আন্তর্জাতিক সংবাদশিরোনাম

মিয়ানমারের খনিতে মুত্যুর ঝুঁকি নিয়ে জেড পাথর খুঁজে বেড়ায় যারা

গত মাসেই মিয়ানমারে মূল্যবান জেড পাথরের খনিতে ভূমিধসে ২০০ জন লোকের মারা যাবার খবর অনেকেই পড়েছেন। এটি ছিল মিয়ানমারের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় খনি দুর্ঘটনা। কিন্তু ওই দুর্ঘটনা থেকে যারা বেঁচে গেছে – তারা আবার ফিরে গেছে সেই একই খনিতে। কারণ এই বিপজ্জনক কাজ ছাড়া আর কোন উপার্জনের পথ তাদের নেই । এই জেড পাথর আহরণ নিয়ে বিবিসির সো সো তুন আর রেবেকা হেঞ্চকের রিপোর্ট।

মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলীয় কাচিন রাজ্যে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ জেডের খনিতে কাজ করেন ২১ বছরের সি থু ফিও।

মিয়ানমারের এই জেড পাথর উত্তোলন এক বিশাল ব্যবসা। পৃথিবীর ৭০ শতাংশ জেড উৎপন্ন হয় মিয়ানমারে আর চীনাদের কাছে অন্যতম আকাঙ্খিত বস্তু হচ্ছে এই জেড। প্রতি বছর এই বাণিজ্য থেকে শত শত কোটি ডলার আয় করে মিয়ানমার।

দুর্ঘটনার দিন আরো শত শত লোকের মতোই খনিতে জেডের ছোট ছোট টুকরো কুড়োচ্ছিলেন সি থু।

হঠাৎ তিনি টের পেলেন, তার পায়ের নিচে মাটি দুলছে আর ঝুরঝুর করে আলগা হয়ে যাচ্ছে।

তিনি ছুটে পালাতে চেষ্টা করলেন, কিন্তু পারলেন না। পানি, কাদা আর পাথরের একটা বিরাট ঢেউ এসে তাকে যেন গিলে ফেললো।

পানির ভেতর হাবুডুবু খাচ্ছিলেন সি থু । “আমার মুখের ভেতরটা কাদায় ভরে গিয়েছিল। পাথরগুলো ছিটকে এসে গায়ে লাগছিল, আর এক একটা ঢেউ এসে আমাকে বার বার ডুবিয়ে দিচ্ছিল। আমার মনে হচ্ছিল আমি মারা যাচ্ছি।‍“

মিয়ানমার জেড খনি
ভূমিধসে ধ্বংস হওয়া বাড়িঘর

কিন্তু সি থু কোনমতে সাঁতার কেটে রক্ষা পেয়েছিলেন। কিন্তু পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার সময় তিনি জানতেপারলেন, তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মধ্যে সাত জন ওই ধসে প্রাণ হারিয়েছেন।

সি থু বলছেন, তার বন্ধুরা ছিল তার ভাইয়ের মতো, প্রায়ই তারা একই বিছানায় ঘুমোতেন।

যে পাহাড়ে তিনি সেদিন জেড পাথর কুড়োচ্ছিলেন, তা সি থুর বাড়ি থেকে দেখা যায়। ছোট্ট সেই বাড়িটিতে বাস করেন ৯ জন মানুষ।

“আমার মনে হয়, আহা যদি সেদিনের সেই শোকাবহ ঘটনাটা একটা নিছক দু:স্বপ্ন হতো ! তাহলে আমি জেগে উঠে দেখতাম, কোথাও কোন ভুমিধস হয়নি, আমার বন্ধুরাও সবাই বেঁচে আছে“ – বলছিলেন সি থু – “আমি যে বেঁচে গেছি সে জন্য আমার নিজেকেই মাঝে মাঝে অপরাধী মনে হয়।“

কাচিন রাজ্যের এই খনিগুলোতে বর্ষা মৌসুমে প্রায় প্রতি বছরই মারাত্মক সব ভূমিধস হয়ে থাকে।

এই খনিগুলো থেকে আহরণ করা হয় পৃথিবীর জেড পাথরের প্রায় ৭০ শতাংশ। চীনাদের খুব প্রিয় এই জেড পাথর। বছরে শত শত কোটি ডলায় আয় করে মিয়ানমারের এই জেড পাথর রপ্তানি করে।

