যশোর প্রতিনিধি: ঋতু পরিক্রমায় বর্ষার বাদল ধারা আর কদম- কেয়ার সৌন্দর্য্যকে বিদায় জানিয়ে শুরু হয়েছে সৌন্দর্য মন্ডিত শরৎ কাল। সুশোভিত শিউলি, শাপলা, শালুক, পদ্ম, কাশফুল আর শুভ্র সাদা মেঘের ভেলা,শরতের বিমোহিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের রূপের মহিমার অপরূপ সাজে সজ্জ্বিত হয়ে আবর্তিত হয় বাঙালির হাজার বছরের শারদীয় দুর্গোৎসব। দেশজুড়ে এখন শারদীয় দুর্গাপূজার আমেজ। আজ মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে দুর্গা পূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হচ্ছে।
বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা ষষ্ঠী তিথি শুরু: ১৬ অক্টোবর ২০২৬, শুক্রবার, রাত ৩:২৫ মিনিট (অথবা ১৫ অক্টোবর দিবাগত শেষ রাতে)। ষষ্ঠী তিথি শেষ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, শনিবার, ভোর ৫:৫৫ মিনিট পর্যন্ত।
বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকার নিয়ম অনুযায়ী ১৬ অক্টোবর (শুক্রবার) এবং ১৭ অক্টোবর (শনিবার)—এই দুদিনের মধ্যে ষষ্ঠীর মূল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবে।
ষষ্ঠ্যাদি কল্পারম্ভ ও ষষ্ঠী বিহিত পূজা: তিথির নিয়ম ও পূর্বাহ্নের মাহেন্দ্রক্ষণ অনুযায়ী ১৬ অক্টোবর সকালেই দেবীর কল্পারম্ভ ও ষষ্ঠী পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাস:১৬ অক্টোবর (শুক্রবার) সায়ংকালে (সন্ধ্যায়) বেলবৃক্ষ মূলে দেবীর বোধন, আমন্ত্রণ এবং অধিবাস সম্পন্ন করা হয়েছে।
পরবর্তী লগ্ন ১৭ অক্টোবর শনিবার ভোর ৫:৫৫ মিনিটের মধ্যে ষষ্ঠী তিথির অবসান ঘটে, এবং সেদিন সকালেই মহাসপ্তমীর নবপত্রিকা প্রবেশ ও সপ্তমী বিহিত পূজা শুরু হবে।
বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাস: সাধারণত সন্ধ্যাবেলায় দেবী দুর্গার বোধন (দেবীকে জাগ্রত করা), আমন্ত্রণ (মর্ত্যে আসার জন্য আহ্বান) এবং অধিবাস (পূজার আগে দেবীকে নির্দিষ্ট স্থানে স্থাপন করা) সম্পন্ন হয়।
ষষ্ঠী বিহিত পূজার মাহাত্ম্যঃ দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় এই মহাষষ্ঠী তিথিতেই, যা ষষ্ঠী বিহিত পূজা নামে পরিচিত।
কল্পারম্ভ ও অকাল বোধন:ষষ্ঠীর দিনে কল্পারম্ভ দ্বারা দুর্গাপূজার ব্রত ও সংকল্প শুরু হয়। এই দিনেই মূলত বোধন (দেবীকে জাগ্রত করা) অনুষ্ঠিত হয়। প্রচলিত পুরাণ অনুসারে, শ্রী রামচন্দ্র শরৎকালে (যা দেবতদের নিদ্রার সময়, তাই ‘অকাল’) রাবণ বধের জন্য দুর্গাকে অসময়ে জাগ্রত করে পূজা করেছিলেন। সেই থেকে এই বোধন অকাল বোধন নামে পরিচিত। বোধনের মাধ্যমে প্রতিমার মধ্যে দেবীর প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা হয়।
আমন্ত্রণ ও অধিবাস:আমন্ত্রণ-এর মাধ্যমে ভক্তরা দেবীকে মর্ত্যে আসার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আহ্বান জানান।অধিবাস-এর মাধ্যমে দেবীকে নির্দিষ্ট স্থানে স্থাপনা করে পূজার জন্য প্রস্তুত করা হয়।
দেবীর আগমন:এই দিনেই দেবী দুর্গা তাঁর সন্তান লক্ষ্মী, সরস্বতী, গণেশ ও কার্তিককে নিয়ে কৈলাস থেকে মর্ত্যে (পৃথিবীতে) আগমন করেন বলে বিশ্বাস করা হয়।
