রতন ঘোষ,কটিয়াদী প্রতিনিধি : কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে মাদক সেবনের টাকার জন্য, চার পরিবারের পাঁচ শিশু সন্তানকে টাকার বিনিময়ে অন্যের হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার জালালপুর ইউনিয়নে উত্তর চড়পুক্ষিয়া গ্রামে।
এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায় মাদকের নেশায় এলাকায় বেশ কিছু পরিবারের শতাধিক নারী-পুরুষ, নেশার টাকা জোগাড় করতে নিজেদের সন্তান বিক্রি করে দিচ্ছে মর্মে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে । সন্তান বিক্রির টাকা দিয়ে তারা মাদক ক্রয় করে, মাদক সেবনের কাজে ব্যয় করছে।
উত্তরচরপুক্ষিয়া গ্রামের চারটি পরিবারের পাঁচটি শিশু সন্তানকে পৃথক পৃথক সময়ে বিভিন্ন অংকের টাকার বিনিময়ে বিক্রি করেছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী দুলাল মিয়ার ছেলে, জাকির হোসেন ও তার স্ত্রী ফারজানার নবজাতক ছেলে সন্তানকে ২ সেপ্টেম্বর ৬০ হাজার টাকায়, জজ মিয়ার ছেলে সাদ্দাম হোসেনের দুই স্ত্রীর গর্ভে জন্ম নেওয়া দুটি শিশু সন্তান ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা ও ২০ হাজার টাকায়,আসাদ মিয়ার ছেলে জাকির হোসেন তার সন্তানকে ৭৭ হাজার টাকায় এবং মৃত মফিজ উদ্দিনের ছেলে আসাদ মিয়া তার সন্তান কে ২ লাখ টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে দিয়েছে। এলাকাবাসী সূত্রে আরও জানা যায় সন্তানদের প্রথমে যাদের কাছে বিক্রি করা হয়েছিল তারাই আবার বেশি টাকার বিনিময়ে অন্যত্র বিক্রি করে দিয়েছে। যার ফলে এসব শিশুদের বর্তমান অবস্থান ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
চরপুক্ষীয়া গ্রামের, জয়নাল মিয়া, বকুল মিয়া, বাবুল মিয়া, জামাল মিয়া, কালাচাঁন, সখিনা,কালু মিয়া, নুরুন্নাহার ও গ্রাম পুলিশ দুলাল মিয়া সহ বেশ কিছু গ্রামবাসিদের অভিযোগ, বর্তমানে গ্রামে মাদকের বিস্তার, ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। মাদকের টাকা জোগাড় করতে না পেরে, মাদকাসক্ত মা-বাবা নিজেরাই তাদের ঔরসজাত সন্তানদের, টাকার বিনিময়ে অন্যত্র বিক্রি করে, সে টাকায় মাদক সেবন করছে। তারা আরো বলেন, অত্র এলাকার ছেলেমেয়েদের ভালো কোথাও বিয়ে দিতে পারা যায় না। কারণ এই গ্রামের সব বয়সের নারী পুরুষ মাদকাসক্ত। আমরা নিজেরা খুবই অসহায়। যার দরুন আমরা প্রতিবাদ করতেও সাহস পাচ্ছিনা। আমাদেরও ছোট ছোট সন্তান আছে। প্রতিবাদ করলে তারা আমাদের সন্তানদেরও অন্যত্র বিক্রি করে দিতে পারে মর্মে, আমরা এই আতঙ্কে ভুগছি।
এলাকাবাসীর আরো অভিযোগ করেন যে মাদক সেবিরা তাদের শিশুদেরকেও মাদকের সংস্পর্শে নিয়ে আসছে। দেখা যায় তাদের বিরুদ্ধে একটি পাঁচ বছর বয়সী শিশুকে মাদক সেবন করানোরও অভিযোগ রয়েছে। শুধু তাই নয় অনেক বাড়িতে স্বামী-স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে একসঙ্গে বসে মাদক সেবন করেন, বলেও অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। মাদক সেবীদের বিরুদ্ধে কোন কথা বললে হামলা, মামলা বিভিন্ন ধরনের হয়রানির কারণে অনেকে দেখেও কিছুই করতে সাহস পাচ্ছেন না।
কটিয়াদী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর ছাত্র, নাম প্রকাশ না করার স্বার্থে বলেন, আমি বর্তমানে আমার গ্রামের পরিচয় দিতে পারি না। উত্তর চরপুক্ষিয়া গ্রামে, আমাদের বাড়ি শুনলেই, লোকজন বলে তোরা সবাই মাদকাসক্ত। তোদের গ্রামের লোকজন মাদকের টাকার জন্য নিজেদের সন্তান বিক্রি করে দেয়। সে দুঃখ করে, আরো বলে যে, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর নাকের ডগায় যদি এই ধরনের ঘটনা ঘটে তাহলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে তা আল্লাহ মালুম। কারণ উত্তর চরপুক্ষিয়া গ্রাম থেকে মাত্র দেড় কিলোমিটার দূরেই কটিয়াদী মডেল থানার অবস্থান।
জালালপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ রফিকুল ইসলাম জানান, উত্তর চরপুক্ষিয়া গ্রামে মাদকের ছোবল, ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। মাদক সেবনের টাকার জন্য বিভিন্ন সময় পাঁচটি শিশু সন্তান বিক্রি করে দেওয়ার কথা শুনেছি। আমি আমার পরিষদের সমস্ত সদস্য ও প্রশাসনের সহায়তায় মাদক মুক্ত সমাজ গঠনে কাজ করব।
এ ব্যাপারে অভিযোগের বিষয়ে সরজমিনের ১১ সেপ্টেম্বর, তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে সন্তান বিক্রির অভিযোগ ওঠা, পরিবারগুলোর সদস্যরা সাংবাদিক আসার খবর পেয়ে অন্যত্র গাঢাকা দেওয়ায় তাদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
কটিয়াদী মডেল থানার ওসি, মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম বলেন, উপজেলার জালালপুর ইউনিয়নের উত্তর চরপুক্ষিয়া গ্রামটি খুবই দরিদ্র। সেখানে নেশাখোর বেশি। মাদকের টাকা জোগাড় করতে তাদের সন্তানদের বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ পেয়েছি। মাদক নির্মূলে সবাইকে সাথে নিয়ে আইনগত ব্যবস্থা সহ, সমাজ সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে ।