প্রবাস

জাপানীরা কেমন:পর্ব-২১

আজ জাপানের সর্ববৃহৎ দ্বীপ ‘সাদোকাসিমা’ ভ্রমনের উপর কিছু ধারণা দিবার ইচ্ছা। এই দ্বীপটিকে জাপানীরা ‘সাদো’ বলে। কয়েক বৎসর পূর্বে সাদো ভ্রমনে গিয়েছিলাম। সাদো শুধু সাধারণ একটি দ্বীপ নয়। দ্বীপটির ইতিহাস পড়ে জানতে পেরেছি যে এই দ্বীপের ইতিহাস অনেক প্রাচীন। অনেক উজ্জ্বল এবং গভীর রহস্যময় দ্বীপ হল জাপানের সাদো দ্বীপ।
টোকিওর দু’শত কিলোমিটার উত্তরে নীগাতা বিভাগ। এই বিভাগটি জাপানের সুস্বাদো চাউল ‘কশিহিকারি’ উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত। তাছাড়া জাপান সাগরে প্রচুর মাছ পাওয়া যায়। নীগাতা বন্দর অন্যতম বড় একটি মৎস্য বন্দরের জন্যেও বিখ্যাত। প্রতিদিন ভোর ৬টায় মাছের অকশন হয়। টনে টনে মাছ বিক্রি হয়ে যায় এক ঘন্টারও কম সময়ে। কিন্তু নীগাতা বিভাগটি মূল ভুখন্ডের সাথে যুক্ত হলেও বর্তমানে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে জাপান সাগরের মধ্যখানে দেশটির সর্ববৃহৎ বিখ্যাত দ্বীপ হল ‘সাদো’। খুব সম্ভবত নীগাতার চেয়েও সাদো দ্বীপের ইতিহাস অনেক প্রাচীন।

সৌন্দর্যমন্ডিত সাদাকসিমো দীপ

এটি একটি পার্বত্য দ্বীপ, আয়তন ৮৫৭ বর্গ কিলোমিটার। আট খৃষ্টাব্ধ থেকে সাদোর অভিজাত সংস্কৃতির কথা ইতিহাসে লিখিত আছে। এক সময় রাজবন্দী ও দন্ডপ্রাপ্ত লোকদের সাদোতে দ্বীপান্তরিত করা হত। এই দ্বীপটিতে ‘এদো আমলে’ ১৭০০ থেকে ১৮০০ শতাব্দীতে ইতিহাস লিখিত সামুরাই যুদ্ধাদের শাসনামলে দ্বীপটির অর্থনৈতিক অবস্থার ব্যাপক উন্নতি হয়। তখন সাদোর স্বর্ণপর্বত ‘কিনজান’ আবিস্কৃত হয়। এই পর্বতটি আসলে একটি স্বর্ণখনি। তার উপরিভাগ থেকে পাতাল পর্যন্ত স্বর্ণ রয়েছে। ১৯৮৯ সালে স্বর্ণ উত্তোলন বন্ধ করে দেওয়া হয়। কারণ, বিশাল আকৃতির কালোপাথর গুড়াকরে আগুনের তাপে গলিয়ে যে পরিমান স্বর্ণ পাওয়া যায় এবং খরচ হয় তা অনেক বেশি বিধায় উত্তোলন বন্ধ রাখা হয়েছে। বর্তমানে সেটি একটি বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র। তিনশত বছর পূর্বে কী পদ্বতিতে সুরঙ্গ কেটে শ্রমিকেরা কাজ করতো তা মানুষের আকৃতির অনেক রবট তিরী করে সুরংগগুলির স্থানে স্থানে বাসানো হয়েছে। এখন পর্যটকেরা সুরংগ দিয়ে প্রবেশ করে শ্রমিকেরা কেমন এমন কঠোর পরিবেশে কাজ করতো তা দেখে আন্দাজ করতে পারে। সত্যিকার অর্থে শ্রমিকেরা কৃতদাসের মতো অমানুষিক শ্রম দিতো। অসুখ-বিসুখ হলে চিকিৎসার ব্যবস্থা ছিল না। টিবি এবং এজমাতে আক্রান্ত হয়ে তাদের জীবনের অর্ধ-সময়ে মৃত্যু বরণ করত। আর, তারা দন্ডপ্রাপ্ত নির্বাসিত লোক ছিল বিধায় তাদের কোন প্রতিবাদের ভাষাও ছিলনা। তাছাড়াও মূল ভূখণ্ডে যারা গৃহহীন বেকার ছিল তাদের ধরে সাদোর স্বর্ণ খনিতে কাজ করতে পাঠিয়ে দিত।
