
পতাকা ডেস্ক: গুম অধ্যাদেশ বাতিল করে সরকার যে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে, তা গুমের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার নিশ্চিত করার পরিবর্তে গুমকারীদের দায়মুক্তির সুযোগ তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)।
দলটি বলেছে, গুমের সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে হলে শক্তিশালী ও কার্যকর আইন, স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থা এবং নির্দেশদাতাসহ প্রত্যেক দায়ী ব্যক্তির বিচারের আওতায় আসা নিশ্চিত করতে হবে।
আজ শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের তোফাজ্জল হোসাইন মানিক মিয়া হলে এবি পার্টির উদ্যোগে আয়োজিত “রোহিঙ্গা গণহত্যা ও গুমের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ: জবাবদিহিতা, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের প্রত্যয়” শীর্ষক সেমিনারে দলের ছায়া সরকার বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিষ্টার আব্বাস ইসলাম খান নোমানের সঞ্চালনায় সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান প্রফেসর ডা.ওহাব মিনারের সভাপতিত্বে বক্তারা এসব কথা বলেন।
আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বিএনপি মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক ডা.মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল, এফএসডিএস (Foundation for Strategic and Development Studies) এর চেয়ারম্যান ফজলে এলাহী আকবর, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাহাব এনাম খান, সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী এবং অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আলোকচিত্রশিল্পী শহীদুল আলম।
সেমিনারে সভাপতির বক্তব্যে এবি পার্টির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান প্রফেসর ডা. ওহাব মিনার বলেন, ৫ আগস্ট ডিফেন্স ফোর্স জনগণের পক্ষে না দাঁড়ালে বাংলাদেশে গণহত্যার ভয়াবহতা আরও বড় আকার ধারণ করতে পারত।
তিনি বলেন, গুমের শিকার ব্যক্তিদের দুঃসহ স্মৃতি এবং তাঁদের পরিবারের দীর্ঘদিনের যন্ত্রণা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। গুমের সংস্কৃতিতে বাংলাদেশকে আর ফিরে যেতে দেওয়া হবে না।তিনি গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ও চেতনার আলোকে দেশ পরিচালনার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
স্বাগত বক্তব্যে এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, বাংলাদেশে গুমের ইতিহাস দীর্ঘ। মুজিব আমল থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ে মানুষ গুমের শিকার হয়েছে। শহীদ বুদ্ধিজীবী ও চলচ্চিত্র নির্মাতা জহির রায়হান নিখোঁজ হওয়ার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমরা এখনো জহির রায়হানকে পাইনি।”
তিনি বলেন, আমরা চাই গুমের সংস্কৃতির অবসান হোক। নতুন বাংলাদেশে আমরা আর গুম দেখতে চাই না।
প্রস্তাবিত গুমবিরোধী আইন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নতুন আইনে কিছু নতুন বিষয় থাকলেও এটি অনেকাংশে ২০০৯ সালের আইনের মতো মনে হচ্ছে। গুমসহ রাষ্ট্রীয় বাহিনীর দ্বারা সংঘটিত অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে স্বাধীন পুলিশ তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি জানান তিনি।বিএনপিকে উদ্দেশ করে ব্যারিস্টার ফুয়াদ বলেন, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের কথা ভাবতে হবে।
বিএনপি মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের মূল সমাধান হচ্ছে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন। এ সংকট সমাধানে জাতীয় কমিটি গঠনকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, শুধু কমিটি গঠন করলেই হবে না; রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য ও সমন্বয় থাকতে হবে।
