
আমাদের প্রিয়জনরা অপরাধী হলে তাদের বিচার করুন। তবুও ফিরিয়ে দিন। আর কতকাল আমরা তাদের অপেক্ষায় থাকবো। তারা বেঁচে আছে কি মরে গেছে আমরা তাও জানি না। মরে গেলে অন্তত লাশের এক টুকরো অংশ দিন, যা দিয়ে আমরা দাফন করতে পারব। হাত তুলে দোয়া করব আমার প্রিয়জন মরে গেছে। এক বুক ভরা কষ্ট নিয়ে কথাগুলো আক্ষেপ আর বলছিলেন দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ছুটে আসা বিভিন্ন সময়ে গুমের শিকার পরিবারের স্বজনরা।
মঙ্গলবার (৩০ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর শাহবাগে জড়ো হয়েছিলেন তারা। আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে স্বজনদের ফিরে পাওয়ার দাবিতে স্বজনদের আকুতি ও কান্নায় পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছিল শাহবাগ চত্বর।
মায়ের ডাক আয়োজিত এই মানববন্ধন ও সমাবেশে সংগঠনের সমন্বয়ক আফরোজা ইসলাম আঁখির সভাপতিত্বে গুমের শিকার পরিবারের স্বজনরা ছাড়াও নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমাদুর রহমান মান্না, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য তাবিত আউয়াল ও ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুর বক্তব্য রাখেন।

মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন ২০১৩ সালের ১১ ডিসেম্বরে গুম শিকার সূত্রাপুরের ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি সেলিম রেজা পিন্টুর বোন রেহানা বানু মুন্নি। তিনি বলেন, আমি আমার ভাইকে ফেরত চাই। সে যদি কোনো অপরাধ করে থাকে তবে তার বিচার করা হোক কিন্তু তাকে গুম করে রাখার অধিকার এই রাষ্ট্রের নেই। সে অপরাধী হলে বিচার করুন, তবুও তাকে ফিরিয়ে দিন।
২০১৯ সালের ১৯ জুন মিরপুরের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে বাসায় ফেরার পথে র্যাব গুমের শিকার ইসমাইল হোসেন বাতেনকে তুলে নিয়ে যায় দাবি করে তার মেয়ে আনিসা হোসেন বলেন, আজ তিন বছর তিন মাস হলেও এখন পর্যন্ত আমার বাবার কোন সন্ধান পাইনি। তাকে খুঁজে পেতে দেশের এমন কোন জায়গা নেই যেখানে আমরা আবেদন করিনি। র্যাবের বিরুদ্ধে অভিযোগ হওয়ায় পুলিশ কশিমনার আমাদের আবেদনটা পর্যন্ত পড়েনি। আমি কি আমার বাবাকে খুঁজে পাব না ? যারা আমার বাবাকে তুলে নিলো তাদের বিচার কি হবে না ?
২০১৬ সালের ৯ আগস্ট রাতে রাজধানীর মিরপুরের ডিওএইচএসের একটি বাসা থেকে ব্যারিস্টার আরমানকে তুলে নিয়ে যায় সাদা পোশাকে কিছু লোক। গুমের শিকার আরমানের মা ও স্ত্রী ছাড়াও স্বজনরা এসেছিলেন এই মানববন্ধনে।

এসময় ব্যারিস্টার আরমান হকের মা আয়েশা খাতুন বলেন, প্রতি মাসে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সদস্যরা বাসায় আসেন। ফলে বাচ্চারা আর বাসায় ভয়ে থাকতে চায় না। তারা পড়াশোনা করতেও পারছে না। আরমানের দুই মেয়ে (যাদের বয়স ৯ ও ১০ বছর) তারা ঘুমালেও দুঃস্বপ্ন দেখে তাদের রাস্তায় ফেলে দেওয়া হচ্ছে, ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এবং ওদের মারধর করা হচ্ছে। এই ধরনের সাইকোলজিক্যাল ট্রমার মধ্যে তারা আছে। পুলিশ এসে বারবার জানতে চায় আপনার ছেলে কোথায় কিন্তু তাদের বারবার বলার চেষ্টা করি, আপনারাই তো খোঁজ দেবেন সে কোথায় আছে। উল্টা তারা আমাদেরকে জিজ্ঞাসা করে সে কোথায় আছে। আমার মুল দাবি একটাই, আমাদের সন্তানদের ফিরিয়ে পেতে চাই।
গুমের শিকার কুষ্টিয়ার আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন সেতুর স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস জিনিয়া বলেন, আমার স্বামী ঢাকায় আজ থেকে সাত বছর আগে ১৫ আগস্ট ফুল দিতে এসে গাজীপুরের একটি রিসোর্ট থেকে নিখোঁজ হয়ে যায়। তখন থেকে আর খোঁজ মেলেনি। প্রধানমন্ত্রীকে অনূর্ধ্ব করব তাকে খুঁজে বের করতে নির্দেশ দিন, আমরা তাকে ফিরে পেতে চাই।

এছাড়াও মানববন্ধনে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, যতোগুলো আয়নাঘর আছে সেগুলো আমরা একদিন ভেঙে ফেলব। আজ অথবা কাল। এজন্য আমাদের সঙ্গে আপানারাও শপথ নিন। যারা এই আয়নাঘরের সঙ্গে জড়িত গুমের শিকার পরিবারগুলোর কান্না ও প্রশ্নের জবাব তাদের দিতেই হবে।
মানবাধিকার কর্মী নুর খান লিটন বলেন, যারা গুম হয়ে ফিরে এসেছেন তাদেরকে এমন ভয় ভীতিকর অবস্থার মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছিল, তারা এখন আর কোন কথা বলতে একটি শব্দও উচ্চারণ করতে চান না। এখান থেকে একটি কথাই বলতে চাই, যারা গুম হয়েছেন, ফিরে এসেছেন, যাদের মৃতদেহ পাওয়া গেছে এইসব ঘটনায় যারা এখনো নিখোঁজ আছেন তাদেরকে উদ্ধারের সরকারেরর পক্ষ থেকে উদ্যোগ গ্রহণ করা হোক। সমাবেশে ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুর বক্তব্য রাখেন।
সমাবেশে অংশ নিতে রাজধানীর নাখালপাড়া থেকে এসেছিলেন গুমের শিকার তিতুমীর কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র আব্দুল কাদের মাসুমের মা আয়েশা আলী, সূত্রাপুর যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক সম্রাট মোল্লার বোন কানিজ ফাতেমা রিতা, সূত্রাপুর যুবদলের সভাপতি খালেদ হাসান সোহেলের বোন সাদিয়া সাম্মী সুলতানা, ইসমাইল হোসেন আলামিনের মা শিরিন আকতার, কাওসার হোসেনের পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া মেয়ে লামিয়া আকতার মিমসহ অর্ধ শতাধিক পরিবারের স্বজনরা।
ইত্তেফাক