ভারতের আন্দামান দ্বীপের সাথে সাদোর তুলনা করা যায়। আন্দামানেও দন্ডপ্রাপ্তদের দ্বীপান্তরিত করা হত এবং তারা সেখান থেকে আর ফিরে আসতো না। যে সকল বিখ্যাত ব্যক্তিদের এবং রাজবন্দীদের সাদোতে নির্বাসনে পাঠিয়েছিল তাদের মধ্যে প্রথম জন ছিলেন একজন বিদ্রোহী কবি। তার নাম Hozomi no Asomi Oyu তাঁকে ৭২২ সালে সাদোতে পাঠিয়েছিল। তারপর, জাপানের একজন সম্রাট নাম Juntoku ১২২১ সালে সাদোতে নির্বাসনে পাঠিয়েছে। হতভাগ্য এই সম্রাট নাকি Jokyo যুদ্ধের সময়ে পক্ষপাতিত্য করেছিলেন। তাই তাঁকে দ্বীপান্তরিত করা হয়। তিনি দীর্ঘ ২২ বছর সাদোতে থেকে মৃত্যু বরণ করেন। তিনি যে বাড়িটিতে থাকতেন সেটি এখন একটি পর্যটন স্পট।
তারপর Nichiren নামে একজন বুড্ডিষ্ট মংক কে সাদোতে নির্বাসনে পাঠিয়েছিল। নির্বাসনে থেকেও তিনি কয়েকটি বিখ্যাত মন্দির স্থাপন করেছেন।
তাছাড়া Noh ড্রামাটিষ্ট Zeami Motokyo কে ১৪৩৪ সালে সাদোতে নির্বাসনে পাঠিয়েছে।
এবার সহ সাদোতে আমার তৃতীয় বারের জন্যে আসা হয়। দ্বীপটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এতো সুন্দর যে নিজ চোখে না দেখলে বুঝা যাবে না। তাই প্রতি বছর গোল্ডেন উইক হলিডে তে সাদোতে চলে আসি।
সাদো দ্বীপের অন্যতম আকর্ষণ হল প্রায় বিলুপ্তপ্রায় বক পাখী ‘তোকি’
 
সাদো দ্বীপের অন্যতম আকর্ষণ হল প্রায় বিলুপ্তপ্রায় বক পাখী ‘তোকি’। তার ইংলিশ নাম ‘Crested ibis’ (Nipponia nippon);। এই বকটির সৌন্দর্যই তাদের বিলুপ্তির পথে নিয়ে যায়। বকটির রঙ পিংক বর্ণের। কথিত আছে যে সাদোতেই এই বকের আদি জন্মস্থান। বকটির পালক সুন্দর বিধায় বাজারে উচ্চমূল্যে বিক্রয় হতো। তাই বকটি মেরে পালকের ব্যবসা করত সাদোর কিছু পালক ব্যবসায়ি। যার ফলে সাদোতে পাখিটির সংখ্যা মাত্র ১টিতে গিয়ে পৌছে। যখন জাপানের বন ও পশু পাখি সংরক্ষণ মন্ত্রণালয় এই খবর পেল – তখন তোকি বক মারা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হল। কিন্তু অনেক দেরী হয়ে গেছে। যে বকটি ছিল সেটি ধরে পরীক্ষাকরে জানা গেলো যে তা একটি মেয়ে বক। তাই সরকার কোটি টাকা বাজেট করে পাখিটিকে সংরক্ষণ করার জন্যে এক পাইলট প্রজেক্ট হাতে নেয়। চীনে কিছু তোকি বক সংরক্ষণে ছিল। সেখান থেকে কিছু বক এনে তোকির বংশ বৃদ্ধি করার জন্যে বিজ্ঞানীরা আদাজল খেয়ে নামল। বিশাল এলাকা নিয়ে প্রজেক্ট তৈরী করা হল। সেখানে জালি তারের বেড়া দেয়া বড় বড় কিছু ঘরে তাদের থাকার বন্দোবস্ত করা হল। আস্তে আস্তে কিছু পাখি ডিম দিল এবং বাচ্চাও হল। সেগুলিকে বড় করে ২০০৮ সাল থেকে কিছু তোকি বক প্রকৃতিতে ছাড়তে লাগল। যে গুলি ছাড়া হল সেগুলির পায়ে যান্ত্রিক ট্যাগ লাগিয়ে ছেড়েছে। তারা কোথায় উড়ে যায় এবং বাসা বাঁধে তাও বিজ্ঞানীরা দেখতে পায়। প্রথম দিকে যেগুলি বনে রয়েছে ও বাসা বেঁধে ডিম দিয়েছে