শিরোনাম

মহাবিপন্ন তালিকার লজ্জাবতী বানর এখন মধুপুর বনাঞ্চলে

সিলেট ও চট্টগ্রামের চিরহরিৎ বনের বিলুপ্তপ্রায় লজ্জাবতী বানর এখন টাঙ্গাইলের মধুপুর বনাঞ্চলে বিচরণ করছে। পত্রঝরা গজারি বা শালবনে এর অস্তিত্ব মেলায় বন্যপ্রাণী বিশারদরা বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। বুধবার (২১ অক্টোবর) মধুপুর জাতীয় সদর উদ্যান রেঞ্জের লহুরিয়া বিটের গভীর জঙ্গলে এক সৌখিন ভিডিওগ্রাফারের ক্যামেরায় ধরা পড়ে মহাবিপন্ন তালিকার এ প্রাণী। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এটির সচিত্র খবর ভাইরাল হয়ে যায়।
মধুপুর পৌরশহরে সৌখিন ভিডিওগ্রাফার আব্দুর রহমান রুপম জানান, নিজস্ব অনলাইন চ্যানেল ‘ভয়েস অব মধুপুর’ এ প্রচারে জন্য বানর ও হনুমানের ওপর একটি ডকুমেন্টেশন নির্মাণ করছেন। এ ডকুমেন্টশনের শুটিং করার সময় ওই বনবিটের বাঁশঝাড়ে লজ্জাবতী বানরকে দেখতে পাওয়া যায়। খবর পেয়ে স্থানীয় বনকর্মীরাও সেখানে হাজির হন। তারা বিরল প্রজাতির এ বন্য প্রাণী অবলোকন করে বিস্মিত হন।
দোখলা রেঞ্জ অফিসার আব্দুল আহাদ জানান, মধুপুর বনাঞ্চলে হরিণ, বাঘডাস, বনবেড়াল, খরগোশ, বনমুরগি, বানর, হনুমানসহ নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী দেখা হলেও কখনো লজ্জাবতী বানর দেখা যায়নি। মধুপুরের পাহাড়জুড়ে এখন কলা চাষ হয়। অনেক সময় খাদ্য সংকট হলে ক্ষুধার্ত বানর ও হনুমান খাবারের লোভে কলার ট্রাকে চড়ে বসে। সেসব ট্রাক কলার চালান নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে গিয়ে থাকে। এভাবে কলার ট্রাকের সাথে বানরহনুমান বিভিন্ন স্থানে হিজরত করে। একইভাবে হয়তো সিলেট থেকে কোন অনাহারী লজ্জাবতী বানর ট্রাকে চড়ে মধুপুর এসেছে। তারপর কোন না কোনভাবে সে মধুপুরের গজারি বনে আশ্রয় নিয়েছে। কারণ লজ্জাবতী বানর শালবনের প্রাণী নয়।
তরুণ বন্যপ্রাণী গবেষক এবং আইইউসিএনের বানর বিশেষজ্ঞদলের সদস্য তানভীর আহমেদ জানান, বিশ্বে প্রাইমেট বর্গের ৭৯ গোত্রের ৫০৪ প্রজাতির বানর রয়েছে। তবে বাংলাদেশে রয়েছে ১০ প্রজাতির বানর-হনুমান। এর ৬ প্রজাতি বিপদগ্রস্ত তালিকার। আর লরিসিডি পরিবারের লজ্জাবতী বানর মহাসংকটাপন্ন। এটি নিশাচর ও লাজুক স্বভাবের। লাজুক স্বভাবের বলে এর নাম লজ্জাবতী বানর। এটি সাধারণত দৈর্ঘ্যে ২৬ থেকে ৩৮ সেন্টিমিটার এবং ওজন ১ থেকে ২ কেজির হয়ে থাকে। এর মাথা গোলাকার, মুখ চ্যাপ্টা, মায়াবী চোখ দুটো বেশ বড়। তবে কান ও লেজ ছোট। শরীর ঘন ময়লাটে সাদা-বাদামী লোমে ঢাকা। মাথার ওপর হতে গাঢ় রংয়ের দাগ পিঠ বেয়ে নিচে নেমে গেছে। এরা একাকী এবং নীরবে থাকতে পছন্দ করে। সারা দিন গাছের উঁচু কোটরে অথবা পাতা ভরা ঘন ডালের আঁধারে