গুম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা গুমের সংস্কৃতির অবসান চাই। আমরা আর সেই জায়গায় ফিরে যেতে চাই না।
তিনি বলেন, দুর্বল পুলিশি ব্যবস্থা দিয়ে গুমের মতো গুরুতর অপরাধের কার্যকর তদন্ত ও বিচার সম্ভব নয়।
ফজলে এলাহী আকবর বলেন, গুমের বিষয়টি তদন্তে বর্তমান সরকারের কমিটি গঠনকে তিনি স্বাগত জানান। তবে শুধু কমিটি গঠন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। বাংলাদেশের ইতিহাসে বিভিন্ন ইস্যুতে গঠিত কমিটির ব্যর্থতার বহু নজির রয়েছে।
তিনি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে কার্যকর ও শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, আমি খুবই লজ্জিত যে আমাদের ডিফেন্সের লোকজন গুম-খুনে জড়িত ছিল, যা বিগত হাসিনা রেজিমে ঘটেছে।
তিনি আরও বলেন, যখন একটি দেশের সেনাবাহিনী জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তখন আর রাষ্ট্র থাকে না। আমাদের দেশে জবাবদিহিতার ঘাটতি, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং লাগামহীন দুর্নীতি রয়েছে। এখান থেকে আমাদের বের হতে হবে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক শাহাব এনাম খান বলেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের কারণে অতীতের বিভিন্ন উদ্যোগ কাঙ্ক্ষিত ফল দেয়নি। রোহিঙ্গাদের নিরাপদে ফেরত পাঠানো না গেলে ভবিষ্যতে নতুন করে পুশইনের আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি রাখাইনে নিরাপদ ও টেকসই পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করেন, যাতে রোহিঙ্গাদের দক্ষতা ও সক্ষমতা নিয়ে নিজ ভূমিতে ফেরত পাঠানো যায়।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মাদক ও জুয়া নিয়ন্ত্রণে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
বিএনপির সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী বলেন, প্রস্তাবিত গুমবিরোধী আইন নিয়ে বিভিন্ন ধরনের গুজব ছড়ানো হয়েছে। আইন প্রণয়নের আগে ব্যাপক গবেষণা করা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, যার বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠবে, সেই বাহিনীকে দিয়ে তদন্ত করা হবে না। একই সঙ্গে গুমের নির্দেশদাতারাও যাতে বিচারের আওতায় আসে, সে বিষয়টি আইন প্রণয়নে বিবেচনা করা হয়েছে।
নিজের গুমের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ব্যারিস্টার যোবায়ের আহমেদ ভূইয়া বলেন, গুম শুধু একজন ব্যক্তিকে নিখোঁজ করে না; এর সঙ্গে একটি পরিবারকে দীর্ঘদিন আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা ও মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়।
সেমিনারে বক্তারা গুমের সংস্কৃতির স্থায়ী অবসান, ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ, স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং গুমের নির্দেশদাতা ও প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান।
সেমিনারে আরও উপস্থিত ছিলেন এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবদুল্লাহ আল মামুন রানা, আমিনুল ইসলাম এফসিএ, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক আব্দুল হালিম খোকন, মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক সেলিম খান, ইঞ্জিনিয়ার শাহেদ আলম,
ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সদস্য সচিব বারকাজ নাসির আহমদ, সহকারী প্রচার সম্পাদক আজাদুল ইসলাম আজাদ, রিপন মাহমুদ, সহকারী অর্থ সম্পাদক আবু বকর সিদ্দিক, সহকারী দপ্তর সম্পাদক মশিউর রহমান মিলু, নারী উন্নয়ন বিষয়ক সহ সম্পাদক শাহিনুর আক্তার শিলা, উদ্যােক্তা ও কর্মসংস্থান বিষয়ক সহ সম্পাদক সুমাইয়া শারমিন ফারহানা, স্বেচ্ছাসেবক পার্টির যুগ্ম সদস্য সচিব রাশিদা আক্তার মিতু ও রমনা থানার আহ্বায়ক আব্দুল কাদের মুন্সীসহ মানবাধিকারকর্মী, সাংবাদিক, গবেষক, আইনজীবী, পেশাজীবী ও বিশিষ্ট নাগরিকবৃন্দ।