সেগুলি থেকে কোন বাচ্চা হয়নি। কিন্তু আজ থেকে মাস খানেক আগে জানা গেল যে জঙ্গলে একটি তোকির বকের বাসাতে ডিম থেকে একটি বাচ্চা ফুটেছে। সেটাই আশার কথা। বেশ কিছু বক জঙ্গলে ছাড়া হয়েছে এবং বিজ্ঞানীরা তাদের পর্যবেক্ষণ করছে। দ্বীপটির ডোবা ও লেইকে মাছ ধরা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে যাতে পাখিরা সেখান থেকে সহজে আদার খেতে পারে। প্রথমবার গিয়ে অনেক তোকি বকের ফটো নিয়েছিলাম। কিন্তু এবার বৃষ্টির জন্যে যেতে পারিনি। প্রথমবার ক্যামেরাতে অনেক ফটো নিয়েছিলাম। এবার ফটো নিতে পারিনি।
একসময় কিছু জাপানী তরুণ তরুণীকে কমিউনিষ্ট উত্তর কোরিয়ার এজেন্টগণ জাহাজে করে এসে সাদো থেকে ছিনতাই করে নিয়ে গিয়েছিল। সাদোদ্বীপ উত্তর কোরিয়া থেকে জাপানের মূল ভূখণ্ড থেকে কাছে বিধায় সেখান থেকে এসে তাদের ছিনতাই করে নিয়ে যায়। তাদের মধ্যে হিতোমি সোগা নামে এক তরুণী ছিল।
অন্যদিকে কোরিয়া যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে চার্লস রোবার্ট জেনকিন্স নামক একজন আমিরাকান সৈনিক উত্তর কোরিয়ার সৈন্যদের হাতে বন্দি হয় বা পালিয়ে যান। উত্তর কোরিয়াতে জেনকিন্স এর সাথে হিতোমির দেখা হয়। পরে দু’জনে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ২০০৪ সালে দু’জনে কৌশলে ভিন্ন পথ অবলম্বন করে জাপানে চলে আসেন। মিঃ জেনকিন্স এখন সাদোর একটি টুরিষ্ট স্পটে কর্মরত আছেন। তার স্ত্রী হিতোমি এখন সিটি কাউন্সিল অফিসের কর্মচারি। প্রথমবার যখন সাদো ভ্রমনে যাই তখন জেনকিন্স এর সাথে হাত মিলিয়ে কথা বলেছিলাম।
এখন সাদোতে আমাদের যাওয়ার সময়ের কথা বলব। ৬ মে আমরা ডাঃ মিসেস ফুজির গাড়িতে সকাল ১১ টায় রওয়ানা দেই। ডাঃ ফুজি ৬ মাস পূর্বে মাজদা ব্রান্ডের অত্যাধুনিক ডিজেল এঞ্জিন চালিত গাড়িটি কিনেছেন। তিনি আমাদের শহর থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে একটি ক্লিনিক পরিচালনা করেন। ডাঃ ফুজি আমাকে ড্রাইভ করতে বললেন। কথা হল আমি ক্লান্ত হলে তিনি ড্রাইভ করবেন। সময়ের পরিবর্তনের সাথে মিল রেখে জাপানের গাড়িতেও অত্যাধুনিক ডিভাইস এবং সেন্সার যুক্ত করা হয়েছে। আমরা কান্‌এৎচু এক্সপ্রেস ওয়েতে উত্তর দিকে যাচ্ছি। সাধারণত এক্সপ্রেস ওয়েতে আমি ১০০ থেকে ১২০ কিলোমিটার বেগে গাড়ি চালাই। কিন্তু এবার তিনি ৮০ কিলোমিটার এর উপর ড্রাইভ করতে নিষেধ করলেন। বললেন, “আমি দু’বার ওভার স্পীডে গাড়ি চালিয়ে ধরা পড়েছি।” তিনি প্যানাল্টি প্রতিবার দিয়েছেন ৭৫,০০০/- ইয়েন করে। শুধু প্যানাল্টি দিয়েই মুক্ত হওয়া যায় না। তাঁকে নতুন করে পরীক্ষা দিয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্‌স নিতে হয়েছে। এবার তিনি খুবই সাবধান। বললেন, “বাসাতে গিয়ে পুলিশ হাজির হয়। কী ঝামেলা!”
