প্রবাসশিরোনাম

জাপানীরা কেমন : পর্ব – 20

জাপানের ওকিনাওয়াতে একের পর এক বেশ কিছু অভাবনীয় এবং অপ্রত্যাশিত নাটক হচ্ছে। এই দ্বীপটি জাপানের একটি অন্যতম সমৃদ্ধ দ্বীপ। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় রক্তাত্ত এক যুদ্ধে আমেরিকা দ্বীপটি দখল করে নিয়েছিল। আর সে যুদ্ধ যে কেমন ভয়াবহ ছিল তার উপর অনেকের ধারণা নেই। ওকিনাওয়া যুদ্ধকে অনেক ঐতিহাসিকগণ “মহাযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আরেকটি মহাযুদ্ধ” বলে আখ্যায়িত করেছেন! ১৯৪৫ সালের এপ্রিল মাসের ১ তারিখে ওকিনাওয়া কব্জাগত করতে আমেরিকার যৌথ বাহিনী তাদের দশম সেনাবাহিনীর চারটি ডিভিসন আর নৌবাহিনীর দু’টি ডিভিসন ছাড়াও বিমান বাহিনী যুক্ত করেছিল।

ওকিনাওয়া মিলিটারি এয়া বেইজ : ছবি- ওয়েব সাইট

ভয়াবহ এই যুদ্ধ ৮২ দিন যাবত চলেছে। তাতে উভয় পক্ষের সেনাবাহিনীর এতো ক্ষতি হয়েছে যে – যা অভাবনীয়! আমেরিকার ১৮,০০৯ জন সৈন্য মৃত্যু বরণ করেন এবং ১২,৫০০ জন সৈন্য নিহত বা নিরুদ্দেশ হয়েছে। অন্যদিকে জাপানের ৭৭,১৬৬ সৈন্যে নিহত হয়।
অনেকের মতে সঠিক কত জন জাপানী সৈনিকের মৃত্যু হয় তার সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি। আমেরিকা যৌথ বাহিনী যখন দ্বীপটি দখল করে নেয় তখন ১১০,০৭১ জন জাপানী সৈনিকের মৃতদেহ গণনা করা হয়েছে তদুপরি ৪২,০০০ থেকে ১৫০,০০০ সাধারণ নাগরিক মৃত্যু বরণ করেছেন। সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে ১৮ বৎসরের উর্ধে যাদের বয়স তাদের হত্যা করা হয়েছে। আর ১৮ বছরের নিম্নে হবে এমন ছাত্র ছাত্রীদেরকেও হত্যা করা হয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকেই আত্মহত্যা করেছে বা নিরুদ্দেশ হয়েছে। উল্লেখ্য যে যুদ্ধের পূর্বে ওকিনাওয়ার লোকসংখ্যা ছিল তিন লক্ষ। এ যুদ্ধের ইংলিশ নাম “ typhone of steel ”( লৌহ তুফান); জাপানী নাম দেয়া হয় “tetsuno ame” অর্থাৎ লৌহ বৃষ্টি!
ওকিনাওয়া যুদ্ধ শেষ হয়েছে ২২ জুন ১৯৪৫ সালে। তারপর দ্বীপটি ১৯৭২ সাল পর্যন্ত আমেরিকার দখলে ছিল। বর্তমানে দ্বীপটি জাপানের দখলে থাকলেও আমেরিকার শক্তিশালী একটি সামরিক ঘাটি এখন পর্যন্ত রয়েছে। সে ঘাটিটি সরিয়ে নেয়ার জন্যে ওকিনাওয়ার জনসাধারণ কয়েক দশক যাবত কেন্দ্রীয় সরকারের উপর চাপ দিচ্ছে। বর্তমান ওকিনাওয়ার গভর্নর মিঃ অনাগা ঘাটিটির বিরুদ্ধে ব্যাপক জনমত গড়ে তুলেছেন। কিন্তু জাপান সরকার এখনো এই সামরিক ঘাঁটিটি সরাবার ব্যাপারে কিছুই করতে পারেনি।
অনেকের মনে হয়তো প্রশ্ন জেগেছে কেনো ওকিনাওয়াবাসি আমেরিকার এই ঘাঁটির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে! তার কারণ হল এ ঘাটির সৈন্য কর্তৃক জাপানী মহিলা ধর্ষণ অনেক বার হয়েছে। যা নাকি স্থানীয় জনসাধারণের মনে তীব্র ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কয়েক সাপ্তাহ পূর্বে ২০ বৎসর বয়সের অফিস কর্মি একজন মহিলাকে আমেরিকার ঘাটিতে কর্মরত একজন অসামরিক সদস্য চাকুদিয়ে আঘাত করে তারপর গলাটিপে হত্যাকরে নির্জন এক জঙ্গলে ফেলে দিয়ে আসে। এই নিয়ে মহাতুলকালাম কান্ড চলছে এখন জাপানে। প্রেসিডেন্ট ওবামার সাথে দেখাকরে প্রধান মন্ত্রী মিঃ আবে এই ব্যাপারে নালিশ করেন। ওবামা জাপান সরকারকে জাপানী আইনের আওতায় হত্যাকারীকে বিচার করার অনুমতি দিয়েছেন। জাপানের পুলিশ হত্যাকারীকে গ্রেফতার করেছে এবং জিজ্ঞাসাবাদ করছে। হত্যাকারী মহিলাকে হত্যাকরার কথা স্বীকার করেছেন।
মহিলাটিকে বিনা দুষে হত্যা করেছে। এই দুঃখ প্রত্যেকটি জাপানীর মনে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। কয়েকদিন পূর্বে মদ্য পান করে মাতাল হয়ে ঘাটিটির এক লোক গাড়ি ড্রাইভ করার সময় অন্যের গাড়িতে ধাক্কা মারে এতে দু’জন জাপানী আহত হয়েছে। এটা হল আরেকটি সমস্যা। আমেরিকা অবশ্য এই ব্যাপারে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং আমেরিকার সৈন্যদের ওকিনাওয়াতে মদ্য পান নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।
জাপানের বিশিষ্ট মহলে এই সকল কান্ড-কর্মে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। জাপানের বিখ্যাত দৈনিক পত্রিকা গত ২৪ তারিখে সেটার নিয়মিত ‘তেচো কলাম’ এ দুঃখ জনক একটি নিবন্ধন প্রকাশ করেছে।নিম্নে নিবন্ধনটির অনুবাদ যথাযথ অনুবাদ করা হয়েছে। আশাকরি পাঠকদের তা পড়ে ভাল লাগবে।
ওকিনাওয়ার যুদ্ধ : ছবি ওয়েব সাইট