গত মাসের ভূমিধসের মতো ভয়াবহ ধস আগে কখনো হয়নি। আগে যেগুলো ঘটেছিল, তার সাথে এবারেরটির তফাৎ হলো – এটির ভিডিও ধরা আছে প্রত্যক্ষদর্শীর মোবাইল ফোনে।

‍“সামাজিক মাধ্যম মানুষকে সচেতন করে তুলেছে” বলছেন সি থু – “যখন ইন্টারনেট বা ফোন ছিল না তখন কর্তৃপক্ষ বা খনি কোম্পানি হয়ত ব্যাপারটা পাত্তাই দিত না।“

কিন্তু এবার চাপের মুখে মিয়ানমারের সরকার একটা তদন্ত কমিটি গঠন করেছে – যার প্রধান হলেন সেদেশের পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদ বিষয়ক মন্ত্রী ওন উইন।

এই কমিটির কাজ হচ্ছে ভূমিধসের জন্য কারা দায়ী তা বের করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা।

সেই কমিটির রিপোর্ট এখন মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের কাছে গেছে – তবে তাতে কি আছে তা এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

তবে মি. উইন একটা মন্তব্য করেছিলেন যে যারা মারা গেছে তারা ছিল “লোভী” কারণ ওই সময়টায় বর্ষার জন্য খনিগুলো বন্ধ ছিল, এবং সরকারও প্রবল বৃষ্টিপাত হবে বলে সতর্কবার্তা জারি করেছিল। ‍ মন্ত্রী বলেছিলেন, লোভই তাদের মৃত্যুর কারণ।

আর এতে জেড-কুড়ানো লোকদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে ক্রোধ।

দেশটির কার্যত নেত্রী অং সান সূচি অবশ্য ইঙ্গিত করেন যে বেকারত্বের পরিমাণই ঘটনার জন্য দায়ী।

সেই দুর্ঘটনার দিন আরো যারা খনিতে গিয়েছিলেন তাদের একজন ইয়ান নাইঙ মিও। একটা খালি তেলের ব্যারেল আঁকড়ে ধরে থাকায় তিনি বেঁচে গিয়েছিলেন।

তিনি বলছিলেন, সেদিন কেউ কেউ ভাসমান মৃতদেহ আঁকড়েও প্রাণ বাঁচিয়েছে। কিন্তু পরিবেশমন্ত্রীর কথা তিনি অত্যন্ত মর্মাহত হয়েছেন।

“আমরা যখন শোকাহত তখন মন্ত্রীর এমন কথায় আমরা মনে খুবই আঘাত পেয়েছি।“

মিয়ানমার জেড খনি
জেড খনিতে ছোট শিশুরাও কাজ করে

ইয়ান নাইংএর বয়স মাত্র ২৩, তিনি বর্মী সাহিত্যে স্নাতক ডিগ্রিধারী। তার শরীরে অনেকগুলো ক্ষতচিহ্ন, মাথায় ১৪টি সেলাই পড়েছে।

তিনি বলছেন, তিনি জেড পাথর কুড়ানোর কাজ শুরু করেছিলেন স্রেফ পকেট মানি-র জন্য। তা-ও করতেন শুধু ছুটির দিনগুলোতে।

কিন্তু ডিগ্রি পাশ করার পর খনিতে এই কাজ করাটাই তার উপার্জনের একমাত্র পথ হয়ে দাঁড়ায়।

সি থু অবশ্য অতদূর পড়াশোনাও করেননি।

তিনি ১০ বছর বয়েসেই স্কুলে যাওয়া ছেড়ে দেন – যখন ২০০৮ সালেল সাইক্লোন নার্গিসে তার পরিবারের ধানক্ষেত ধ্বংস হয়ে আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে যায়।

মিয়ানমার জেড খনি
পাহাড়ের গায়ে খাঁজ কেটে চলছে জেড পাথর আহরণ

এখন ১০ জনের পরিবার নিয়ে সি থু খনির কাছেই বাস করেন।

তিনি প্রতিদিন ঘুম থেকে ওঠেন ভোর পাঁচটায়, সারাদিন ধরে মূল্যবান পাথর খোঁজার কাচ করেন।

অরাজক এলাকা

এই জেড-কুড়ানো লোকেরা দারিদ্র আর বেকারত্বের শিকার।

তাদের অধিকারের জন্য কাজ করেন এমন কর্মীরা বলেন, খনির আশপাশে যেসব এলাকায় এরা জেড খুঁজে বেড়ান – সেগুলো খুবই বিপজ্জনক এলাকা।

