জুনিয়ার এশিয়া কাপ হকি : কঠিন মিশনে আত্মবিশ্বাসই আশরাফুলদের শক্তি

তোফায়েল আহমেদ রবিন : স্বপ্ন আকাশ ছোঁয়া। যা মুঠোবন্দী করতে হলে পাড়ি দিতে চাই পর্বতসম পথ। সেই পথের কঠিন চ্যালেঞ্জগুলো সম্পর্কে জেনেই আশরাফুল ইসলাম, ফজলে হোসেন রাব্বিরা দেশকে বড় কিছু উপহার দিতে চাইছেন। দেশের মাটিতে হতে যাওয়া জুনিয়ার এশিয়া কাপ (অনূর্ধ্ব-২১) হকিতে ভালো করে জুনিয়র বিশ্বকাপের টিকিট কাটতে চান তারা।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম শতবার্ষিকীর এই টুর্নামেন্ট আশরাফুলদের কাছে বাড়তি প্রেরণা। মানসিকভাবে নিজেদের সেভাবেই তৈরি করে ফেলেছেন কোচ মামুন উর রশিদের শিষ্যরা। দলের সিনিয়র থেকে শুরু করে একেবারে নবীনের চোখ জুড়েও তাই যুব বিশ্বকাপে পা রাখার স্বপ্ন।
আগামী ২১-৩০ জানুয়ারি ঢাকায় অনুষ্ঠিত হবে ১০ দলের জুনিয়র এশিয়া কাপের আসর। যা জুনিয়র বিশ্বকাপের বাছাই পর্বও। এই আসর থেকে তিনটি দল ২০২১ সালে ভারতে অনুষ্ঠেয় জুনিয়র বিশ্বকাপের টিকিট পাবে।
তবে জুনিয়র এশিয়া কাপের অন্যতম শক্তিশালী দল ভারত আগামী বিশ্বকাপের স্বাগতিক। সেই হিসেবে তারা এমনিতেই বিশ্বকাপে খেলবে। অর্থাৎ ভারত বাদেই মোট তিনটি দল ঢাকার এই আসর থেকে বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করবে। সে ক্ষেত্রে ভারত সেমিফাইনালে খেললে অন্য তিন সেমিফাইনালিস্টও পাবে বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ। বাংলাদেশ সেই সুযোগটাই নিতে চায়।
দলের সবচেয়ে বড় তারকা পেনাল্টি কর্নার আশরাফুল ইসলাম যেমন বলছেন, ‘আমাদের প্রধান লক্ষ্য থাকবে বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করা। এরপর যতটা ভালো করা যায়…।’
আশরাফুল সিনিয়র জাতীয় দলেরও গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। তার মতো সিনিয়র জাতীয় দলের আরেক তারকা ফজলে হোসেন রাব্বিকেও প্রত্যয়ী শোনায়, ‘আমাদের মূল লক্ষ্য বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করা। সেমিফাইনালে খেলতে পারলেই তো আমরা বিশ্বকাপে খেলব। যেকোনো মূল্যে আমরা সেই লক্ষ্য পূরণ করতে চাই।’
প্রাথমিক স্কোয়াডে থাকা গোলরক্ষক নুরুজ্জামান নয়ন একেবারেই নবীন। এই প্রথম সুযোগ পেয়েছেন কোনো আন্তর্জাতিক আসরের ক্যাম্পে। বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি) থেকে সদ্য এসএসসি পাশ করা এই শিক্ষার্থী তো আরো একধাপ এগিয়ে ভাবছেন। ‘স্বপ্ন এশিয়া কাপে ভালো করে বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করা। আর বিশ্বকাপে আমার খুব ভালো খেলার ইচ্ছে।’
নবীন বলেই হয়তো এভাবে ভাবছেন নয়ন। তাকে আত্মবিশ্বাসী করছে ক্যাম্পের অনুশীলন সেশনগুলো, ‘আমরা যেভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছি, ইনশা আল্লাহ বিশ্বকাপে খেলা সম্ভব।’
