অযত্ন-অবহেলায় ১৬৫ বছরের পুরানো পাবলিক লাইব্রেরি

রংপুরে ব্রিটিশ শাসন, পাকিস্তানি শোষণ আর স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সাক্ষী রংপুরের পাবলিক লাইব্রেরি। ইংরেজ বিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলনের সংগ্রাম ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময়ও সরগরম ছিল এই লাইব্রেরি।
বহু বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিক, কবি-সাহিত্যিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও সংগঠক মনা মানুষের ওঠা-বসার স্থান ছিল এখানে। বই-পত্রিকার সমারোহে ছিল হাজার হাজার পাঠক ও প্রথিতযশা সাহিত্যিক। প্রতিষ্ঠার ১৬৫ বছর পর এখন কিছুই নেই রংপুরের ঐতিহাসিক রংপুর পাবলিক লাইব্রেরিতে।
দীর্ঘদিন ধরে অযত্ন, অবহেলা আর অব্যবস্থাপনায় এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। স্বাধীনতা পরবর্তী জেলায় জেলায় সরকারি গণগ্রন্থাগার হওয়াতে কমে গেছে এই পাবলিক লাইব্রেরির কদর। এখন বই, লাইব্রেরিয়ান, জনবল, সংস্কার, বরাদ্দ সংকটে তেলহীন বাতির মতো জ্বলছে। এই জ্ঞানগৃহ লাইব্রেরি নানান উপকরণের অভাবে মূলত আজ ক্লিনিক্যাল ডেথ।
এদিকে গতকাল সোমবার বিকেলে (৭ ডিসেম্বর) রংপুর পাবলিক লাইব্রেরির হলরুমে পাবলিক লাইব্রেরির কার্যকরী কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন, রংপুরের জেলা প্রশাসক মো. আসিব আহসান। সভায় রংপুর পাবলিক লাইব্রেরির বিভিন্ন সংস্কারমূলক কার্যক্রম, সদস্য অন্তর্ভুক্তি, জনসম্পৃক্তকরণ কার্যক্রম গ্রহণসহ রংপুর পাবলিক লাইব্রেরির ঐতিহ্য সংরক্ষণে বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। জেলা প্রশাসক রংপুর পাবলিক লাইব্রেরির ঐতিহ্য সংরক্ষণে ও সার্বিক কার্যক্রমে সহযোগিতা প্রদানের জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আহ্বান জানান।
দেখা গেছে, এক সময়ের চার কক্ষ বিশিষ্ট লাইব্রেরি এখন অস্তিত্বের সংকটে। রংপুর পাবলিক লাইব্রেরির একটি অন্ধকার কক্ষে মাকড়সার জালে আলমারিতে আটকে আছে বহু নামিদামি লেখকের বই। ২০টি আলমারির আটটিই অচল। বই-পত্রিকা সংরক্ষণে নেই পর্যাপ্ত আলমারি। মেঝেতে, চেয়ারে আর কিছু আলমারির উপরে বস্তাবন্দী বই-পত্রিকার স্তূপ। নতুনত্ব না থাকায় পুরাতন এসব বই-পত্রিকার স্তূপ রংপুর পাবলিক লাইব্রেরি কাছে টানছে না পাঠকদের।
লাইব্রেরির দেয়ালের গায়ে ফাটল ধরেছে। ইমারতে জমেছে শেওলা। পাঁচ বছর ধরে নেই কোনো শৌচাগার। চারটি কক্ষের একটা নির্মাণাধীন বিভাগীয় শিল্পকলা একাডেমির পেটে চলে গেছে। বাকি তিনটি কক্ষের মধ্যে একটি পরিত্যক্ত। লাইব্রেরি হিসেবে ব্যবহৃত কক্ষে পাঠকের বসার জন্য রয়েছে ১৫-২০টি প্লাস্টিক চেয়ার। আছে আদিকালের পুরাতন একটি টেবিল।দীর্ঘদিন বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে না পারায় রংপুর পাবলিক লাইব্রেরিতে আছে আলো স্বল্পতা। আগের মতো পত্রিকাও নেই। অর্থ সংকটে সাতটি পত্রিকার তালিকার এখন পাঠকের খোরাক মাত্র চারটি। এই লাইব্রেরির প্রতিদিন নতুন সংযোজন বলতে শুধু চারটি পত্রিকাই। আর তেমন কিছুই নেই রংপুর পাবলিক লাইব্রেরিরতে।
