শিরোনামশীর্ষ সংবাদ

বকেয়া দেয়ার কথা বলে বাসায় ডেকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ

পুলিশ-জনতা সংঘর্ষে উত্তাল বনশ্রী

বকেয়া দেয়ার কথা বলে বাসায় ডেকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগে শুক্রবার উত্তপ্ত হয়ে উঠে রাজধানীর বনশ্রী আবাসিক এলাকা।বকেয়া দেয়ার কথা বলে বাসায় ডেকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগে আজ শুক্রবার উত্তপ্ত হয়ে উঠে রাজধানীর বনশ্রী আবাসিক এলাকা।
রাজধানীর বনশ্রীতে গৃহকর্মীর রহস্যজনক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বাড়ি ভাঙচুর ও যানবাহনে আগুন দিয়েছে বিক্ষুদ্ধ এলাকাবাসী। এতে পুলিশ ও এলাকাবাসীর মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। পুলিশের সাথে জনতার ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া, ইটপাটকেল মধ্যে সংঘর্ষে পুলিশের মতিঝিল জোনের এডিসিসহ ১০ থেকে ১৫ জন আহত হয়েছে বলে জানা গেছে।
গুরুতর আহত অবস্থায় এডিসি সাইফুলকে বনশ্রী আল-রাজী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বাড়ির মালিক ও দারোয়ানসহ বেশ কয়েকজনকে আটক করেছে পুলিশ।
গতবাল শুক্রবার বিকেল ৫টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত থেমে থেমে দফায় দাফায় এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
এ ঘটনার পর থেকে ওই এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
নাশকতা এড়াতে ওই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এর আগে বিকেল তিনটার দিকে ওই বাড়ির সামনে জড়ো হয়ে নিহতের আত্মীয়স্বজন ও পাড়া প্রতিবেশীরা গেট ভেঙে বাসার ভেতরে ঢুকে যায়। তারা ওই বাসার বিভিন্ন রুমের আসবাবপত্র ও জিনিসপত্র ভাঙচুর করে। এসময় পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তাদের সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করলে পুলিশের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে এলাকাবাসী। পরে বিক্ষুব্ধ জনতাকে সামাল দিতে পুলিশ টিয়ারশেল ছুড়তে থাকে।
সংঘর্ষের সময় এলাকাটির বিভিন্ন অলিগলি ও রাস্তায় যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। প্রধান সড়কেও কোনো যানবাহন চলেনি।
রাত ৯টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ওই এলাকার যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক ছিল।
জানা গেছে, আজ সকালে বনশ্রীর জি ব্লকের ৪ নম্বর রোডের ১৪ নম্বর বাসা থেকে লাইলী বেগম নামে এক গৃহকর্মীর লাশ উদ্ধার করে তার স্বজনরা। লাইলীর গ্রামের বাড়ি কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ি থানার কাশিপুর গ্রামে। তিনি তার স্বামী নজরুল ইসলামের সাথে মেরাদিয়া হিন্দুপাড়ায় থাকতেন এবং বিভিন্ন বাসা বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করতেন। তার এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। লাইলী ওই বাড়ির মালিক মইনুদ্দিনের বাসায় কাজ করত।
নিহতের স্বজন ও এলাকাবাসীর অভিযোগ, লাইলীকে পাঁচ মাসের বেতন দেয়নি বাড়ির মালিক মইনুদ্দিন। বকেয়া দেয়ার কথা বলে দারোয়ানকে দিয়ে তাকে ডেকে এনে ধর্ষণের পর হত্যা করেন তিনি। বিষয়টি এলাকাবাসীর মধ্যে জানাজানি হলে ওই এলাকায় বিক্ষোভ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেন তারা। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিক্ষোভকারীদের ওপর লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। পুলিশ বাড়ির গৃহকর্তা ও মালিক মইনুদ্দিন, দারোয়ান রফিক ও দুই স্বজনসহ চারজনকে আটক করেছে।
