
মিতা রহমান: স্বৈরাচার ও ফ্যাসীবাদ বিরোধী ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে বাংলাদেশের নারী সমাজের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত সাহসী, অদ্বিতীয় ও প্রেরণাদায়ক। তারা শুধু ঘর থেকে সমর্থন জানাননি, বরং রাজপথে সরাসরি নেতৃত্বও দিয়েছেন, বুলেট ও টিয়ারশেলের মুখে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছেন গণতন্ত্রকে মুক্তি দিতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোর তালা ভেঙে নারী শিক্ষার্থীরা প্রথম প্রতিবাদে নামেন, মিছিলের প্রথম সাড়িতে রাজপথে স্লোগান দিয়ে পুরো জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার দায়িত্ব পালন করেছেন। লাঠি ও ইট হাতে তারা পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর সামনে প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।
প্রত্যেকটি পরিবারের মায়েরা ও গৃহিণীরা অকুতোভয় সৈনিকের মতো রাস্তায় নেমেছিলেন। তারা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের জন্য খাবার, পানি ও স্যালাইনের ব্যবস্থা করেছেন এবং আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়েছেন। কোটা আন্দোলন থেকে এক দফা। জুলাইয়ের রক্তাক্ত ইতিহাসে জড়িয়ে আছে শত সহস্র নারীর নাম। প্রাণ দিয়েছেন নাম না জানা অনেক নারী, হামলা আর নির্যাতনের শিকারও হয়েছেন অনেকে।
জুলাই আন্দোলনে অনেক নারী গুরুতর আহত হয়েছেন এবং ১১ জন নারী তাঁদের জীবন বিসর্জন দিয়েছেন। মাইলস্টোন স্কুলের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাঈমা সুলতানা ছিলেন এই অভ্যুত্থানের প্রথম নারী শহিদদের একজন। আন্দোলনের পর রাষ্ট্র গঠনে ও অধিকার রক্ষায় নারীরা এখনো সোচ্চার রয়েছেন। সমান অধিকার ও নিরাপদ সমাজ গড়তে তারা বিভিন্ন সময় নতুন করে মিছিল ও সমাবেশের মাধ্যমে নিজেদের দাবি তুলে ধরছেন। ’২৪- এর রক্তাক্ত জুলাইয়ে এমন হাজার হাজার নারীর সাহসী লড়াই পুরো জাতিকে এনে দিয়েছে অদম্য এক জয়ের ইতিহাস। ‘কোনো কালে একা হয়নিকো জয়ী পুরুষের তরবারি, প্রেরণা দিয়েছে শক্তি দিয়েছে বিজয়ী লক্ষ্মী নারী।’ নজরুলের এই কবিতা যেন আবারও সত্য হয়েছে ’২৪-এর স্বৈরাচার বিরোধী লড়াইয়ে। কোটা আন্দোলন থেকে গণ-অভ্যুত্থান, লাখো নারীর কণ্ঠে তখন দ্রোহ জাগানীয়া স্লোগান। ছিলেন মিছিলে, রাজপথে, সমরে, সংগ্রামে। ঝরেছে অশ্রু, ঝরেছে রক্ত- কিন্তু লড়াইয়ের ময়দানে কোনো কিছুই বাঁধ হতে পারেনি।
২০২৪ এর ১৪ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের নারী শিক্ষার্থীরা তালা ভেঙে মধ্যরাতে প্রথম রাস্তায় নেমে আসেন নারী শিক্ষাত্রীরা। তাদের এই সাহসী পদক্ষেপ পুরো দেশবাসীকে অনুপ্রাণিত করে। সেই থেকে নারীরা প্রায়ই বিক্ষোভের সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে পুরুষ সহযোদ্ধাদের রক্ষা করার চেষ্টা করেছেন। অনেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী নারীদের অনেকে নির্মমভাবে জীবন দিতে হয়েছে এবং অনেকে গুরুতর আহত হয়েছেন। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের ছত্রছায়ায় ‘অসীম শক্তিধর’ আওয়ামী সন্ত্রাসী, বেপরোয়া র্যাব-পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনীর তাক করা অস্ত্র-গুলির সামনে তেজোদীপ্ত-সাহসী নারীরা ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। তাদের প্রতিবাদ আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের জন্য টনিক হিসাবে কাজ করেছিল। তারা সন্তানদের পাশে এসে দাঁড়ান অকুতোভয় সৈনিকের মতো। ৩৬ দিনের আন্দোলনে এসব সাহসী বীর নারীর অবদান অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।