বাস্তবতা যদিও কঠিন চ্যালেঞ্জের কথা বলছে। আগে কখনোই জুনিয়র বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি বাংলাদেশ। জুনিয়র এশিয়া কাপেও সেরা চারে ছিল না কখনো। সর্বোচ্চ সাফল্য ষষ্ঠ হওয়া।
এবার যে দলগুলো খেলতে আসছে (সম্ভাব্য), র্যাঙ্কিংয়ে চোখ রাখলে দেখা যাচ্ছে তাদের মধ্যে সেরা ছয়েও নেই বাংলাদেশ। এশিয়ান হকি ফেডারেশনের ওয়েবসাইট অনুসারে দলগুলো অবস্থান এ রকম- ভারত (১), মালয়েশিয়া (২), জাপান (৩), দক্ষিণ কোরিয়া (৪- কোরিয়া রিপাবলিক), পাকিস্তান (৫), চীন (৬), ওমান (৭), বাংলাদেশ (৯), চাইনিজ তাইপে (১৩) ও উজবেকিস্তান (১৫)। অর্থাৎ বাংলাদেশের নিচে কেবল দুটি দেশ। ওমান অবশ্য এই আসরে খেলবে না বলে জানা গেছে। সে ক্ষেত্রে বিকল্প কোনো দল আসবে।
প্রতিপক্ষের শক্তির কথা মনে করিয়ে দিতেই আশরাফুল বললেন নিজেদের ওপর ভরসা রাখার কথা। বলছিলেন, ‘আমাদের খেলোয়াড়দের যে কোয়ালিটি, তাতে নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী খেলতে পারলে ইনশা আল্লাহ কিছু একটা করতে পারব আমরা। এতটুকু ভরসা আছে আমাদের।’
রাব্বির কণ্ঠেও একই সুর। এই মিডফিল্ডার জোর দিচ্ছেন টিম ওয়ার্কের ওপর, ‘সেমিফাইনাল একদিক থেকে খুবই কঠিন। তবে আত্মবিশ্বাস আর টিম ওয়ার্ক দিয়ে যদি এগিয়ে যেতে পারি, আশা করছি ভালো কিছু হবে।’
এই আসরটি মূলত হওয়ার কথা ছিল এ বছর জুনে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম শতবার্ষিকী উপলক্ষে টুর্নামেন্টের স্বত্বও কিনে রেখেছে বাংলাদেশ। তবে করোনাভাইরাসের কারণে তা স্থগিত হয়ে যায়।
গত বছরই দীর্ঘ মেয়াদি প্রশিক্ষণ ক্যাম্প শুরু করলেও করোনায় স্থগিত হয় সেটিও। টুর্নামেন্ট উপলক্ষে বাংলাদেশ দল নিজেদের গুছিয়েও নিয়েছিল তখন। ঘরের মাঠে ওমানের বিপক্ষে প্রস্তুতিমূলক টেস্ট সিরিজ খেলে। ৫ ম্যাচের সিরিজটি ৩-১ এ জিতে নেয় বাংলাদেশ।
সেখান থেকে দীর্ঘ ৭ মাসের বিরতির প্রভাব স্বাভাবিকভাবেই খেলোয়াড়দের ওপর পড়ছে। রাব্বির কণ্ঠে তাই এক রকম আফসোসই ঝড়ে, ‘আগে আমাদের প্রস্তুতিটা ভালো ছিল। করোনার কারণে সাত মাসের যে বিরতি, এর জন্য আমাদের সবকিছু পিছিয়ে গেছে। সবার ফিটনেস বলেন, একজন আরেক জনের সঙ্গে বোঝাপড়া বলেন। সবকিছু এখন আবার নতুন করে শুরু হলো।’ তবে তার আশা পরিশ্রমের মাধ্যমে লক্ষ্য পূরণ করার।
আশরাফুল বলছিলেন আরেকটু আগে ক্যাম্প শুরু করলে ভালো হতো, ‘করোনার কারণে ফিটনেসের দিক থেকে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে সবার। তবে এটা শুধু আমাদেরই না, অন্যদেরও হয়েছে। আমাদের প্র্যাকটিসটা যদি আরেকটু আগে থেকে শুরু হতো, সেটা আরো ভালো হতো।’
তবে এখন আর এসব নিয়ে পড়ে থাকতে চান না। বরং যে সময় আছে সেটি কাজে লাগাতে চান আশরাফুল, ‘এখনো পর্যাপ্ত সুযোগ আছে। যদি আমরা ভালোমতো প্র্যাকটিস করতে পারি, আমাদের কোচ যে গেম প্ল্যান দেবে, সেই অনুযায়ী যদি আমরা খেলতে পারি, ইনশা আল্লাহ আমরা আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারব।’