সাধারণত আড়াই ঘন্টায় হাই স্পীডে গাড়ি চালিয়ে নীগাতা বন্দরে পৌছা যায়। কিন্তু কম স্পীডে চালানোর কারণে সময় আরো বেশি লেগেছে। নীগাতা অঞ্চলের পর্বতগুলির উপর এখনো বরফ রয়ে গেছে। একটি সার্ভিস সেন্টারে গিয়ে লাঞ্চ খেয়ে পর্বতের এবং পার্বত্য নদীর ফটো নিলাম।
নিগাতা বন্দর

আমরা বন্দরে যখন পৌঁছলাম তখন বিকাল সাড়ে চারটা বাজে। টিকেটের ব্যবস্থা করে আমরা সবাই গাড়িতে এসে বসলাম। জাহাজের নাম “সাদো কিসেন”। তার সামনের দিক খুলে গেল। আমরা গাড়ি সহ জাহাজে উঠলাম। নির্দিষ্ট স্থানে গাড়ি রেখে লিফট দিয়ে পাঁচ তলায় এসে আমরা আমাদের নির্দিষ্ট রুমে প্রবেশ করলাম। দুই থেকে আড়াই ঘন্টার জার্নি জাহাজের রুমটি যেনো ফাইভ ষ্টার হোটেলের মতো একটি রুম। চা কফি সোফাসেট ইত্যাদি সবই আছে। আমরা কফি বানিয়ে খেলাম। জাহাজটিতে ভেন্ডিং মেশিন থেকে দোকান এবং রেষ্টুরেন্ট সবই আছে। প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণীর যাত্রীদের কামরা দেখতে গেলাম। এমন কামরাও আছে যে ফ্লোরে সারি সারি বেড রয়েছে তাতে শুয়ে আছে অনেক যাত্রী।
সন্ধ্যা সাতটায় আমরা পৌছলাম। সাদোতে ডাঃ ফুজির যে সেকেন্ড হাউজটি আছে। তাতে আমরা থাকব। মাল সামানা রেখে আমরা রেষ্টুরেন্টে ডিনার খেতে গেলাম। বন্দরের নিকট অনেক দোকান পাট রেষ্টুরেন্ট রয়েছে। গিয়ে দেখি সবই বন্ধ। একজন লোক বলল যে সব দোকান সন্ধ্যা ছ’ টাতে বন্ধ হয়ে যায়। একজন লোককে কোথায় গেলে খুলা রেষ্টুরেন্ট পাব জিজ্ঞাসা করাতে বলল – এক কিলোমিটার দূরে একটি চাইনীজ রেষ্টুরেন্ট আছে। দেরী না করে আমরা গাড়িতে সে রেষ্টুরেন্টে গিয়ে ডিনার খেলাম।
সাদো বন্দরেও একটি মাছের অকশন সেন্টার আছে। রাতের বেলায় ট্রলারে মাছ ধরে সকালে অকশন সেন্টারে নিয়ে আসে। অকশন সেন্টারের কর্মচারীরা মাছগুলি বাছাই করে সাজিয়ে প্লাষ্টিকের তৈরী বড় ঝুড়িতে রাখে। আমরা আগেই ফোন করে অকশন সেন্টার দেখতে যাওয়ার অনুমতি নিয়েছিলাম। কারণ, পার্মানেন্ট মেম্বার ছড়া অন্য কেউ মাছের অকশন দেখতে যেতে পারে না। পরদিন ভোর ৫ টায় ঘুম থেকে উঠে আমরা অকশন সেন্টারে গেলাম। বড় ট্রলারে অনেক মাছ এসেছে। বাছাই করে ঘরের ফ্লোরে রাখা হয়েছে। আমরা পৌছার কিছুক্ষণ পরেই অকশন শুরু হল। মৎস্য ব্যবসায়ীরা জড়ো হয়ে বিড করে মাছ কিনছে। এতো দ্রুত অকশনের কাজ শেষ হল যে আমরা বিস্মিত হলাম। যে সকল মাছ রাখা ছিল সেগুলির মধ্যে শামুক, ঝিনুক, অক্টোপাস, কাঁকড়া, ফুগো ফুটকা ছাড়াও বিভিন্ন রকম সামুদ্রিক মাছ ছিল। কিন্তু টুনা মাছ দেখতে পেলাম না। শুনেছি টুনা মাছ নাকি নীগাতা বন্দরে চলে যায়। বড় একটি টুনা প্রায় এক কোটি টাকাতে টোকিও অকশনে বিক্রয় হয়েছিল। সেটি মাছটি টিভিতে দেখিয়েছিল। টুনা জাপানীদের নিকট সবচেয়ে প্রিয় এবং মূল্যবান মাছ।
