
মোঃ আব্দুর রব মনসুর,সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি: ২৫ সালের ১৯ অক্টোবরের জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে চৌহালী উপজেলা থেকে বদলি হয়ে তিনি কাজীপুর উপজেলায় নতুন ইউএনও হিসেবে যোগ দেন। নতুন কর্মকর্তার আগমনে স্বভাবতই বিভিন্ন মহলের শুভেচ্ছা বিনিময়ের ঢল নামে। আলাপচারিতায় তিনি উপজেলার সার্বিক উন্নয়নে আমাদের সহযোগিতা চান। সময় যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, তিনি যে বাগাড়ম্বরহীন, নিরলস ও কর্মমুখী একজন মানুষ—তা তাঁর কাজের মাধ্যমেই আজ প্রমাণিত।
উপজেলায় যোগদানের পর থেকেই তিনি মাদক নির্মূলে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। এরই ধারাবাহিকতায়, সম্প্রতি একজন শিক্ষকের বসতবাড়িতে অভিযান চালিয়ে একটি গাঁজার গাছ উদ্ধার করেন তিনি। এছাড়া, শিক্ষার্থীদের মাদক, বাল্যবিয়ে ও ইভটিজিং থেকে দূরে রাখার লক্ষ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) তহবিল থেকে ১০ লক্ষাধিক টাকার ক্রীড়া ও শিক্ষা সামগ্রী (ব্যাগ, কলম, পেন্সিল, পানির ফ্লাক্স, ইরেজার, শার্প্নার) এবং প্লাস্টিকের বেঞ্চ উপজেলার বিভিন্ন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বিতরণ করেছেন।
আপনার যোগদানের কিছুদিন পরেই ছিল ১৬ ডিসেম্বর, মহান বিজয় দিবস। আমরা লক্ষ্য করেছি, মহান বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানটি সংক্ষিপ্ত হলেও অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও গোছানো ছিল। বিশেষ করে, অনুষ্ঠানের দর্শক সারিতে বীর মুক্তিযোদ্ধা, গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, ছাত্র প্রতিনিধি এবং গণমাধ্যম কর্মীদের জন্য সুনির্দিষ্ট ট্যাগসহ আলাদা আসনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল—যা সত্যিই প্রশংসনীয়। সাধারণত এই ধরনের অনুষ্ঠানে সব শ্রেণী-পেশার মানুষের জন্য এমন সুনির্দিষ্ট বসার ব্যবস্থা খুব কমই দেখা যায়। অধিকাংশ সময় দেখা যায়, যারা আগে আসেন তারাই বসার সুযোগ পান এবং যথাসময়ে উপস্থিত ব্যক্তিরা অনেক সময় দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য হন। ফলে মনস্তাত্ত্বিক কারণেই এ ধরনের অনুষ্ঠান পরিপূর্ণভাবে উপভোগ করা সম্ভব হয় না। এছাড়া, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনায় যে মানসম্মত শুভেচ্ছা উপহার দেওয়া হয়েছে, তাতে তাঁদের অত্যন্ত আনন্দিত ও সন্তুষ্ট হতে দেখেছি।
কাজিপুর উপজেলাকে নকলমুক্ত করতে আপনার নেওয়া সাহসী পদক্ষেপগুলো সত্যি প্রশংসনীয়। বিশেষ করে পাস করার উদ্দেশ্যে যমুনার চরাঞ্চলের কেন্দ্রগুলোতে বাইরে থেকে পরীক্ষার্থী আসার যে প্রবণতা ছিল, তা রোধে পাশের জেলা থেকে কক্ষ পরিদর্শক আনা ছিল একটি যুগান্তকারী ও চ্যালেঞ্জিং কাজ। পরীক্ষার শৃঙ্খলা রক্ষায় আপনার কঠোর অবস্থান নতুন কিছু নয়; এর আগে চৌহালী উপজেলায় একদিনেই ১০ জন শিক্ষককে অসদুপায় অবলম্বনের দায়ে জেলহাজতে পাঠানোর নজির আপনি গড়েছেন। নানা প্রতিকূলতা ও প্রভাবশালীদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে স্রোতের বিপরীতে আপনার এই একক লড়াইয়ের জন্য আপনার প্রতি রইল অশেষ কৃতজ্ঞতা।
দুর্গম জনপদে উন্নয়নকাজে ঠিকাদারদের গাফিলতি ও নিম্নমানের কাজের চিরাচরিত চিত্র বদলে গেছে এই উপজেলায়। চরাঞ্চলের ৬টি ইউনিয়নসহ ১২টি ইউনিয়নে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও নিয়মিত পরিদর্শনের সুফল মিলতে শুরু করেছে। “ত্রুটি সংশোধন ও গুণগত মান নিশ্চিত না করলে বিল দেওয়া হবে না”—প্রশাসনের এমন হুঁশিয়ারিতে এবার চরাঞ্চলে বিগত বছরের তুলনায় দেড় গুণ বেশি কাজ হয়েছে, যার গুণগত মানও অত্যন্ত চমৎকার।
অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে প্রভাবশালীদের বিপক্ষে আপনাকে একাই লড়তে দেখেছি। দিনের বেলা দাপ্তরিক কাজ শেষ করে, রাতের বেলা মাঝেমধ্যেই নৌ-পুলিশ এবং মৎস্য কর্মকর্তাকে নিয়ে আপনি অভিযানে নামতেন। রাত ১০টা থেকে ভোর ৪/৫টা পর্যন্ত অবৈধ চায়না দুয়ারী জাল, কারেন্ট জাল এবং কারেন্ট দিয়ে যারা নদীতে মাছ ধরে, তাদের বিরুদ্ধে আপনি কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছেন। এছাড়া গরিবের ভিজিএফ এবং ভিডব্লিউডি চাল উদ্ধারের জন্য বনের মধ্যে রাতের আঁধারে একাধিক ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান করতেও আপনাকে গণমাধ্যমে দেখা গেছে। এই সৎ কাজগুলো করতে গিয়ে সামনে না হলেও, পেছনে পেছনে আপনি অনেকের শত্রুতে পরিণত হয়েছেন।
এছাড়াও ক্রীড়া বিষয়ে আপনাকে খুবই আন্তরিক দেখেছি আমরা। এই অল্প ক’দিন আগে অত্যন্ত গোছানো এবং চমৎকার একটি ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজন করে সবার কাছে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছেন। দেশের প্রতিটি উপজেলায় যদি আপনার মতো ইউএনও থাকতো, তাহলে দেশটা আসলেই বদলে যেতো। শুনেছি আপনি এডিসি হয়ে অন্য জেলায় চলে যাচ্ছেন। জুনিয়র অফিসাররা আপনাকে দেখে শিখুক। সততা, সাহস আর কর্মনিষ্ঠার জন্য কাজিপুরসহ দেশের আপনি কাজ করবেন, সেখানেই ভালোবাসা পাবেন। দোয়া করি আপনি ভালো থাকুন এবং আপনার সাফল্য কামনা করি; সারা দেশের মানুষ আপনাকে ভালোবাসুক।




