পেঁয়াজের বর্তমান দাম অস্বাভাবিক : কৃষিমন্ত্রী

বাংলাদেশে এক সপ্তাহের মধ্যেই পেঁয়াজের দাম কেজিতে অন্তত ২০ টাকা বেড়েছে। গত সপ্তাহে বাজারে ৬০ টাকার মধ্যে এক কেজি পেঁয়াজ মিললেও রোববার এটি বাজারে বিক্রি হয়েছে কেজিতে ৮০ থেকে ৯০ টাকায়। এ অবস্থায় বিদেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। এ উদ্দেশে রোববার বিকেলে পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি চেয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘টিসিবির তথ্যানুযায়ী প্রতি কেজি পেঁয়াজের মূল্য এক মাস আগে ৩০ টাকা ছিল, যা গত সপ্তাহে ৫০ টাকা করে বিক্রি হয়েছে এবং বর্তমানে ৭০ থেকে ৮০ টাকা দরে বিক্রয় হচ্ছে। পেঁয়াজের সরবরাহ বৃদ্ধি করে মূল্য স্থিতিশীল করার উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।’
এ কারণে জরুরি ভিত্তিতে সীমিত পরিসরে পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি প্রদানের কথা বলা হয়েছে চিঠিতে। অনুমতি পেলে আমদানিকারকরা বিদেশ থেকে পেঁয়াজ আনতে পারবে।
এর আগে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক। তিনি বলেন, ‘পেঁয়াজের যথেষ্ট মজুদ থাকার পরও এত দাম বৃদ্ধি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বর্তমান দাম অস্বাভাবিক। ৮০ টাকা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য না।’
তাহলে দাম নিয়ন্ত্রণে বিদেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি হবে কি-না প্রশ্নের উত্তরে কৃষিমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। দামটা রিজনবল রাখার চেষ্টা করবে, না হলে কয়েক দিনের মধ্যে ইমপোর্টে যেতে হবে।’
এর কয়েকঘণ্টা পরই কৃষি মন্ত্রণালয় বরাবর চিঠি ইস্যু করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
দু’দিন আগে ঠিক একই কথা বলেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। রংপুরে এক অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, ‘পেঁয়াজ আর চিনি নিয়ে একটু ঝামেলা হয়েছে। পেঁয়াজ আপাতত ভারত থেকে আমদানি বন্ধ রয়েছে। দাম না কমলে দুই-এক দিনের মধ্যে আমরা আমদানির ব্যবস্থা নেব।’
বাণিজ্যমন্ত্রীর বিশ্বাস আমদানি হলেই দাম কমে যাবে।
দেশী কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় গত মার্চে ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ করে সরকার। ওই পেঁয়াজের দাম ছিল ৪০ টাকার মধ্যেই। কিন্তু দু’মাসের মধ্যে তা দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে গেল।
বাজারে গিয়ে ক্রেতাদের তাই হিমশিম অবস্থা।
গৃহিনী তানিয়া আক্তার বলেন, ‘অবস্থা তো খারাপ, ২৫ টাকায় কিনতাম, সেটা ৩০ থেকে ৩৫, ৪০, ৫০ বাড়তে বাড়তে এখন ৭০ টাকাও পাওয়া যাচ্ছে না। ৮০ টাকা লাগতেছে। সবকিছুর দাম অবিশ্বাস্যভাবে বেড়েছে।’
বর্তমান দাম দেখে হতাশা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে পেঁয়াজচাষিদের মাঝেও। এবারে পেঁয়াজ উৎপাদন করেছিলেন বগুড়ার কৃষক জাহিদ হাসান। ফলনও ভালো হয়েছিল। কিন্তু দাম খুব একটা পাননি। ফলে অল্প দামে মাঠ থেকেই ফসল বিক্রি করে দেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমরা অল্প পুঁজির লোক। পেঁয়াজ রাখলে সংসার চলবে কিভাবে। এখন তো সব পেঁয়াজ সিন্ডিকেটের কাছে, তারা মজুদ করে রাখছে।’
এ সিন্ডিকেটের কথা স্বীকার করেন কৃষিমন্ত্রীও।
তিনি বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি সিন্ডিকেটকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনা যায় কি-না। না হলে ভারতে দাম কম, সেখান থেকে আমদানি করে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনতে হবে। পেঁয়াজের দাম হবে সর্বোচ্চ ৪৫ টাকা।’
কিন্তু যে সিন্ডিকেট যাদের বলা হচ্ছে, ওই মধ্যস্বত্ত্বভোগী ব্যবসায়ী বা আড়ৎদারদের সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না কেন?
কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশের (ক্যাব) সহ-সভাপতি নাজের হোসেন মনে করেন, ‘নিয়ন্ত্রণ করার ইচ্ছে থাকলে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।’
তিনি বলেন, ‘বাজার নিয়ন্ত্রণ করার জন্য যে ধরনের উদ্যোগ দরকার তা দেখা যায়নি। যেমন, কৃষকরা যেন দাদন ব্যবসায়ীদের কাছে অগ্রিম বিক্রি না করে তার জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক সুবিধা দরকার ছিল। এখন মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের কাছে স্টক থাকার কারণে তারাই কারসাজি করছে। এ জায়গায় সরকারের যেভাবে তদারকি করা কথা তা হয়নি।’
তবে আমদানি হলে পেঁয়াজের দাম কিছুটা কমবে বলে মনে করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘ভারত থেকে আমদানি হলে ক্রাইসিস কমে যাবে। কারণ স্টক আছে, কিন্তু কৃত্রিমভাবে নিয়ন্ত্রণ করে ব্যবসায়ীরা পেঁয়াজের দাম বাড়াচ্ছে ইচ্ছামতো।’
তবে অনেকের এখন শঙ্কা কোরবানির ঈদ সামনে রেখে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম আরো বাড়বে।
সংসারের জন্য নিয়মিত বাজার করেন এমন একজন মীর মুশফিক বলেছেন, ‘১৫-২০ দিন আগে গ্রাম থেকে পেঁয়াজ আনাইছিলাম। কিন্তু আজ বাজার করতে গিয়ে দেখি বাজারে আদা নাই, জিরা নাই, চিনিও নাই। মশলা সবকিছুর দাম বাড়তির দিকে। সবজির দাম অবিশ্বাস্য।’
ভোক্তাদের নিয়ে কাজ করা নাজের হোসেন মনে করেন দাম বাড়ানোর প্রতিযোগিতার সামাজিক সংক্রমণ ঘটেছে।
তিন বলেন, ‘সব ব্যবসায়ীর মধ্যে অতি মুনাফার প্রবৃত্তি, জনগণের পকেট কাটতে হবে। এ কারণে সমস্যাগুলো ঘুরে ফিরে আসছে।’
পরিস্থিতি সহনীয় রাখতে সরকারকে একটু আগে থেকে ব্যবস্থা নেয়ার পরামর্শ বাজার বিশ্লেষকদের।
সূত্র : বিবিসি