কিন্তু, দুঃখজনক হলেও সত্য, গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচারী সরকারের বিদায় হলেও নারী কি তাদের হিস্যা বুঝে পেয়েছেন এ প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্রগুলোয় নারীরা এখনো বৈষম্যের শিকার। নতুন বাংলাদেশে নারীর প্রতি আরও সহনশীল হওয়ার প্রয়োজন থাকলেও তা এখনো হয় নাই। সরকার ও দেশের সবাইকে মনে রাখতে হবে, এই বাংলাদেশে শুধু নারী হিসাবে নয়, একজন মানুষ হিসাবে মর্যাদা দিতে হবে। সবাইকে মনে রাখতে হবে, ছাত্র-জনতার জুলাই আন্দোলনে ‘পেছনে পুলিশ, সামনে স্বাধীনতা।’ সাহসী শিক্ষার্থী সানজিদা চৌধুরীর অগ্নিঝরা এ বাক্যটি শক্তি জুগিয়েছে আন্দোলনকারীদের। একটা চরম বার্তা পেয়েছিল স্বৈারাচারী সরকারের প্রধান শেখ হাসিনা। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৪-এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থান, সব আন্দোলন-সংগ্রামে নারীরা অগ্রণী ভূমিকা পালনের পাশাপাশি নেতৃত্বও দিয়েছেন। কিন্তু প্রতিবারই অভ্যুত্থান শেষে নারীদের পিছিয়ে দেওয়া হয়, অবমূল্যায়ন করা হয়। রাষ্ট্রও নারীর অবদানকে স্বীকৃতি দেয় না; অধিকারের প্রশ্নে নীরব থাকে।
ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে নারীরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন। কিন্তু প্রতিবারই তাদের অবদান অস্বীকার করা হয় এবং তাদের পিছিয়ে দেওয়া হয়। ১৪ জুলাইকে ‘জুলাই উইমেন্স ডে’ পালন করা হলো। এগুলো করা যেতেই পারে। কিন্তু তাদের স্বীকৃতি না দিয়ে, মর্যাদা না দিয়ে, নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে এসব উৎসব পালন, ড্রোন ওড়ানোর কোনো মানে হয় না। অভ্যুত্থান হয়েছিল বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। কিন্তু এখন তার বিপরীত পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। নারীর প্রতিটি প্রাপ্তিতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। সেখানে রাষ্ট্র নীরব ভূমিকা পালন করছে। মনে রাখতে হবে, নারীরা হারিয়ে যায়নি। তারা ইতিহাসের প্রয়োজনে আবার হয়তো মাঠে নেমে আসবে। শাসকগোষ্ঠী তাদের ভূমিকাকে স্বীকৃতি দিতে না চাইলেও ইতিহাস তাদের মনে রাখবে।
২০২৪ এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানে দেশের কোন নির্দিষ্ট সংগঠন, দল বা সংস্থা নয়, বরং জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে কর্তৃত্ববাদী আওয়ামী সরকারের পতন ঘটে। এতে রাষ্ট্রকাঠামোর কোন পরিবর্তন না ঘটলেও অবশ্যই তা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে। এসময়ে নারীদেরকেও কোন একটা পক্ষ নিতে হতো এবং তারা তা নিয়েছিলেন। ঘরানাগত পার্থক্য, এক্টিভিজমগত পার্থক্যের বেড়া পার করে তাদের সামনে বিশাল প্রশ্ন এসে দাঁড়িয়েছিল, তারা কি রাষ্ট্রীয়–সরকারী কর্তৃত্ববাদের পক্ষে না বিপক্ষে? উল্লেখ্য, অধিকাংশ নারীবাদীই এসময় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে গেছেন গণঅভ্যুত্থানের বড় একটি শক্তি হিসেবে। গণঅভ্যুত্থানের একটি বিখ্যাত ছবি আছে। কোন এক বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট দিয়ে লাঠি হাতে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মিছিলে বের হচ্ছেন এক হিজাব পরিহিতা (যাকে ইসলামিক চিন্তাধারার প্রতীক হিসেবে অনেকে বিবেচনা করেন) এবং এক প্যাণ্ট–শার্ট পরা (যাকে লিবারেল–মডার্ন চিন্তাধারার প্রতীক হিসেবে।




