তিন জয়িতার সংগ্রামী জীবন

মানিকগঞ্জ জেলা মহিলা বিষয়ক কার্যালয়ের ব্যবস্থাপনায় ২০১৬-২০১৭ অর্থ বছরে জেলার সাটুরিয়া উপজেলায় তিন ক্যাটাগরিতে তিনজনকে জয়িতা নির্বাচিত করা হয়েছে। মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ‘জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ’ শীর্ষক আয়োজনে নির্বাচিতরা হলেন- শিক্ষা ও চাকরি ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী নারী- সেলিনা আক্তার, অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারী- রিনা বেগম ও সমাজে অসামান্য অবদানের জন্য জহুরা বেগম।
শিক্ষা ও চাকুরী ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী নারী সেলিনা আক্তার:
আমি সেলিনা আক্তার, পিতা- মো. হিরন আলী, মাতা- মোছা. মরিয়ম বেগম, গ্রাম- হাজিপুর, পো- সাটুরিয়া, উপজেলা- সাটুরিয়া, জেলা- মানিকগঞ্জ। আমি এক অতিদরিদ্র মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করি। যে পরিবারে শুধু দরিদ্রতার প্রভাবই নয়, অশিক্ষার প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত একটি পরিবার। পর মায়ের মুখে যখন দরিদ্রতার ভয়ংকর ছাপ দেখতে পাই, তখন অভাবকে জীবনের শত্রু মনে না করে, সঙ্গী হিসাবে মেনে নিয়ে জীবন চলার পথ শুরু করি।
আমার পাড়ার ছেলে-মেয়েরা যখন পড়ার বই নিয়ে স্কুলে যেতো আমি তাদের দিকে তাকিয়ে থাকি এবং মনে মনে ভাবি আমিও যদি স্কুলে যেতে পারতাম। একদিন বাবাকে আমি স্কুলে যাওয়ার কথা বললে তিনি বললেন, ‘লেখাপড়া হচ্ছে ধনী লোকের ছেলে-মেয়েদের জন্য। একদিন আমাদের গ্রামের এক শিক্ষক বলল, বিদ্যালয়ে মেয়েদের পড়ার খরচ সরকার বহন করে। আমাকে স্কুলে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দিলেন তিনি। পরে আমিও স্কুলে ভর্তি হই। কিন্তু আমার যা জামা-কাপড় ছিল তা মোটেও স্কুলে যাওয়ার মত উপযুক্ত নয়। তাই অন্যের জামা-কাপড় পড়ে স্কুলে যাত্রা শুরু করি।
পঞ্চম শ্রেণী পাশ করার পর লেখাপড়ার পাশাপাশি আমি টিউশনি শুরু করি। এভাবে স্কুল থেকে কলেজ, কলেজ থেকে এইচএসসি, বিএ সর্বশেষে এমএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছি। লেখাপড়া ও টিউশনির ফাঁকে যুব উন্নয়ন, সমাজ সেবা এবং আনসার ও ভিডিপি থেকে বিভিন্ন প্রকার প্রশিক্ষণ নিয়ে বাড়ীতে হাঁস-মুরগী পালন, সেলাইয়ের কাজ করে অসহায় বেকার মহিলা যুব সমাজকে উৎসাহিত করতে সক্ষম হয়েছি। এছাড়া কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে একটি কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টারে একজন প্রশিক্ষক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছি। বর্তমানে আমি আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে (স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জি. আই.জেড-এর যৌথ প্রকল্প) আই.আর.এস.ও.পি.প্রজেক্টে মানিকগঞ্জ জেলার একজন প্যারালিগ্যার হিসেবে কর্মরত আছি। এই পেশার মাধ্যমে গরীব, অসহায় নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধী, বিচারাধীন কারাবন্দী এবং বিচার প্রার্থী ব্যক্তিদের বিনামূল্যে আইনি সহায়তা করে সেবামূলক কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখতে সক্ষম হয়েছি।
আমার নানামুখী শিক্ষা ও কর্ম পরিকল্পনা দেখে এলাকার লোক আর কন্যা শিশুকে পরিবারের বোঝা মনে করছে না। পরিশেষে এ কথাই বলতে চাই যে, এ পৃথিবীকে সুন্দরভাবে গড়তে হলে,ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েদেরকেও সু-শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে। তবেই একটি সুন্দর সমাজ গড়া সম্ভব হবে।
অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারী রিনা বেগম:
আমি রিনা বেগম, স্বামী-মৃত আমছের আলী, মাতা-জহুরা বেগম, গ্রাম- হাজিপুর, উপজেলা-সাটুরিয়া, জেলা-মানিকগঞ্জ। আমার বাবা ছিলেন একজন গরীব কৃষক। তিনি যা রোজগার করতেন তা দিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতেন। অনেক দুঃখ, কষ্ট ও অভাবের মধ্যে আমার বেড়ে উঠা। বিয়ের বয়স হওয়ার আগেই অভাবের তাড়নায় আমাকে আমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে জোর করে বিয়ে দিয়ে দেন। কিন্তু আমার স্বামী ছিলেন একজন গরীব ও বেকার। স্বামীর সংসারে আসার পরও অভাব আমার পিছু ছাড়লনা। তাই স্বামীর পাশাপাশি আমিও বাড়িতে হাঁস-মুরগী ও গরু-ছাগল পালন করতে শুরু করি।
এভাবে অনেক কষ্ট করে দিনে দুবেলা খেয়ে অন্যের জমি বর্গা চাষাবাদ শুরু করি। কিছুদিন চলার পর আমার স্বামী মারা যান। কিন্তু আমি থেমে থাকিনি। আমার কঠোর প্রচেষ্টায় বর্তমানে দুইটি বড় গাভী, একটি ট্রাক, একটি পাওয়ার টিলার ও চার বিঘা নিজস্ব জমি আছে। এখন আমি আর্থিকভাবে সচ্ছল ও স্বাবলম্বী। আমার এই কর্মপ্রচেষ্টা দেখে গ্রামের অনেক মহিলাই উৎসাহিত হয়ে স্বামীর পাশাপাশি হাঁস-মুরগী ও গরু-ছাগল পালন শুরু করেছে। পরিশেষে আমি সকলের নিকট দোয়া চাই যাতে করে ভবিষ্যতে আরো উন্নতি করতে পারি, এগিয়ে যেতে পারি।
সমাজে অসামান্য অবদান রাখা নারী জহুরা বেগম:
আমি জহুরা বেগম, স্বামী-আবদুল হালিম, মাতা-মৃত বিরন বেগম, গ্রাম-ভাঙ্গাবাড়ি, পো.-দ্বিমুখা, উপজেলা-সাটুরিয়া, জেলা-মানিকগঞ্জ। আমার জন্ম হতদরিদ্র এক গরীব কৃষক পরিবারে। অনেক দুঃখ, কষ্ট ও অভাবের মধ্যে আমার বেড়ে উঠা। বিয়ের বয়স হওয়ার আগেই ১২ বছর বয়সে বাবা-মা আমাকে জোর করে বিয়ে দিয়ে দেন। বিয়ের এক বছর পর আমার কোল জুড়ে আসে এক কন্যা সন্তান। এ কন্যার মা হওয়ায় আমার ওপর নেমে আসে এক অভিশাপ। কিছুদিন পর থেকে আমার উপর চলে শারীরিক নির্যাতন।
এক পর্যায়ে আমাকে ও আমার কন্যা সন্তানকে ফেলে আমার স্বামী অন্যত্র চলে যান। সে থেকে আজো পর্যন্ত তার সাথে আমার দেখা হয়নি। নিরুপায় হয়ে আমি আমার কন্যা সন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়ি চলে আসি। আমার বাবা দিন মজুরের কাজ করে অতি কষ্টে সংসার চালায়। তার উপর আমি ও আমার কন্যা সন্তানের বাড়তি বোঝা হয়ে গেলাম। মা বাবা তাই সেদিন ফেলতে পারেনি। কিছুদিন পর আমি অন্যের বাড়ি বাড়ি গিয়ে গিয়ে কাঁথা সেলাই করি এবং অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করি। পরবর্তীতে আমি মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করি। এভাবে অনেক কষ্টে আমার জীবন সংসার চলতে থাকে।
এভাবে চলতে চলতে গ্রামের বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিই। বাল্যবিবাহে বাধা প্রদান, অসহায় রোগীকে চিকিৎসাসেবা, গ্রামের মানুষদের কাছ থেকে চাঁদা তুলে গরীব ও অসহায় মেয়েদের বিবাহ দেয়ার কাজ করি। এসকল সামাজিক উন্নয়নমুলক কাজের জন্য এলাকার মানুষ আমাকে পর পর দুইবার ইউনিয়ন পরিষদের মহিলা মেম্বার পদে বিপুল ভোটে জয়ী করেছেন। মেম্বার নির্বাচিত হওয়ার পর আমি আরো সামাজিক কাজ করার সুযোগ পাই। আমার এ ধরনের সামাজিক কর্মকাণ্ডে আমি ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হই। পরিশেষে আমি সকলের দোয়া চাই যাতে আরো সেবামূলক কাজে নিজেকে নিয়োজিত করতে পারি। সৌজন্যে : ইত্তেফাক



