
ফারহানা করিম : ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পুলওয়ামায় সন্ত্রাসী হামলার জের ধরে দেশটির বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করা কাশ্মীরিরা ব্যাপক নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিনযাপন করছেন। প্রতিশোধস্পৃহায় উন্মত্ত ভারতবাসী কাশ্মীরিদের পেলেই তাদের উপর হামলা করছে। এধরনের ভয়াবহ পরিস্থিতিতে কাশ্মীরিদের রক্ষায় এগিয়ে এসেছেন শিখ সম্প্রদায়ের মানুষরা। নিজেদের উপাসনালয়ে আসহায় এসব কাশ্মীরিদের আশ্রয় দেয়ার পাশাপাশি খাদ্যেরও ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
এক্ষেত্রে ১৮ বছরের কাশ্মীরি শিক্ষার্থী শাদাব আহমেদের কথাই বলা যেতে পারে। গত সপ্তাহে শাদাব এবং তার বন্ধুরা উত্তর ভারতীয় রাজ্য হরিয়ানায় একদল উন্মত্ত জনতার হামলার মুখে পড়েন। তারা ভেবেছিলেন প্রাণ নিয়ে হয়তো আর ফিরে যেতে পারবেন না। কিন্তু যেকোনোভাবেই হোক তারা সেখান থেকে পালাতে সক্ষম হলেন এবং নিজেদের ফ্ল্যাটে যাওয়ার পর কিছুটা নিরাপত্তা পেলেন। এরপর কাশ্মীরের এই চারজন শিক্ষার্থী ওই ফ্ল্যাটটিতে থাকা নিরাপদ মনে করলেন না। তারা সিদ্ধান্ত নিলেন, সুযোগ পেলেই নিরাপদ কোনো স্থানে চলে যাবেন।
প্রকৌশলবিদ্যার দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী শাদাব আল জাজিরাকে বলেন, ‘ওই এলাকায় আমরা সাত জনের মত কাশ্মীরি ছিলাম। এমন সময় আমাদের একজন কাশ্মীরি বন্ধু ফোন করে পাঞ্জাবের মোহালিতে যাওয়ার জন্য বলে। সে জানায় মোহালিতে আমরা অপেক্ষাকৃত নিরাপদে থাকতে পারবো। আমরা একটি ক্যাব ভাড়া করে সেখানকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করি।’
মোহালিতে শাদাব এবং তার বন্ধুরা যে উষ্ণ অভ্যর্থনা পেলেন তাতে তারা বিস্মিত হয়ে গেলেন। শিখা সম্প্রদায়ের স্বেচ্ছাসেবক দল মোহালিতে তাদের স্বাগতম জানান। তারা শিখ মন্দির গুরুদুয়ারায় শাদাবদের আশ্রয় দেয়ার পাশাপাশি খাবারও দেয় এবং নিরাপদে কাশ্মীরে ফিরে যাওয়ার জন্য পরিবহনের ব্যবস্থা করে দেয়।
এই ব্যাপারে শাদাব বলেন, ‘শিখ স্বেচ্ছাসেবীরা আমাদের খাদ্য, আশ্রয়ের পাশাপাশি ১৩ টি গাড়ি যোগাড় করে দিয়েছেন যাতে শতাধিক কাশ্মীরি একসাথে বাড়িতে ফিরে যেতে পারি।’
উল্লেখ্য, ভারতজুড়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজে হাজার হাজার কাশ্মীরি শিক্ষার্থী পড়ালেখা করে থাকে। এছাড়া অনেক কাশ্মীরি পেশাজীবীও ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে অবস্থান করেন। কিন্তু ১৪ ফেব্রুয়ারির সন্ত্রাসী হামলায় ভারতীয় আধা সামরিক বাহিনীর ৪৪ জন সদস্য নিহত হওয়ার পর বিভিন্ন রাজ্যের মানুষের ঘৃণা এবং ক্রোধের শিকার হন নিরীহ এসব কাশ্মীরিরা।