আজ বৃষ্টির জন্যে তোকি বক প্রজনন সেন্টারে যাওয়া ক্যান্সেল করলাম। ইচ্ছা ছিল তোকির কিছু ফটো নিবো। কিন্তু দিনটি ঘরে বসে কাটিয়ে দেই এটাও মনে সায় দেয় না। ডাঃ ফুজি বললেন সাদোতে একটি প্রাচীন বৌদ্ধ মন্দির আছে দেখতে যাব কি না? তিনি আমাদের ৩৫ বছরের নিকটতম বন্ধু। একজন শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ। তাঁর স্বামিও একই মেডিক্যাল কলেজের সহপাঠি ছিলেন। আমার সন্তানদ্বয়ের চিকিৎসা তার স্বামি করেছেন। কিন্তু মাত্র ৪৮ বৎসর বয়সে তাঁর স্বামি ক্যান্সারে মৃত্যু বরণ করেন। তারপর তিনি ক্লিনিকটির পরিচালনার দায়ীত্ব নেন। তাদের একমাত্র ছেলেটি তখন মেডিক্যালের প্রথম বর্ষের ছাত্র। জাপানে অনেক ভাল মন্দ দুই কিসিমের বন্ধু পেয়েছি। কিন্তু জাপানে আজো ৩৫ বছরেও সম্পর্ক অটুট রয়েছে ডাঃ ফুজির সাথে। তাঁর ছেলেটি ডাক্তার হয়েছে। এখন সে ইয়কোহামা মেডিক্যাল কলেজের ডাক্তার। সে ও শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ এবং সাপ্তাহে একদিন এসে তার মায়ের ক্লিনিকে কাজ করে। সাদো দ্বীপে তার স্বামির জন্ম স্থান। তার মৃত্যুর পর সাদোতেই তার ভস্ম কবরে রাখা হয়। বছরে দু’তিন বার এসে তিনি কবরে ফুল দিয়ে যান এবং দাঁড়িয়ে হাত জোর করে বলেন, “আমি আবার তোমার জন্যে ফুল নিয়ে আসব।” সত্যি কথা বলতে কি – এমন স্বামি ভক্ত মহিলা জাপানে খুব কম দেখেছি।

আজ আমরা ১০টার দিকে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টির মাঝেই গাড়ি নিয়ে বের হলাম। প্রায় আধা ঘন্টা ড্রাইভ করার পর মস্তবড় একটি মন্দিরের সামনে এসে নামলাম। এই মন্দিরের নাম Chokokuji Temple; এত বড় মন্দির জাপানের মূল ভূখন্ডে আর কখনো দেখি নাই। পর্বতের মাটি কেটে কয়েকটি ধাপে এই মন্দিরটি করা হয়েছে। আজ থেকে ১২০০ বৎসর পূর্বে ৮০৭ খৃষ্টাব্ধে Kubo Taishi নামে একজন বৌদ্ধ মংক মন্দিরটি স্থাপন করেছেন। মন্দিরের উঠানে দেখলাম অসংখ্য খরগোশ। সবগুলি পোষা খরগোশ। খুরগোশের দুষমন বিড়াল। কিন্তু এই মন্দিরে কোন বিড়াল নেই। তাছাড়া