বিবিধ

রেনুকে পিটিয়ে হত্যা : সুবিচারের অপেক্ষায় পরিবার

ছেলেধরা সন্দেহে রাজধানীর বাড্ডা এলাকায় গণপিটুনিতে তাসলিমা বেগম রেনু হত্যা মামলায় ১৫ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ। গত ৭ই সেপ্টেম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে এ অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এ হত্যা মামলায় অভিযুক্তের ১৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একজন অভিযুক্ত এখনো পলাতক রয়েছে বলে জানিয়েছেন, তদন্ত কর্মকর্তা। তাদের মধ্যে তিন অভিযুক্ত আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।
গোয়েন্দা ও অপরাধ তথ্য (মতিঝিল) বিভাগ মামলাটির তদন্ত করে অপ্রাপ্তবয়স্ক অভিযুক্ত মো. জাফর হোসেন পাটোয়ারী (১৭) ও ওয়াসিম ওরফে মো. অসিম আহম্মদের (১৪) বিরুদ্ধে পৃথক অভিযোগপত্র দাখিল করেছে। এ ছাড়া পলাতক রয়েছে অভিযুক্ত মো. মহিউদ্দিন (১৮)।
মহাখালীতে চার বছরের মেয়েকে নিয়ে থাকতেন রেনু।
দুই বছর আগে স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয় তার। ১১ বছরের ছেলে তাসিন আল মাহির ও মেয়ে তাসমিন তুবাকে উত্তর-পূর্ব বাড্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করানোর জন্য খোঁজখবর নিতে গেলে ছেলে ধরা সন্দেহে গণপিটুনির শিকার হন। ঘটনাস্থলেই মারা যান তিনি। চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তার বোনের ছেলে সৈয়দ নাসির উদ্দিন টিটু বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা চার-পাঁচ শ’ জনকে আসামি করে বাড্ডা থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।
এ বিষয়ে মামলার বাদী সৈয়দ নাসির উদ্দিন টিটু মানবজমিনকে বলেন, মামলায় অভিযুক্ত গ্রেপ্তারকৃত ১৪ জন আসামির মধ্যে ছয় জন ইতিমধ্যে উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়েছে। অভিযোগপত্র দেয়ার পর কিছুটা হতাশ হয়েছি। অনেক বিষয় আমরা যেভাবে প্রত্যাশা করেছিলাম সে অনুযায়ী হয়নি। যখন দেখছি একের পর এক আসামি জামিনে বেরিয়ে যাচ্ছে তখন সিদ্ধান্ত নেই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করবো না। এখন ট্রায়ালের অপেক্ষায় আছি। মামলার বিষয়ে পুরোপুরি সন্তুষ্ট যেটাকে বলে তার আংশিকও হতে পারিনি। তারপরেও মেনে নিতে হচ্ছে। আমরা চাচ্ছি এরকম একটি বিচার হোক যেখানে একটি মেসেজ বা বার্তা থাকবে। যাতে আর ভবিষ্যতে কেউ এই ধরনের অমানবিক সহিংসতার শিকার না হয়। এভাবে কারো মৃত্যু যাতে না ঘটে। আমার খালা চলে গেছেন। তাকে আমরা আর পাবো না। কিন্তু তিনি যে দুই ছেলেমেয়ে রেখে গেছেন ওরাও ওদের মা’কে আর কখনোই খুঁজে পাবে না। সুন্দর একটি দেশ আমরা চাই।
তিনি বলেন, আমরা পরিবারের প্রত্যেক সদস্যই মানসিক ট্রমার মধ্যে আছি। খালা মারা যাওয়ার পর থেকে এখনো আমরা কেউ দুই থেকে তিন ঘণ্টার বেশি ঘুমাতে পারি না। তার দুই ছেলেমেয়েকে নিয়ে আমাদেরকে চিন্তা করতে হচ্ছে। কীভাবে ওদের বড় করবো। ওরা যখন বুঝতে পারবে ওদের মায়ের এরকম মৃত্যু হয়েছে। বিষয়টি কীভাবে চিন্তা করবে, কীভাবে দেখবে, ভাববে? আমাদের যতটুকু সম্ভব চেষ্টা করি ওদেরকে ভালো রাখতে। আমাদের চিন্তাভাবনা জুড়ে ওরা দু’জন। পরিবারের অন্য সদস্যদের অবস্থা খুবই খারাপ। এই হত্যা মামলার বিচার যদি সঠিক না হয় তাহলে আমাদের সবকিছুই হারিয়ে ফেলবো। খালাকে তো হারিয়েছি। কিন্তু আমরা চাচ্ছি সুষ্ঠু এবং সুন্দর একটি বিচার। যারা প্রত্যক্ষভাবে হামলায় অংশগ্রহণ করেছে আমরা তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাচ্ছি।
তিনি জানান, এটা এমন একটি মামলা যার পুরো ভিডিও ফুটেজ দেশের মানুষের হাতে হাতে চলে গেছে। সারা দেশের মানুষ দেখেছে কতটা নৃশংস ছিল ওরা। অন্য কোনো প্রাণীকেও মানুষ এভাবে মারে না। ছেলে মাহি তার মা চলে যাওয়ার ঘটনাটা বুঝতে পারলেও মেয়ে তুবা এখনো ওভাবে কিছুই বুঝতে পারছে না। তুবা হঠাৎ হঠাৎ আনমনা হয়ে যায়। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। নিজের সন্তানের মতো করে ওদের মানুষ করার চেষ্টা করছি।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উপ-কমিশনার (ডিসি) মশিউর রহমান বলেন, পদ্মা সেতু নির্মাণের সঙ্গে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত গুজব রটিয়ে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করা হয়। কিছুটা মানসিক দুশ্চিন্তাগ্রস্ত এক নারীকে কিছু মানুষরূপী অমানুষের দল এভাবে নির্যাতন করে মেরে ফেলেছে। ডিএমপি গোয়েন্দা পুলিশের রমনা বিভাগ ঘটনার ভিডিও ফুটেজ এবং অন্যান্য গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে প্রকৃত আসামিদের অধিকাংশকেই গ্রেপ্তার করেছে। এ ঘটনায় আলোচিত নীল গেঞ্জি পরা হৃদয়সহ বাকি চারজনের ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি নেয়া হয়েছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আব্দুল হক জানান, তদন্ত শেষে ইতিমধ্যে আমরা আদালতে চার্জশিট (অভিযোগ পত্র) দিয়েছি। এখন আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর বাকিটা নির্ভর করে। নিহত রেনুর পরিবারের সদস্যদের প্রত্যাশানুযায়ী সঠিক তদন্তে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি এবং ন্যায়বিচারের জন্য কাজ করেছি। উল্লেখ্য, উত্তর-পূর্ব বাড্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি সংক্রান্ত তথ্যের জন্য গেলে ছেলে ধরা সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হয় রেনুকে। গত বছরের ২০শে জুলাই চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাটি ঘটে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button