মোঃ আব্দুর রব মনসুর, সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি: খরস্রোতা নদী যমুনার বুক চিরে জেগে উঠেছে অসংখ্য ধূসর বালুচর। তবে সেই ধূসরতা ছাপিয়ে এখন দু’চোখ যেদিকে যায়, শুধু সবুজ ঘাস আর কাইশার মায়াবী সমারোহ। চারদিকে যেন প্রকৃতির সবুজের চাদর। আর এই চাদরকে কেন্দ্র করেই যমুনা চরাঞ্চলের হাজারো দরিদ্র পরিবারের ঘরে ফিরছে সচ্ছলতার হাসি। চরের বুনো ঘাস ও কাইশা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলের খেটে খাওয়া মানুষ।
উপজেলার মাইজবাড়ী,খাসরাজবাড়ী, শুভগাছা, নাটুয়ারপাড়া, তেকানী, নিশ্চিন্তপুর, মনসুর নগর ও চরগিরিশ ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে জীবনসংগ্রামের এক অনন্য রূপ। যমুনা চরাঞ্চলে বরাবরই গো-খাদ্যের তীব্র সংকট থাকে। বিশেষ করে অসময়ে পানি বেড়ে যখন নিচু এলাকার জমি ও ঘরবাড়ির আঙিনা প্লাবিত হয়, তখন এই সংকট রূপ নেয় হাহাকারে। আর এই সংকটকে সম্ভাবনায় রূপ দিয়ে চরের ঘাস ও কাইশা কাটাকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন অনেকে।
এক সময়ের ঐতিহ্যবাহী টাটকা মাছের বাজারগুলো এখন রূপ নিয়েছে ‘ঘাসের বাজারে’। সরেজমিনে মেঘাই, ঢেকুরিয়া, কুমারিয়াবাড়ী, জর্জিরা, পানাগাড়ী, রঘুনাথপুর, গুলমোড় ও শুভগাছা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সকাল-সন্ধ্যা বসছে জমজমাট ঘাসের হাট। দূর-দূরান্ত থেকে ক্রেতারা আসছেন গবাদি পশুর খাদ্য কিনতে। বাজারে মিলছে নেপিয়ার, দুর্বাঘাস, গর্বাঘাস ও কাঁঠাল পাতাসহ নানা পদের পুষ্টিকর গো-খাদ্য। প্রকারভেদে প্রতি আঁটি কাঁঠাল পাতা ২০-৩০ টাকা, দুর্বাঘাস ৭০-৮০ টাকা, গর্বাঘাস ৮০-১২০ টাকা এবং নেপিয়ার ঘাস ৩০-৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ঢেকুরিয়া হাটে ঘাস বিক্রি করতে আসা নতুন মাইজবাড়ী চরের আকবর হোসেন বলেন, “বর্ষা ও শরৎকালে চরে তেমন কাজ থাকে না। এই সময়ে ঘাস বিক্রি করেই দিনে ৪০০-৫০০ টাকা রোজগার হয়, যা দিয়ে কোনো রকমে সংসার চলে।” মেঘাই বাজারের ঘাস বিক্রেতা আনিছুর রহমান জানান, এই ঘাস বিক্রির টাকা দিয়েই চলছে তাঁর সন্তানদের লেখাপড়া ও সংসারের খরচ।
অন্যদিকে, গবাদি পশুর মালিক রবিউল ইসলাম জানান, ঘরে ৪ থেকে ৭টি গবাদি পশু রয়েছে। বর্ষার এই কঠিন সময়ে চরের কাঁচা ঘাসই তাদের একমাত্র ভরসা। স্থানীয় বাসিন্দা আনোয়ারুল ইসলাম মনে করেন, যমুনার চরের মানুষের জীবনসংগ্রাম যেমন কষ্টের, তেমনি এই ঘাসের বাজারগুলো তাদের বেঁচে থাকার নতুন রসদ জোগাচ্ছে।
কাজীপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ দিদারুল আহসান এই উদ্যোগকে ইতিবাচক আখ্যা দিয়ে বলেন, “চরের অবহেলিত কাঁচা ঘাস ও কাইশা সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করার মাধ্যমে অনেক পরিবার স্বাবলম্বী হচ্ছে। একই সাথে পূরণ হচ্ছে গবাদি পশুর পুষ্টির চাহিদাও। এছাড়া বর্তমানে এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে প্রায় শতাধিক খামারি ঘাস চাষ শুরু করেছেন, যা স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনছে।”
নদীর ভাঙা-গড়ার খেলায় চরের মানুষের জীবন যেখানে অনিশ্চিত, সেখানে যমুনার এই সবুজ ঘাসই এখন চরাঞ্চলবাসীর টিকে থাকার সবচেয়ে বড় অবলম্বন।