sliderস্থানিয়

গৃহপরিচালিকা নয়নী হত্যা মামলা ও ময়নাতদন্তের রিপোর্ট নিয়ে ছিনিমিনি, পাশে দাঁড়াল মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা

শিবগঞ্জ (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) সংবাদদাতা: ঈদের ৪/৫ দিন আগে হাতের ইশারায় নয়নী জানান তাকে নজরবন্দী করে রাখা হয়েছে। কোথাও যেতে বা কারো সাথে কথা বলতে নিষেধ আছে। সে ভাল নয় বলেই চলে গেলো। ঈদের আগের রবিবার মেহবুুব্ খোদা নোমানের সাথে তার খালা জ্যোতির সাথে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে জ্যোতি নোমানকে উদ্দেশ্যে করে বললো তোর এ অন্যায় কাজের জন্য আমরা সবাই বিপদে পড়তে যাচ্ছি।

গত ১ জুন শিবগঞ্জের মোহনবাগ এলাকায় ১৫ বছরের নয়নীকে ধর্ষণ ও হত্যার বর্ণনা দিতে গিয়ে মোহনবাগ গ্রামের ঘটনাস্থল হাজী রইস উদ্দিনের প্রতিবেশী নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অসহায় ও নির্যাতিত মহিলা আরো জানান, নয়নী ছোট থেকে হাজীর বাড়িতে লালিত পালিত হলেও একটি বড় হলে তাকে তার মেয়ে জামাইয়ের বাড়িতেও রাখতো। সাম্প্রতিক সময়ে তাকে এক স্থানে বেশী দিন থাকতে দিতো না। জ্যোতির বাড়িতে নয়নী গৃহপরিচারিকা হিসাবে থাকার সময় তার বড় বোন মুনমুনের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছেলে মেহবুব এ খোদা নোমান খুব বেশি যাতায়াত করতো এবং নয়নীকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে শারীরিক সম্পর্ক করে। ফলে সে গর্ভবর্তী হয়ে গেলে নোমান ও নানা হাজী রইস উদ্দিনের পরিবার জানতে পেরে গর্ভপাত ঘটাতে তারা সবাই তার ওপর পাশবিক নির্যাতন চালিয়েও গর্ভপাতে নয়নী কে রাজী করতে না পেরে হত্যার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। নয়নী বুঝতে পেরে ঘটনার কয়েক ঘন্টা পূর্বে হাজির বাড়ি থেকে পালানোর চেষ্টা করলে মেহবুব এ খোদা নোমান তাকে রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে আসে। এরপর নয়নীকে মোটরসাইকেলে এলাকার বিভিন্ন স্থানে ঘোরাঘুরি করে। এরপর নয়নীকে বাড়িতে নিয়ে এসে দো-তলার রুমে দুপুর আড়াইটার দিকে হত্যা করে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে লাশ সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলিয়ে আত্মহত্যার নাটক সাজায় হাজী রইস উদ্দিন ও তার পরিবার। এরপর এলাকার এক শিশু বাচ্চাকে হাজীর স্ত্রী ডেকে জানালা দিয়ে দেখতে বলে। সে এসে জানায় যে নয়নী ঝুলে আছে। এরপর হাজীর স্ত্রী আঙ্গুরী বেগম ও পার্শ্ববর্তী খাদিজা খাতুনকে সাথে নিয়ে ঝুলন্ত লাশ নিচে নামায়। ওই মহিলাসহ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরো কয়েকজন জানান নয়নী যে টুলের উপর দাঁড়িয়ে সিলিং ফ্যানে ফাঁসির ওড়না বাঁধে সেখানে কোন ভাবেই তার পক্ষে নিজ হাতে ফাঁসির দড়ি বাঁধানো সম্ভব নয় কারণ নয়নীয়র উচ্চতা অনুযায়ী টুলের ওপর দাঁড়িয়ে ফ্যান হাতে পাওয়া কোন ভাবেই সম্ভব নয় ।দুপুর আড়াইটার দিকে নয়নীকে হত্যা করার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত পুলিশকে কিছু না জানিয়েই গোপনে লাশ দাফনের জন্য আরেক গৃহপরিচালিকা বিজলী বেগমের ছেলেকে দিয়ে কাফনের কাপড় কিনে আনায় । কিন্তু ওই সময় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে রাত ১১টার দিকে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হওয়ায় তা সম্ভব হয়নি। নয়নীর নিকটাত্মীয় আমির চাঁদ বলেন, ঘটনার দিন হাজি রইস উদ্দিনের ডাকে তার বাড়িতে আসলে নয়নীকে খাট বা চৌকির ওপর মৃত অবস্থায় দেখি। তার শরীরে আঘাতের দাগ দেখেই বুঝতে পেরেছি এটি হত্যা কান্ড। ওই সময় হাজী রইসউদ্দিন আমার কাছে তার লাশ দাফনের অনুমতি চাইলে আমি অনুমতি না দেয়ায় বাইরে আসতে দেয়নি। আমি গোপনে সেখান থেকে সরে পড়ি। ওই মহিলা সহ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক প্রতিবেশী জানায়, নয়নীকে হত্যার পওে পুলিশ না আসা পর্যন্ত মেহবুব এ খোদা নোমান বিভংস চেহারা নিয়ে দেশীয় অস্ত্র হাতে বাড়ির সদর দরজায় দাঁড়িয়ে থেকে কাউকে বাড়িতে প্রবেশ করতে দেয়নি। অসহায় মহিলা জানান, রইসউদ্দিন এর আগেও শিবগঞ্জ পৌরসভা এলাকার এক অসহায় কিশোরী ও নওগাঁর এক অসহায় কিশোরী রইসউদ্দিন তার বাড়িতে গৃহপরিচালিকা হিসাবে থাকার সময় শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়। এদের মধ্যে শিবগঞ্জের কিশোরীকে দুই লক্ষ টাকা দিয়ে ঘটনা ধামাচাপা দেয় এবং অন্যজন ভয়ে ঢাকা পালিয়ে যায়। বর্তমানে সে গার্মেন্টসে চাকুরী করছে। তারা আরো জানায়, মোহনবাগ এলাকার বেশীর ভাগ অসহায় ও দু:স্থ পরিবার তাদের ভয়ে আতংকিত। কারণ তারা কোন ভাবে তাদের দ্বারা নির্যাতিত।