মন্দিরের চারিদিকে বিভিন্ন জাতের ফুল ফোটে রয়েছে। কিছু ছবি নিলাম কিন্তু বিশালাকার মন্দিরের ছবি ক্যামেরায় আনতে পারিনি। খন্ড খন্ড করে মন্দিরের ছবি নিলাম। যা দেখে সবচেয়ে আশ্চর্য হয়েছি তা হলো শুধু মাত্র একজন মংক মন্দিরটির দায়িত্বে রয়েছেন। তার বয়স প্রায় ৭০ হবে। তিনি কষ্টকরে আমাদের তিনজনকে প্রতি প্রকোষ্ঠে নিয়ে গিয়ে বিভিন্ন মূর্তির নাম ব্যাখ্যা করে বুঝালেন। হাজার বছর পূর্বের অনেক মূর্তি রয়েছে। সেগুলিকে জাপান সরকার “ন্যাশন্যাল ট্রেজার” ঘোষণা করেছেন। তাই মন্দিরটি এখন সরকারের নীয়ন্ত্রণে রয়েছে।
তিনটি ১১ মাথার মূর্তি রয়েছে। তা হল ‘কান্নন দেবীর মূর্তি। মন্দিরটির খোদ প্রতিষ্ঠাতা মংক Kobo Taishi নিজেই খুদাই করে এই মূর্তিগুলি তৈরী করেছেন। যেহেতু এগুলি স্মরণাতীতকালের চিহ্ন তাই ১৯০৬ সালে জাপান সরকার মূর্তিগুলিকে ‘জাতীয় সম্পদ’ ঘোষণা করেছেন। তারপর থেকে এই মন্দিরগুলিকে প্রতি ৩৩ বছর অন্তর বের করে দর্শকদের দেখনোর প্রথা এখনো প্রচলিত আছে।
এই মন্দিরটির ইমেজ আরো সমৃদ্ধ হয়েছে যখন জাপান সম্রাটের পরিবারের Saneoki Ogura এবং ড্রামাটিষ্ট এবং এক্‌টর Zeami Motokiyu ১৬৮৪ খৃষ্টাব্দে মন্দিরটি পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। ( সানেওকি অগুরাকে সম্রাটের আদেশ অমান্য করার জন্যে তার ২ পুত্র সহ সাদো দ্বীপে দ্বীপান্তরিত করা হয়েছিল।) তাঁরা সাদো দ্বীপে থাকাকালীন বেশ কিছু বিখ্যাত ‘হাইকু’ কবিতা লিখেছেন। সেগুলি এখনো সংরক্ষিত আছে। সে আমলে সাদো দ্বীপকে জাপানের একটি প্রদেশ হিসাবে গণ্য করা হত।
এই মন্দিরটিতে আরো কিছু বিখ্যাত মূর্তি আছে। সেগুলিকে বিভাগীয় সরকার কর্তৃক ‘কালচারেল ট্রেজার’ ঘোষণা করা হয়েছে। সেগুলির মধ্যে ‘ফুদো’ গড অব ফায়ার’ এবং ‘কোনগারা-ডজি’ অন্যতম। মন্দিরটিতে সারা বৎসর বিভিন্ন জাতের ফুল ফুটে। বিখ্যাত গাছগুলির মধ্যে প্রাচীনকালেরHase Cider, Umbrella pine রয়েছে সেগুলিকে বিভাগীয় সরকার সংরক্ষণ করছেন।
মন্দিরটিতে সারা বৎসর বিভিন্ন জাতের ফুল ফুটে (torch-azalea-branches)

Chukokuji ফুলটি হল এই মন্দিরের সিম্বল। চেরী ছাড়াও Peonies, sweet indica azeleas, torch azeleas এপ্রিল মে মাসে ফুটে। তাছাড়াও গ্রীষ্মকালে অনেক রকম ফুল ফুটে।
আমরা বৃষ্টির দিনেও অনেক সুন্দর সুন্দর ফুলের ফটো নিলাম।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button