শাদাবদের মতই হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখন্ড এবং ভারতের অন্যান্য রাজ্য থেকেও শিক্ষার্থীরা নিজ রাজ্য কাশ্মীরে ফিরে আসতে শুরু করে।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে কাশ্মীরিদের উপর হামলার ঘটনা দেখা গেছে। ভারতের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও কাশ্মীরিদের নিরাপত্তা দেয়ার জন্য ভারত সরকারের প্রতি আবেদন জানিয়েছে।
মূলত কট্টর ডানপন্থী হিন্দু সংগঠনের উসকানিতেই কাশ্মীরিদের উপর এসব হামলার ঘটনা ঘটছে। কাশ্মীরি শিক্ষার্থীরাও তাদের উপর সহিংসতার জন্য হিন্দুত্ববাদী শাসক দলের দিকেই তাদের অভিযোগের আঙুল তুলেছে।
এদিকে কাশ্মীরিদের প্রতি ঘৃণা এবং প্রতিশোধের ডাক উপেক্ষা করে যুক্তরাজ্যভিত্তিক শিখদের অলাভজনক সংগঠন ‘খালসা এইড’ নিরীহ শিক্ষার্থীদের সব ধরনের নিরাপত্তা দিয়ে সহায়তা করছে। খালসা এইডের ভারতীয় শাখার পরিচালক অমরপ্রীত সিং আল জাজিরাকে বলেন, ‘আমাদের ধর্ম আমাদের মানবতার শিক্ষা দিয়েছে। কিছু খারাপ মানুষ যারা এসব শিক্ষার্থীকে হয়রানি করছে তাদের কারণে তারা (কাশ্মীরিরা) যেন নিজেদের নিঃসঙ্গ মনে না করে। তারা যেন মানবতার উপর বিশ্বাস রাখতে পারে। এছাড়া এসব তরুণ শিক্ষার্থী আমাদের ভবিষ্যত।’
খালসা এইড জানিয়েছে, তাদের স্বেচ্ছাসেবকরা এপর্যন্ত ৩০০ কাশ্মীরি শিক্ষার্থীকে নিরাপদে নিজ রাজ্যে ফিরে যেতে সাহায্য করেছে।
অমরপ্রীত জানান, বিপন্ন কাশ্মীরি শিক্ষার্থীদের কাছে থেকে তারা এখনো সাহায্যের আবেদন পাচ্ছেন। এবং তাদের সাহায্য করার জন্য তারা যথাসাধ্য চেষ্টাও করে যাচ্ছেন।
এদিকে শিখদের এই মহানুভবতার কথা কাশ্মীরিরা কিন্তু ভুলে যাননি। নিজ রাজ্যে ফিরে যাওয়ার পর সেখানে অবস্থান করা শিখদের প্রতিও তারা সদয় ব্যবহার করছেন। কাশ্মীরি মালিকানাধীন দোকানে ছাড় দেয়া ছাড়াও বিনামূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং আইনি সহায়তাও দেয়া হচ্ছে কাশ্মীরের সংখ্যালঘু শিখদের।
কামরান নিসার নামে ২০ বছর বয়সি একজন তরুণ যিনি কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগরের জনপ্রিয় পর্যটনস্থলে একটি ক্যাফে চালান তিনি শিখ সম্প্রদায়ের জন্য পুরো এক সপ্তাহজুড়ে বিনামূল্যে খাবার দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
এই ব্যাপারে তিনি আল জাজিরাকে বলেন, ‘এটিকে কেবলমাত্র বিনামূল্যে খাবার দেয়ার ঘটনা হিসেবে দেখলে হবে না এটি শিখদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা এবং ভালবাসার নির্দশন।’
এদিকে পুলাওয়ামাকাণ্ডের পর ভারতজুড়ে কাশ্মীরিদের প্রতি যে হেনস্থা করা হয়েছে তাতে এই রাজ্যের শিক্ষার্থীরা তাদের পুরনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে দ্বিধায় ভুগছেন। শাদাব জানান, তিনি আবারো হরিয়ানায় নিজ কলেজে ফিরে যাবেন কি না সে ব্যাপারে সংশয়ে আছেন। কাশ্মীরিরা বলছেন, নিজ রাজ্যের সহিংসতা থেকে বাঁচার জন্য তারা ভারতের অন্যান্য রাজ্যে গিয়েছিলেন শান্তির জন্য। কিন্তু ভারতের কোথাও তাদের জন্য কোনো শান্তি নেই। সুত্র : বাংলা