ময়না তদন্তের পর পরিবারের কাছে লাশ হস্তান্তরের পর নয়নীর নিকটতম আত্মীয় মোস্তাকের স্ত্রী আকলিমা বেগম রুবি ও বেদানা জানান গোসল দেয়ার সময় আমরা নয়নীর শরীরে একাধিক আঘাতের দাগ, থুথনীর নীচে আঘাতের দাগ ও এসিডে ঝলসানোর দাগ দেখেছি। গোসলের সময় আমি স্পষ্ট বুঝতে পেরেছি যে নয়নীকে ধর্ষণ করলে সে গর্ভবতী হয়ে গেলে গর্ভপাত ঘটাতে ব্যর্থ হয়ে তাকে হত্যা করে ঘটনা ধামাচাপা দিতে ফাঁসিতে ঝুলাইযেছিল। আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি এটি হত্যাকান্ড। আমরা এই হত্যার বিচার চাই।

গ্রাম্য ডাক্তার রেজাউল হক চৌধুরী বলেন, “নয়নীর হত্যা কান্ডের ব্যাপারে আমি ও তার দাদা সোহবুল হক এজাহার দিতে থানায় গেলে পুলিশ আমাদের সাথে দূব্যবহার করে। অবশেষে শিবগঞ্জ সচেতন শিক্ষার্থী সমাজের চাপাচাপিতে গত ৭ জুন থানা মামলা নিতে বাধ্য হয়। মাত্র একজন আসামীকে পুলিশ গ্রেফতার করে। মামলার বাদী আকলিমা বেগম জানান,আসামীরা প্রকাশ্য ঘুরে বেড়ালেও পুলিশ তাদেরকে ধরছে না। মামলার তদন্তকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করছে। পোষ্ট মর্টেমের রিপোর্ট নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। আমারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।

তবে মামলার তদন্ত কারী কর্মকর্তা এস আই প্লাবন তাদের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, একজন আসামীকে গ্রেফতার করে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। যা তদন্তের স্বার্থে বলা যাচ্ছে না। ছয়জন আসামী দুই মাসের জন্য হাইকোট থেকে জামিন নিয়েছে। একজন পলাতক রয়েছে।

চাঁপ্ইানবাবগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালের সিভিল সার্জন এস এম সাহাবুদ্দিন জানান, লাশের নমুনা সংগ্রহ করে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য ঢাকা পাঠানো হয়েছে। বাকী টুকু জেলা পুলিশ সুপারকে দেয়া হয়েছে। তবে ঢাকা থেকে রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত সঠিক কিছু বলা যাবে না।

এদিকে মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক এ্যাডভোকেট মো: মোয়াজ্জেম হোসেন মেহেদী বলেন,আইন সবার জন্য সমান। নয়নীর ধর্ষণ ও হত্যা কান্ডের ঘটনায় নয়নীয় পরিবারকে সর্বাত্তক সহযোগিতা করতে পাশে আছে মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা। নয়নীর পরিবার নায্য বিচার পাবে ইনশাল্লাহ।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button