ঘুমিয়ে কাটায়। সন্ধ্যার পর একা বা জোড়ায় খাবারের সন্ধানে নামে। এরা বাঁচে বড়জোর ২০ বছর। বছরে একবার একটি মাত্র বাচ্চা প্রসব করে। চিরসবুজ ও বৃষ্টিপাতপূর্ণ ঘন বন বা বাঁশঝাড় এদের খুব পছন্দ। বর্তমানে সিলেটের শ্রীমঙ্গলের বনাঞ্চলে এদের দেখা মেলে। দশ বছর আগে চট্টগ্রামের বনাঞ্চলে এদের দেখা গেছে বলে চট্টগ্রাম বনগবেষণা কেন্দ্র দাবি করেন।
বানর বিশেষজ্ঞরা জানান, পোকামাকড়, ছোটফলমূল, গাছের নরম বাকল এবং জিগার আঠালো খাবার এদের খুব পছন্দের। ফুলফলের পরাগায়নে এদের বড় ভূমিকা রয়েছে। বিগত দুই দশকে এদের সংখ্যা অর্ধেকে নেমেছে। দেখতে খুব সুন্দর বলে আন্তর্জাতিক চোরাবাজারে এর চাহিদা বেশি। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, মিয়ানমার, চীন, কম্পোডিয়া, লাওস, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে এদের দেখা মেলে। লজ্জাবতী বানরের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এরা বিষাক্ত প্রাণী। এরা রেগে গেলে আত্মরক্ষার জন্য গ্রন্থিথলি থেকে মুখে বিষ আনে এবং শত্রুকে কামড়ে দেয়। এর কামড়ে বিষাক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা ব্যয়বহুল।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এবং বানরবিদ ড.ফরিদ আহসান ১৯৭৯ থেকে ৮১ সাল পর্যন্ত লজ্জাবতী বানর নিয়ে গবেষণা করেন। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত তার গবেষণা পত্র থেকে দেখা যায়, ময়মনসিংহ বনবিভাগের শেরপুরের বালিজুড়ি রেঞ্জের গজারি বনে লজ্জাবতী বানর রয়েছে। কিন্তু ২০১০ সালে এখানকার বন লজ্জাবতী বানর শূন্য হয়ে যায় বলে এক বন বিভাগীয় রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়।
সাবেক বিভাগীয় বনকর্মকর্তা শামসুল হক জানান, ব্যাপকহারে প্রাকৃতিক বন উজাড়, খাদ্যাভাব, আবাসস্থল ধ্বংস, অবৈধ শিকার, বিদেশি গাছের বনায়ন এবং বনভূমি জবরদখলের ফলে লজ্জাবতী বানরসহ বহু প্রজাতির বন্যপ্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।
মধুপুর বনাঞ্চলের সহকারী বন সংরক্ষক জামাল হোসেন তালুকদার জানান, বছর দেড়েক যাবৎ এ লজ্জাবতী বানরটি মধুপুর বনে ঘুরেফিরে বেড়াচ্ছে। অতিথি হিসাবে এর আগমন। ঠিক কখন, কিভাবে এটি মধুপুর বনাঞ্চলে এসেছে তা বলা যাচ্ছেনা।
টাঙ্গাইল বিভাগীয় বন কর্মকর্তা জহিরুল হক জানান, মধুপুর বনাঞ্চলে লজ্জাবতী বানরের বসবাসের কোন ইতিহাস নেই। এটি পুরোটাই চিরহরিৎ বনের প্রাণী। শুস্ক মৌসুমে মধুপুর বনাঞ্চল পাতাশূণ্য হয়ে গেলে সাধারণ বানর-হনুমানের তখন খাবার সংকট চলে। এখানে লজ্জাবতী বানরের টিকে থাকা খুবই কঠিন।
ইত্তেফাক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button