sliderস্থানীয়

হরিরামপুরে ভিজিএফ এর চাল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ

হরিরামপুর (মানিকগঞ্জ) প্রতিনিধি : মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলায় জাটকা আহরণ থেকে বিরত থাকা জেলেদের জীবন নির্বাহের জন্য মানবিক সহায়তা কর্মসূচির আওতায় রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়ন মৎস্য অধিদফতরে নিবন্ধিত ৭০টি জেলে পরিবারের মাঝে বিনামূল্যে দ্বিতীয় কিস্তির চাল বিতরণে ইউনিয়নের ৮ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. ছকেল বিশ্বাসের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।
জানা যায়, ইউনিয়নের ৮ নং ওয়ার্ডে ১২টি জেলে পরিবারের মাঝে ভিজিএফ এর চাল বিতরণ করা হয়। এ চাল বিতরণে বেশ কয়েকজন সুবিধাভোগীর কাছ থেকে গাড়ি ভাড়ার কথা বলে ৬০০ করে টাকা নিয়ে তাদের চাল দেয় ইউপি সদস্য মো. ছকেল বিশ্বাস। চলতি বছরের এপ্রিল-মে মাসের বরাদ্দানুযায়ি পবিত্র ঈদুল ফিতরের পূর্বে উপজেলার রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে এই চাল বিতরণ করা হয়।
এ বিষয়ে বেশ কয়েকজন এলাকাবাসীর মৌখিক অভিযোগের ভিত্তিতে অনুসন্ধানে জানা যায়, ৮নং ওয়ার্ডের বকচর গ্রামের মৃত মঙ্গল মোল্লার ছেলে সফিউদ্দিন মোল্লা, মৃত লাল মদ্দিনের ছেলে গেন্দুর কাছ থেকে চাল আনার খরচ বাবদ ৬০০ করে টাকা নেয় ইউপি সদস্য মো. ছকেল বিশ্বাস। এছাড়াও ইউপি সদস্যের আপন চাচাতো ভাই মৃত হাতেম বিশ্বাসের ছেলে তাজেম বিশ্বাসের কাছ থেকেও চাল আনার খরচ বাবদ ৫০০ টাকা ও চৌকিদারদের খরচ বাবদ ১০০ টাকা নেয়া হয়। এছাড়াও একই গ্রামের শেখ ফরহাদের স্ত্রী সুফিয়া বেগমের কাছ থেকে চাল দেয়ার কথা বলে ৫০০টাকা নিয়েও তাকে চাল দেয়া হয়নি।
অনুসন্ধানে আরও বেরিয়ে আসে, দ্বিতীয় ধাপে ইউনিয়নের বিভিন্ন ওয়ার্ডের সুবিধা ভোগী ৭০টি পরিবারের মাঝে যে চাল বিতরণ করা হয়, তাদের অনেকেই পেশাদার জেলে নয়। কৃষি কাজসহ অন্যান্য পেশাজীবিতে জড়িত এমন সুবিধাভোগীর সংখ্যাই বেশি। চেয়ারম্যান মেম্বারদের পছন্দ মতো লোকের নাম তালিকাভুক্ত করা হয়েছে বলেও অনেকে এমন অভিযোগ করেন।
হরিরামপুর উপজেলা মৎস্য কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, শুধুমাত্র পেশাদার মৎস্যজীবিদেরকেই “জাটকা আহরণ থেকে বিরত থাকা জেলেদের জীবন নির্বাহের জন্য মানবিক সহায়তা কর্মসূচির আওতায়” সুবিধা পাওয়ার কথা থাকলেও ২০১৫/১৬ সালের মৎস্যজীবিদের তালিকায় বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষের নাম উঠে এসেছে, তালিকায় এমনটিও দেখা যায় ।
টাকার বিনিময়ে চাল দেয়ার ব্যাপারে ইউপি সদস্যের চাচাতো ভাই বকচর গ্রামের তাজেম বিশ্বাস জানান, “চাইল আনার খরচের জন্য ৫০০ টাকা এবং চৌকিদারকে দেয়ার জন্য ১০০ টাকা মোট ৬০০ টাকা মেম্বারকে দিয়ে চাইল আনছি। চাইল আনতে নাকি গাড়ি ভাড়া দেয়া লাগে, তাই দিছি।”
একই গ্রামের শেখ ফরহাদের স্ত্রী সুফিয়া বেগম জানান, “জাইল্যা কার্ডের চাইল দেয়ার কথা বইলা মেম্বার ছকেল বিশ্বাস আমাগো কাছ থেকে ৫০০ টাকা নিছে। কিন্তু টেকা নিয়েও আমাগো চাইল দেই নাই।”
শফিউদ্দিনের স্ত্রী জবেদা বেগম জানান, “আমাগো কাছ থেকে চাইলের বাবদ মেম্বার ৬০০ টেকা নিছে। খালি আমাগো কাছ থেকেই না, আমাগো শরীক বাড়ি গেন্দুর কাছ থেকেও ৬০০ টেকা নিছে।”
দোয়াত আলী জানান, “চাইল আনার গাড়ি ভাড়া বাবদ আমার কাছ থেকে ১০০ টাকা নিছে মেম্বার।”
ইউপি সদস্য মো. ছকেল বিশ্বাস জানান, “যে কয়জন অভিযোগ করেছে এরা সবাই আমার বিরোধী পক্ষ। কারও কাছ থেকে টাকা পয়সা নেয়া হয় নাই । আপনি চেয়ারম্যানের সাথে কথা বলেন।” তবে চাল আনা বাবদ খরচ নেয়াটা সঠিক কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এটা নিয়ম নাই।”
রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. কামাল হোসেন বলেন, “বিষয়টি নিয়ে আমি মেম্বার এবং অভিযোগকারীদের সাথে কথা বলব।”
হরিরামপুর উপজেলা মৎসজীবি সমিতির সাধারণ সম্পাদক নেপাল হালদারের কাছে মৎস্যজীবিদের তালিকায় ভিন্ন পেশাজীবিদের নামের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, “মূলত মৎস্যজীবিদের জন্যই জেলে কার্ড বরাদ্দ দেয়া হয়। কিন্তু স্থানীয় সরকারের চেয়ারম্যান মেম্বারদের অধীনে নামগুলো সংগ্রহ করার কারণে চেয়ারম্যান মেম্বাররা তালিকার সময় একটু এলোমেলো করে ফেলেছে। তবে পরবর্তীতে এগুলো যাচাই বাছাই করে সংশোধন সাপেক্ষে প্রকৃত জেলেদের যেন কার্ড দেয়া হয়, সে জন্য আমি উপজেলা প্রশাসনের নিকট দাবি জানাব।”
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সাইফুর রহমান জানান, “মৎস্যজীবিদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে চাল দেয়া সম্পূর্ণ অন্যায়। এ ব্যাপারে টাকা নেয়ার কোনো সুযোগ নেই।”
তালিকার ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “পেশাজীবি মৎসজীবি ছাড়া এই প্রকল্পের আওতায় সুবিধা পাওয়ার সুযোগ নেই।” ২০১৫/১৬ সালের দিকে চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের যাচাই বাছাইয়ে বর্তমান তালিকাটি তৈরি করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার জানান, “বিষয়টি আমাকে আগে কেউ বলেনি। আপনার মাধ্যমেই শুনলাম। এ বিষয়ে আমি তদন্ত করে যত দ্রুত সম্ভব যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। চাল দেয়ার নামে একটা টাকাও কারও কাছ থেকে নেয়ার কোনো সুযোগ নেই।”

Related Articles

Back to top button