জানা গেছে, ওই বাসায় গত সাত মাস ধরে লাইলী গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করে আসছিল। আজ সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তার ঝা নুরন্নাহার ও গৃহকর্তা মইনুদ্দিন লাইলীকে অচেতন অবস্থায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
মইনুদ্দিন হাসপাতালে পুলিশের কাছে দাবি করেন, সকালে বাসায় কাজ করতে এসে একটি কক্ষে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয় লাইলী। ডাকাডাকির পর দরজা না খোলায় বাড়ির ম্যানেজার টিপু এসে দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে ফ্যানের সাথে গলায় ওড়ানা প্যাঁচানো অবস্থায় লাইলীকে দেখতে পান।
তবে নিহতের ঝা নুরুন্নাহার সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বললেন।
তিনি জানান, বাড়িওয়ালা মইনুদ্দিন একজন কাস্টমস কর্মকর্তা। ভবনটির দ্বিতীয় তলায় তিনি থাকেন। তৃতীয় তলায় তার মেয়ে মিশু থাকেন। তিনি মিশুর বাসায় কাজ করেন। আর লাইলী দ্বিতীয় তলায় বাড়িওয়ালার বাসায় কাজ করতেন। গত পাঁচ মাস ধরে মইনুদ্দিন লাইলীকে বেতন দিচ্ছিল না। এ কারণে বেশ কয়েকদিন ধরে লাইলী কাজে আসছিল না। ২/৩ দিন আগে সে একবার এসে তার বকেয়া টাকা চায়। কিন্তু মইনুদ্দিন টাকা দিবে বলে কালক্ষেপন করতে থাকে। বকেয়া টাকা দেয়ার কথা বলে শুক্রবার সকালে তিনি (বাড়িওয়ালা) দারোয়ান দিয়ে লাইলীকে ডেকে আনেন। লাইলী এসে টাকা চাইলে মইনুদ্দিন বলেন, কাজ করো, টাকা দিবো। এই আশ্বাসের পর লাইলী সকাল ১০টার দিকে বাসায় কাজ করা শুরু করেন। এ সময় মইনুদ্দিন দরজা আটকিয়ে লাইলীকে জোর করে ধর্ষণ করে। পরে তাকে গলা টিপে হত্যা করে একটি রশি দিয়ে ফ্যানের সাথে উলঙ্গ অবস্থায় ঝুলিয়ে রাখে।
নুরুন্নাহার বলেন, তখন আমি তৃতীয় তলায় কাজ করছিলাম। লাইলী আত্মহত্যা করেছে শুনে দ্বিতীয় তলায় ছুটে গিয়ে দেখি, রুমের ফ্যানের সাথে একটি রশি ঝুলছে। নিচে একটি মোড়া রয়েছে। মইনুদ্দিন ও দারোয়ান লাইলীর মাথায় পানি দিচ্ছে। এ সময় বাড়িওয়ালা আমাকে বলে, ব্যাপারটা কাউকে বলো না, সব ঠিক হয়ে যাবে। এই বলে লাইলীকে অচেতন অবস্থায় গাড়িতে তুলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সাথে তাকেও নেয়।
খবরটি আস্তে আস্তে এলাকাবাসীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। লাইলী যেখানে থাকতেন সেই হিন্দুপাড়ায়ও জানাজানি হতে থাকে। খবর পেয়ে একে একে সবাই ওই বাড়ির সামনে জড়ো হতে থাকে।
লাইলীর পাশে বসবাসরত বাসিন্দা পিয়ারা বেগম বলেন, বাড়িওয়ালা ধর্ষণের পর ‘আত্মহত্যার নাটক সাজাতে’ লাইলীকে হত্যা করে প্রথমে ঝুলিয়ে রাখে। পরে দারোয়ানকে ডেকে নিয়ে দু’জনে তার মাথায় পানি ঢালে। খবর পেয়ে যখন নুরুন্নাহার দ্বিতীয় তলায় যায়, তখন লাইলী উলঙ্গ অবস্থায় ছিল। নুরুন্নাহার তার ওড়না দিয়ে লাইলীর শরীর ঢাকে।
ঢাকা মেডিক্যালের পুলিশ ফাঁড়ির এসআই মো. বাচ্চু মিয়া বলেন, লাইলীর গলায় কালো দাগ ছিল। শরীরের অন্য কোথাও আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়নি।
ঘটনাটির পর প্রথম একজন/দু’জন করে ওই বাড়ির সামনে যান। জুমার নামাজের আগ মুহূর্তে এলাকাবাসী বাড়ির সামনে জড়ো হয়। তখন তারা বাড়ির দারোয়ানসহ অন্যদের জিজ্ঞেস করে, গৃহকর্মীর লাশ কোথায়। তারা এর উত্তর দিতে পারছিল না। এরই মধ্যে ঘটনাস্থলে পুলিশ পৌঁছায়। কিন্তু বাসাটিতে গিয়ে পুলিশও লাশ পায়নি। তাই পুলিশও এলাকাবাসীকে লাশের বিষয়টি কিছু বলতে পারেনি। এ সময় এলাকাবাসী বাড়িওয়ালার ফাঁসির দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করে এবং বাড়িটির গেট ধরে টানাটানি করে।