আগস্টে অবশ্য ১৭জন খেলোয়াড় নিয়ে বিমানবাহিনীর বঙ্গবন্ধু ঘাঁটিতে এক মাসের একটা ক্যাম্প হয়েছে। মূলত জুনিয়র খেলোয়াড়রাই ছিলেন সেই ক্যাম্পে। সঙ্গে বাহিনীর বাইরের খেলোয়াড়রা। বাহিনীর খেলোয়াড়রা নিজ নিজ সংস্থার অধীনে ছিলেন। এক মাসের ক্যাম্প করে আসা নুরুজ্জামান নয়ন সেই ক্যাম্প থেকে ইতিবাচক ফল পেয়েছেন বলে জানালেন।
‘করোনার কারণে বিশ্রামে ছিলাম। এক মাসের যে ফিটনেস ট্রেনিং হয়েছে, তাতে আমাদের অনেক উন্নতি হয়েছে। আশা করছি যে সময় আছে ভালো মতোই প্রস্তুতি নিতে পারব।’- বলছিলেন নয়ন।
এই আসরে ভালো করতে হলে সিনিয়রদের দায়িত্ব নিতে হবে। আশরাফুল-রাব্বিরা সেরাটা দিতে পারলে তরুণেরাও উজ্জীবিত হবেন। রাব্বি এ ক্ষেত্রে নিজের সেরার চেয়েও বেশি কিছু দিতে চান, ‘খেলাটা আসলে টিম গেম। অবশ্যই সিনিয়র হিসেবে জুনিয়রদের সাথে নিয়ে, ওদের সঙ্গে বোঝাপড়া ভালো করে এগিয়ে যাওয়া চেষ্টা থাকবে। আমরা আমাদের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করব। নিজেদের সেরাটার চেয়েও বেশি দেওয়ার চেষ্টা করব সিনিয়র হিসেবে।’
আশরাফুলকে এই সময়ে দেশের অন্যতম সেরা পেনাল্টি কর্নার স্পেশালিস্ট ধরা হয়। দায়িত্ব নিয়ে খেলতে তৈরি তিনিও। তবে ফেডারেশনের কাছে প্রস্তুতি ম্যাচ আয়োজনের দাবিও রেখেছেন তিনি। দীর্ঘদিন যে ম্যাচ প্র্যাকটিসে নেই খেলোয়াড়রা।
এই দলের কোচের দায়িত্বে জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক মামুন উর রশিদ। বিশ্বকাপের লক্ষ্য পূরণ করতে হলে যে কঠিন পথ পাড়ি দিতে হবে সেটি মানছেন তিনি। তবে আস্থা রাখতে চান শিষ্যদের ওপর।
মামুন বলেন, ‘আমি আশাবাদী। কারণ আমাদের খেলোয়াড়রা অনেক ট্যালেন্টেড। তারা এই চ্যালেঞ্জ নেওয়ার জন্য তৈরি হয়ে আছে। তারাও চাচ্ছে একটা ভালো রেজাল্ট হোক। যেহেতু দেশের মাটিতে খেলা, বঙ্গবন্ধুর নামে টুর্নামেন্ট, বিশ্বকাপ বাছাই পর্ব…। সবদিক থেকেই আসরটা আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। যে চ্যালেঞ্জটা আমরা ভালোভাবে নিচ্ছি এবং আশাবাদী আমরা সফল হব।’
প্রাথমিক ক্যাম্পে ডাক পাওয়া ৩৭ খেলোয়াড় নিয়ে টুর্নামেন্টের আগ পর্যন্ত অনুশীলন চলবে বাংলাদেশের। শনিবার শুরু হয়েছে আনুষ্ঠানিক ক্যাম্প। আপাতত সবাই মওলানা ভাসানী হকি স্টেডিয়ামের ডরমিটরিতে থেকে অনুশীলন করছেন সবাই।
করোনা পরীক্ষায় নেগেটিভ হওয়া সাপেক্ষে শুক্রবার থেকে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর বঙ্গবন্ধু ঘাঁটিতে আবাসিক ক্যাম্পে উঠবেন খেলোয়াড়রা। তবে স্টিক-বলের অনুশীলন হবে মাওলানা ভাসানি স্টেডিয়ামেই। বিমানবাহিনীর ঘাঁটিতে থেকে ফেডারেশনের ব্যবস্থাপনায় স্টেডিয়ামে আসবেন খেলোয়াড়রা।
টুর্নামেন্ট শুরু ও শেষের দিনক্ষণ চূড়ান্ত হলেও এখনো গ্রুপিং হয়নি। দেশ রূপান্তর




