
মোঃ জাফর আহমেদ, কুড়িগ্রাম সংবাদদাতা: কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী ও সদর উপজেলায় গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের কাবিখা, কাবিটা ও টিআর প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি এবং সরকারি অর্থ ও খাদ্যশস্য আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, বহু প্রকল্পে নামমাত্র কাজ দেখিয়ে সরকারি বরাদ্দ তুলে নেওয়া হয়েছে, আবার কোথাও কোনো কাজ না করেই বিল উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনায় এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। তারা দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
কুড়িগ্রাম জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন অফিস সূত্রে জানা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম পর্যায়ে ফুলবাড়ী উপজেলায় কাবিটার ৯৩টি প্রকল্পে প্রায় ১ কোটি ৭২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এছাড়া কাবিখার ১৭টি প্রকল্পে মোট ৫৭ মেট্রিক টন গম এবং ৯৩ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
সরেজমিনে বড়ভিটা, ভাঙ্গামোড় ও নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের বিভিন্ন প্রকল্প এলাকা ঘুরে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে একাধিক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যায়। স্থানীয়দের ভাষ্য, বড়ভিটা ইউনিয়নের একটি কাবিখা প্রকল্পে রাস্তা সংস্কারের জন্য ৮ টন গম বরাদ্দ থাকলেও নিম্নমানের কাজ করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, নদী থেকে অবৈধভাবে ড্রেজারে বালু এনে দায়সারাভাবে রাস্তার কাজ শেষ করা হয়েছে। একই ইউনিয়নের শাহবাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের উন্নয়নে ১ লাখ ৫৭ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও সেখানে দৃশ্যমান কোনো উন্নয়নকাজ দেখা যায়নি বলে অভিযোগ করেন এলাকাবাসী।
ভাঙ্গামোড় ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ও প্রকল্প সভাপতি মো. আবুল মালেক অভিযোগ করেন, প্রকল্পের বিল ছাড় করাতে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে (পিআইও) এক লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে। তাঁর দাবি, কমিশন ছাড়া কোনো বিল ছাড় হয় না। অভিযোগটি তদন্তসাপেক্ষ হলেও বিষয়টি স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
অন্যদিকে নাওডাঙ্গা ইউনিয়নে চেয়ারম্যান অনুপস্থিত থাকার সুযোগে তাঁর ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের মাধ্যমে টিআর ও কাবিখা প্রকল্পের বরাদ্দ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতির সুযোগেই এ ধরনের অনিয়ম ঘটেছে।
এদিকে সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের দুটি কাবিখা প্রকল্পে ২৮ মেট্রিক টন চাল আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, সরকারি নথিতে কাজ শতভাগ সম্পন্ন দেখানো হলেও বাস্তবে উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নয়ন হয়নি।
তবে যাত্রাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আব্দুল গফুর এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, প্রকল্পের কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
সদর উপজেলার পিআইও মো. জসিম উদ্দিন বলেন, “প্রকল্প পরিদর্শনের পরই চালের ডিও দেওয়া হয়েছে। কাজ হয়েছে, তবে কোথাও কম-বেশি হতে পারে।”
ফুলবাড়ী উপজেলার পিআইও মো. সিরাজুদ্দৌলা বলেন, “চেয়ারম্যান-মেম্বারদের আয়ের একমাত্র উৎস কাবিখা ও টিআর।” প্রসঙ্গক্রমে তিনি স্বীকার করেন, কিছু অনিয়ম থাকতে পারে। তবে অভিযোগ নিয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে তিনি অনাগ্রহ প্রকাশ করেন।
কুড়িগ্রাম জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা এস এম বেনজির বলেন, অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও জানান, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ বলেন, “সুনির্দিষ্ট অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এলাকাবাসীর অভিযোগ, জনগণের উন্নয়নের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি অর্থ ও খাদ্যশস্য যদি অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়, তাহলে প্রকৃত উন্নয়ন ব্যাহত হবে এবং সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম প্রশ্নবিদ্ধ হবে। তাই তারা সংশ্লিষ্ট সব প্রকল্পের নিরপেক্ষ তদন্ত, অর্থ ও খাদ্যশস্য ব্যবহারের পূর্ণাঙ্গ নিরীক্ষা, দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম রোধে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন। স্থানীয়দের মতে, তদন্তে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রভাব যেন না পড়ে এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমেই জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।




