উজি পিস্তলটি তৈরি হয়েছে ইসরাইলে। মিথ্যা ঘোষণায় উজি রাইফেলের কথা বলে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান পিস্তলটি দেশে এনেছেন। চালানটি এসেছে জার্মানি হয়ে। গোয়েন্দারা মনে করছেন, এই মারণাস্ত্রটি বেসামরিক মানুষের কাছে থাকলে এটি ব্যবহার করে তারা বড় ধরনের অপকর্মে লিপ্ত হতে পারে। ইতিমধ্যে এক মাদক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে গুলিসহ একটি উজি পিস্তল উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্বেগের কারণ হচ্ছে, জঙ্গি গোষ্ঠীদের কাছে উজি পিস্তল পৌঁছে গেলে যেকোনো সময় বড় বিপদ আসতে পারে। বিষয়টি শুধু সাধারণ মানুষের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরাপত্তার জন্যই প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যারা আমদানি করেছে: গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, দেশে বৈধ অস্ত্র ব্যবসার প্রতিষ্ঠান রয়েছে ৮৪টি। এরমধ্যে ঢাকায় রয়েছে ৩২টি প্রতিষ্ঠান। দেশের ১৪টি প্রতিষ্ঠানের বিদেশ থেকে সরাসরি অস্ত্র আমদানি করার অনুমতি রয়েছে। তারমধ্যে ১২টি প্রতিষ্ঠানই ঢাকায় আছে। এই ১২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছয়টি প্রতিষ্ঠান ১১১টি উজি পিস্তল ও রাইফেল আমদানি করেছে। পাঁচটি প্রতিষ্ঠান আমদানি করেছে ৯১টি উজি পিস্তল। আর একটি প্রতিষ্ঠান আমদানি করেছে ২০টি উজি রাইফেল। আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- এমএইচ আর্মস কোং, মঈন আর্মস কোং, আহম্মদ হোসেন আর্মস কোং, মেসার্স তোফাজ্জল হোসেন, কে আহমদ আর্মস অ্যান্ড কোং এবং শফিকুল ইসলাম আর্মস অ্যান্ড কোং। ডিবি পুলিশের হাতে জব্দকৃত উজি পিস্তলটি এমএইচ আর্মসের। আর মঈন আর্মসই শুধু উজি রাইফেল আমদানি করেছে। গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, এমএইচ আর্মস কোং সবচেয়ে বেশি ৫০টি পিস্তল আমদানি করেছে। এরমধ্যে ২৩টি পিস্তল বিক্রি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। মঈন আর্ম কোং ১০টি উজি পিস্তল ও ২০টি উজি রাইফেল আমদানি করেছে। আমদানি করা ১০টি পিস্তলই বিক্রি করেছে তারা। আর ২০টি রাইফেলের চারটি বিক্রি হয়েছে। আহম্মদ হোসেন আর্মস কোং এবং মেসার্স তোজাম্মেল হোসেন যৌথভাবে ২০টি উজি পিস্তল আমদানি করেছে। এরমধ্যে ৯টি বিক্রি করেছে তারা। কে আহমদ আর্মস অ্যান্ড কোং ৫টি উজি পিস্তল আমদানি করে সবক’টি বিক্রি করেছে। শফিকুল ইসলাম আর্মস অ্যান্ড কোং ৬টি উজি পিস্তল আমদানি করে দু’টি বিক্রি করেছে। সাড়ে তিন থেকে সাড়ে চার লাখ টাকায় প্রতিটি উজি পিস্তল বিক্রি করা হয়।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে যা বলা হয়েছে: উজি পিস্তলের বিষয়ে বিস্তর তথ্য পাওয়ার পর অস্ত্র নিয়ে কাজ করেন এমন গোয়েন্দাদের দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে। তারা এ বিষয়ে ইতিমধ্যে নানা তথ্য সংগ্রহ করেছেন। বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েই মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি টিম পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য পুলিশ সদর দপ্তর হয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদনটি জমা দিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেমি অটোমেটেড অস্ত্রটি মিথ্যা ঘোষণায় আমদানি করে সাধারণ মানুষের কাছে বিক্রি করায় এটি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে। মাদক ব্যবসায়ীরা এই অস্ত্র প্রকাশ্যে প্রদর্শন করে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। জঙ্গিদের হাতে পিস্তলটি গেলে নিরাপত্তা হুমকি হতে পারে। আমদানি নথিতে পয়েন্ট টুটু বোরের রাইফেলের বিষয় উল্লেখ থাকলেও অস্ত্রের ধরন সুস্পষ্ট নয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ঢাকা কাস্টমস হাউস ও জেলা প্রশাসনে কোনো অস্ত্র বিশেষজ্ঞ না থাকায় এবং আমদানির আগে বিশেষজ্ঞ মতামত না নেয়ায় অস্ত্র ব্যবসায়ীরা উজি পিস্তলকে উজি রাইফেল ঘোষণা দিয়ে আমদানি, মজুত ও বিক্রি করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ছাড়া জনসাধারণের নিকট এ ধরনের অত্যাধুনিক অস্ত্র থাকলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে কয়েকটি সুপারিশও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, অস্ত্রের লাইসেন্সে ক্যালিবারের পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট ধরন থাকা প্রয়োজন। পিস্তল অথবা রাইফেল উল্লেখ করলেও ম্যাগাজিন ক্যাপাসিটি সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন। নিরাপত্তা বাহিনীর অস্ত্র বিশেষজ্ঞ যৌথ মতামতের ভিত্তিতে বৈধ অস্ত্র সংক্রান্ত আইন যুগোপযোগী করা। ইতিমধ্যে আমদানি ও বিক্রয় হওয়া এসব অস্ত্র বাজেয়াপ্ত করা। কাস্টমস থেকে অস্ত্রের চালান খালাসের ক্ষেত্রে অস্ত্র বিশেষজ্ঞের উপস্থিতি ও পরিদর্শনের বাধ্যবাধকতা থাকা উচিত। লাইসেন্স আবেদনকারীর সামাজিক মর্যাদা, পেশা ইত্যাদি বিষয় যাচাইয়ে আরো বেশি সচেতন হওয়া প্রয়োজন।
ওদিকে গোয়েন্দা সূত্র বলছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উজি পিস্তলটি বাজেয়াপ্ত করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া বিপজ্জনক কারো কাছে এই পিস্তলটি থাকলে তার অস্ত্রের লাইসেন্স বাজেয়াপ্ত করার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। পিস্তল মালিকদের গোয়েন্দা কার্যালয়ে তলব করে তাদের স্ট্যাটাস যাচাই বাছাই করে পরবর্তীতে আরো একটি প্রতিবেদন জমা দেয়া হবে।
সুত্র : মানবজমিন।