শুভ সূচনার প্রতীক: ষষ্ঠী পূজার মাধ্যমে পাঁচ দিনব্যাপী শারদ উৎসবের মূলপর্বের শুভ সূচনা হয়। এই পূজার মাধ্যমে ভক্তরা দেবীর আশীর্বাদ কামনা করেন, যাতে পূজা নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়।
মোটকথা, মহাষষ্ঠী পূজা হলো দেবী দুর্গাকে মর্ত্যে স্বাগত জানানোর এবং পাঁচ দিনের উৎসবের আনুষ্ঠানিক সূচনা করার পবিত্র দিন।
সনাতন বিশ্বাস ও পঞ্জিকামতে, জগতের মঙ্গল কামনায় দেবী দুর্গা এবার ঘোটকে (ঘোড়া) চড়ে স্বর্গালোক থেকে মর্ত্যলোকে (পৃথিবী) আসবেন (আগমন)। যার ফল হচ্ছে ফসল ও শস্যহানি। আর দেবী স্বর্গালোকে বিদায় (গমন) নেবেন নৌকায় চড়ে। যার ফল শস্যবৃদ্ধি।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ জানিয়েছে, এ বছর সারাদেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা হবে। গত বছর পূজা হয়েছিল ৩৩ হাজার ৩৫৫টি মণ্ডপে। অর্থাৎ এবার ৪৯৬টি পূজা বেড়েছে। ঢাকা মহানগরীতে এবার ২৫৮টি মণ্ডপে পূজার আয়োজন থাকছে। গতবার ছিল ২৬১টি। রাস্তার মধ্যে পূজা আয়োজনের অনুমতি না মেলায় ঢাকা মহানগরীতে এবার মণ্ডপের সংখ্যা তিনটি কমে গেছে।
যশোর জেলায় এবার ৭৩৭ পূজামণ্ডপে পূজা উদযাপন করা হবে। এ বছর জেলায় পূজামণ্ডপ বেড়েছে ২৮ টি। জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি দীপংকর দাস রতন জানান, এ বছর জেলার ৭৩৭ পূজা মন্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা উদযাপন করা হবে। গত বছর ৭০৯ পূজা মন্ডপে দুর্গাপূজা উদযাপন করা হয়। এ বছর ২৮ টি পূজা মন্ডপ বেড়েছে । ৭৩৭ পূজা মন্ডপের মধ্যে এ বছর সদরের ১৭০ পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা উদযাপন করা হবে। গত বছর উদযাপন করা হয় ১৬৫ মণ্ডপে, বেড়েছে ৮ মণ্ডপ।
অভয়নগরে ১৩২ পূজা মন্ডপে দুর্গাপূজা উদযাপন করা হবে । গত বছর উদযাপন করা হয় ১২৭ মন্ডপে, বেড়েছে ৫ মণ্ডপ। কেশবপুরে ১০১ পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা উদযাপন করা হবে। গত বছর উদযাপন করা হয় ৯৭ মন্ডপে, বেড়েছে ৪ মণ্ডপ। মণিরামপুরে ১০২ পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা উদযাপন করা হবে। গত বছর উদযাপন করা হয় ৯৮ মণ্ডপে, বেড়েছে ৪ মন্ডপ। বাঘারপাড়ায় ৯১ পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা উদযাপন করা হবে। এ উপজেলায় পূজামণ্ডপ বাড়েনি।
ঝিকরগাছায় ৫৭ পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা উদযাপন করা হবে। গত বছর উদযাপন করা হয় ৫৪ মণ্ডপে, বেড়েছে ৩ মন্ডপ। চৌগাছায় ৫৩ পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা উদযাপন করা হবে। গত বছর উদযাপন করা ৪৮ মন্ডপে, বেড়েছে ৫ মন্ডপ।
শার্শায় ৩১ পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা উদযাপন করা হবে । গত বছর উদযাপন করা হয় ২৯ মন্ডপে, বেড়েছে ২ মণ্ডপ।
রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের প্রতিটি পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা রক্ষায় পুলিশ, আনসার, এসআরবি ও বিজিবি সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। পুলিশ এবং এসআরবির পাশাপাশি প্রায় প্রতিটি মণ্ডপে স্বেচ্ছাসেবকরা দায়িত্ব পালন করবেন।