“ একজন স্কুল শিক্ষক তার প্রাক্তন এক ছাত্রের বাড়িতে গিয়ে তার মায়ের সাথে দেখ করলেন! ছাত্রটির মা শিক্ষকটিকে জানালেন যে তার ছেলেটি অসুখে মারা গিয়েছে। শিক্ষকটিকে তার পুত্র জীবিত অবস্থায় যখন স্কুলে যেতো তখন তিনি তার সন্তানটিকে যে স্নেহ ও মমতার চোখে দেখতেন সে জন্যে শিক্ষকটিকে অনেক ধন্যবাদ দিলেন। যখন তারা দু’জন কথা বলছিলেন তখন সন্তানের মা অতি শান্ত ও মৃদু হাসি মুখে কথা বলছিলেন। এই অংশটি বিখ্যাত লেখক Ryunosuke Akutagawa এর একটি ছোট গল্প “রুমাল” থেকে নেয়া হয়েছে।
শিক্ষকটির হাতে যে পাখাটি ছিল তাঁর ছাত্রের মৃত্যুর কথা শুনে সেটি তার হাত থেকে পড়ে গেল। টেবিলের নিচ থেকে যখন তিনি পাখাটি তুলে নিচ্ছিলেন তখন মহিলার হাঁটুর দিকে লক্ষ করলেন। যে রুমালটি মহিলা কোলের উপর রেখেছেন সেটি তখন প্রচন্ডভাবে আন্দোলিত হচ্ছিল! বলাই বাহুল্য, “ মহিলা তখন কাদঁতেছিলেন এবং তার সমগ্র দেহটি ভীষণ আন্দোলিত হচ্ছিল!”
গতকাল অর্থাৎ এই বছর প্রথম বার টোকিও র আবহাওয়ার তাপমাত্রা ছিল ৩০ ডিগ্রী। আমরা সারা বৎসর পকেটে রুমাল রাখি কিন্তু এই ঋতু যখন আসে তখন পকেটে না রেখে সবাই সেটি হাতে রাখে। এই পরিবর্তনের কথা আমি ভাবি। একটি রুমাল ঘাম মুছবার জন্যে রাখা সুখের কথা। প্রচন্ড আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা এখন দেশব্যাপী হচ্ছে। ওকিনাওয়াতে একটি অসহায় মহিলা অফিস কর্মচারীকে – যার বয়স মাত্র ২০ বৎসর – তাকে হত্যাকরে একজন আমেরিকান সৈনিক জঙ্গলে ফেলে দিয়ে এসেছে। মহিলা আমেরিকার ঘাঁটিতে কাজ করতো।
সম্প্রতি টোকিওতে ২০ বৎসর বয়সের একজন কলেজের ছাত্রী এবং আইডল গায়িকাকে একজন পুরুষ চাকু দিয়ে আঘাত করেছে। লোকটি বলেছে যে সে নাকি গায়িকাটির একজন ভক্ত। এই গায়িকা এখন হাসপাতালে এবং তার অবস্থা মারাত্মক। যখন একের পর এক জীবন্ত বলি হচ্ছি। তখন তাদের মা এবং আত্মীয় স্বজনের চোখের পানিতে ভিজা রুমাল শুকাবার সময় হয়তো আসবে না।
কবি ইয়ুরিকো কুবতা এর লেখা একটি কবিতা এই রকমঃ
“ পান্ডুর নীল বর্ণের রুমাল –
আমার হাতের উপর বিস্তৃত,
জীবন মোড়িয়ে রাখতে আমার-
এটাই হয়তো যথেষ্ট”
এর চেয়ে দুঃখজনক আর কিছু নেই। যখন একটি রুমাল দিয়ে কারো সন্তানকে মোড়ানো হয়!”

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button