আধুনিক ডিজিটাল কম্পিউটার, ইন্টারনেট, তথ্য-প্রযুক্তির সেবা তো দূরের কথা লাইব্রেরির সেবার জন্য কেউ নেই। একজন বৃদ্ধ কেয়ারটেকার আর এক পরিচ্ছন্নতাকর্মীই এখানকার সব। পদাধিকার বলে জেলা প্রশাসক এর অভিভাবক হলেও মাথা ব্যথা নেই তার। এ কারণে ক্লিনিক্যাল ডেথ বেঁচে থাকা রোগীর মতো ধুকে ধুকে চলছে দেড়শ বছরের পুরনো এই লাইব্রেরিটি।
রংপুর পাবলিক লাইব্রেরির কেয়ার টেকার আজিজুল ইসলাম সানু। দীর্ঘ এক যুগ ধরে এখানে চাকরি করছেন। বেতন ভাতা হিসেবে তার প্রতিদিনের হাজিরা ১০০ টাকারও কম। মাস শেষে জোটে মাত্র ২ হাজার ৫০০ টাকা।
সাংবাদিকদের সানু বলেন, লাইব্রেরি পরিচালনার জন্য কোন বরাদ্দ নেই। এর কোনো দাতা নেই। ২০১৫ সালে জেলা প্রশাসক লাইব্রেরির সংস্কারের জন্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হলেও কোনো ব্যবস্থা হয়নি। একজন লাইব্রেরিয়ান ছিল, বেতন ঠিক মতো না পাওয়া তিনিও চাকরি ছেড়েছেন। এখন জনবল নেই। পড়ার মতো বই নেই। চারটি পত্রিকা ছাড়া এখানে নতুন বলতে কিছুই নেই। যারা পাঠক তারাও পুরাতন। বই না থাকায় নতুন পাঠক সৃষ্টি হচ্ছে না।
জানা গেছে,ছয় বছর পূর্বে একুশ সদস্যের একটি কমিটি হয়েছিল। ওই কমিটির অনেকে এখন বেঁচে নেই। কমিটির মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়াতে এখন কেউ খোঁজখবরও নেন না। লাইব্রেরিকে বাঁচিয়ে রাখতে এর অবকাঠামো ঠিক রেখে নতুন করে সংস্কার করা জরুরি বলে মনে করেন রংপুর মহানগরীর শিক্ষানুরাগীরা। পাবলিক লাইব্রেরি অনেক পুরানো পাঠাগার। এখানে কত বছর ধরে নতুন বই নেই, কেউ বলতে পারবে না। এ লাইব্রেরি পরিচালনার জন্য লোকজন নেই। এখানে নির্বাচন নেই। এর গ্রাহক বা দাতা নেই। এখন কোনো রকম ক্লাসে ভর করে চলছে।
রংপুর পাবলিক লাইব্রেরি এক সময়ের পরিচালনা কমিটির সদস্য ও সাবেক পৌর চেয়ারম্যান কাজী জুননুন ইত্তেফাককে বলেন, রংপুর পাবলিক লাইব্রেরিকে নতুন প্রজন্মের জন্য বাঁচিয়ে রাখা জরুরি। এর সঙ্গে অনেক ইতিহাস ও ঐতিহ্য জড়িয়ে আছে। এটাকে এভাবে অবহেলিত রাখতে দেওয়া ঠিক হবে না। আধুনিক পাঠাগার করে রংপুরের অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে লাইব্রেরি মুখি করার জন্য সরকারিভাবে উদ্যোগ নিতে হবে।
এ ব্যাপারে রংপুরের জেলা প্রশাসক আসিফ আহসান ইত্তেফাককে বলেন, অতীত সৃতি বিজড়িত ইংরেজ বিরোধী আন্দোলন, ভাষা সংগ্রাম ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহ্য বহন করে চলা এই পাবলিক লাইব্রেরি। প্রাচীন এই লাইব্রেরিকে বাঁচিয়ে রাখতে এর পুরাতন অবকাঠামো ঠিক রেখে নতুন করে সংস্কার করার জন্য জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
তিনি আরো জানান, জাতীয় গ্রন্থাগারের সচিবের সাথে এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। প্রাচীন এই লাইব্রেরিকে বাঁচিয়ে রাখতে জাতীয় গ্রন্থাগারের সহযোগিতা নিয়ে আগামী প্রজন্মের জন্য নতুন করে পুরাতন ভবন মেরামত করে সাজানোর উদ্বেগ নেওয়া হয়েছে।
সুত্র : ইত্তেফাক