পরে ঘটনাস্থলে থাকা রামপুরা ও খিলগাঁও থানা পুলিশ বিক্ষোভকারীদের লাঠিপেটা করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এতে ৩-৪ জন যুবকের মাথা ফেটে যায়। তাদের স্থানীয় ফরাজী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বলে বিক্ষোভকারীরা জানিয়েছেন।
পুলিশের লাঠিপেটায় এলাকাবাসী আরো ক্ষুব্ধ হয়। বিকেলে ৪ নম্বর বাড়ির সামনে থাকা একটি প্রাইভেটকারে তারা আগুন ধরিয়ে দেয়। পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
ঘটনাস্থলে খিলগাঁও থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আসলে ঘটনাটি কি তা ভালোভাবে জানার সময়ও আমরা পাইনি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছি।
ফায়ার সার্ভিস নিয়ন্ত্রণ কক্ষের কর্মকর্তা মিজানুর রহমান জানান, গাড়িতে আগুন দেয়ার খবর পেয়ে তাদের দু’টি ইউনিট ঘটনাস্থলে যায়। কিন্তু উত্তেজিত জনতা ফায়ার সার্ভিসের গাড়িকেও বাধা দেয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, পুলিশ ওই বাড়ির সামনে থেকে জনতাকে সরানোর চেষ্টা করলেও দফায় দফায় ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ চলতে থাকে। এক পর্যায়ে পুলিশ টিয়ার শেলও ছোড়ে। ছয়তলা বিশিষ্ট বাড়িটির চারটি করে ফ্ল্যাট রয়েছে। সবগুলো ফ্ল্যাটের চর্তুদিকে থাকা গ্লাসগুলো বিক্ষোভকারীদের ছোড়া ইট-পাটকেলে ভেঙে গেছে। গাছের গুড়ি দিয়ে বাড়িটির গেট ভেঙে ফেলা হয়। নিচে গ্যারেজে থাকা একটি সাইকেলও ভেঙে ফেলা হয়েছে। ইট-পাটকেলে পুরো ভবনটি ক্ষত-বিক্ষত অবস্থা এবং বাড়িটির চারপাশে ইট-পাটকেল ও গাছের গুড়িতে ভরে গেছে। ভাড়াটিয়ারা নিচে নেমে কয়েক শ’ বিক্ষোভকারীদের বুঝানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু তারা মানছেন না। দুপুর থেকে সন্ধ্যার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত থেমে থেমে চার বার বিক্ষোভকারীদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
সর্বশেষ সন্ধ্যা ৬টা ২০মিনিটে এলাকাবাসীর সাথে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে পুলিশ কয়েক রাউন্ড টিয়ারগ্যাস ছোড়ে। রাত সোয়া ৮টা পর্যন্ত ওই বাড়িটি এলাকাবাসী ঘিরে রেখেছে বলে একাধিক সূত্রে জানিয়েছে। তবে বাড়িটিতে থাকা ভাড়াটিয়াসহ সবাই অন্যথ চলে গেছেন।
সন্ধ্যায় রামপুরা থানার ওসি মইনুল ইসলাম খান মাইকিং করে সবাইকে আশ্বস্ত করেন। বলেন, বাসার মালিক ও দারোয়ানকে আটক করে পুলিশের হেফাজতে রাখা হয়েছে।
তবে এ ঘটনায় আজ সন্ধ্যা পর্যন্ত থানায় কোনো মামলা হয়নি। নুরুন্নাহার থানায় মামলা করতে গেলেও পুলিশ মামলা নেয়নি।
তিনি বলেন, পুলিশ বলেছে, আমরা তদন্ত না করে মামলা নিবো না।
খিলগাঁও জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) নাদিয়া জুঁই বলেন, নিহতের স্বজন ও এলাকাবাসীর অভিযোগে বাড়ির গৃহকর্তাসহ চারজনকে আটক করা হয়েছে। এ সময় বিক্ষোভকারীদের ছোড়া ইট-পাটকেলে তিনি নিজে, একজন এডিসিসহ বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। ঘটনাস্থল থেকে বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারীকেও আটক করা হয়েছে।
তবে বিষয়টি তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান তিনি।

সুত্র : নয়া দিগন্ত

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button