মিয়ানমারের সরকারেরও এসব এলাকার ওপর খুব বেশি নিয়ন্ত্রণ নেই।

গ্লোবাল উইটনেস নামে প্রাকৃতিক সম্পদ শোষণের ব্যাপারে নজরদারি করে এমন একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মী পল ডেনোউইৎজ বলছেন – খনি এলাকায় লড়াই, আইনের শাসনের অভাব, এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতার মত সমস্যার প্রতি নজর না দিয়ে এ ঘটনার শিকার যারা হয়েছেন তাদেরকেই দোষারোপ করা হচ্ছে।

মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সাথে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো এ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে, এবং তারা কাজ করে অত্যন্ত গোপনে।

তা ছাড়া এই অঞ্চলে স্বায়ত্বশাসন প্রতিষ্ঠার দাবিতে তৎপর কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং মাদক চক্রও এখানে সক্রিয়ভাবে চাঁদা তোলে।

মি. ডনোউইৎজ বলেন, তারা এমনও প্রমাণ পেয়েছেন যে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও সশস্ত্র জাতিগত গোষ্ঠীগুলো মধ্যে যুদ্ধ চলতে থাকলেও – জেড খনি এলাকায় তারা পরস্পরকে সহযোগিতা করছে।

নেচারাল রিসোর্স গভার্নেন্স ইনস্টিটিউটের ২০১৯ সালের এক হিসাব অনুযায়ী মিয়ানমারের খনি থেকে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ( ১৫০০ কোটি) মার্কিন ডলারের জেড পাথর আহরিত হয়ে থাকে – তবে এর বেশিরভাগই অবৈধভাবে উত্তোলন করা হয়।

তবে সরকারি উপাত্তে এর মূল্যমান মিলিয়নের কোঠায় বলে বলা হয়।

মি. ডনোউইৎজ বলছেন, সরকার এখানে তার রাজস্ব আয়ের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশই হারাচ্ছে।

কাচিন স্টেটের এই জেড পাথরের বেশির ভাগই সীমান্ত পার হয়ে চীনে চলে যায় বলে মনে করা হয়।

চীন এখন ক্রমশ: ধনী দেশ হয়ে ওঠার ফলে এই উজ্জ্বল সবুজ রঙের পাথরের কদর এখন আকাশ ছুঁয়েছে। সর্বোচ্চ মানের জেড পাথরের দাম সেখানে সোনার চেয়েও বেশি।

সি থু বলছিলেন, তিনি যদি জেডের বড় একটা টুকরো খুঁজে পান তাহলে তার খনি কোম্পানি বা সশস্ত্র গোষ্ঠীকে – অথবা উভয়কেই তার আয়ের একটা অংশ দিতে হয়।

কোন কোন সময় তারাই পাথরটা নিয়ে নেয়।

“একবার আমার এক বন্ধু একটা বড় জেড পাথর পেয়েছিল। কিন্তু ওরা আমাদের প্রতি যে আচরণ করে তার কারণে ত্যক্তবিরক্ত হয়ে সে ওটা পানিতে ফেলে দিয়েছিল। আমরা যেহেতু দিন আনি দিন খাই, তাই আমাদের তারা কোন সুযোগ দেয় না।“

খনি শ্রমিকদের মধ্যে মাদক সেবনের প্রবণতাও ব্যাপক। মাদকসেবীদের অনেকে বিবিসিকে জানিয়েছেন একবার হেরোইন সেবন করতে তাদের খরচ হয় মাত্র এক ডলার।

যে খনিতে ভূমিধস হয়েছে – সেখানে সক্রিয় চারটি কোম্পানির একটিকে স্থানয়ীভাবে ডাকা হয় ট্রিপল ওয়ান মাইনিং কোম্পানি বলে। তারা একটি চীন-মিয়ানমার যৌথ বিনিয়োগ কোম্পানি এবং তাদের সাথে ওয়া নামে একটি জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর সম্পর্ক আছে।

একজন সরকারী কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সরকারের সাথে শান্তি চুক্তি করেছে তাদের এদেশে বিনিয়োগ করতে দেয়া হয়।

২০১৯ সাল থেকে জেড খনিতে বিদেশী বিনিয়োগ নিষিদ্ধ করা হলেও যৌথ বিনিয়োগে কোন বাধা নেই। চীনা কোম্পানিগুলো তাই করছে – যাতে সরকারি মালিকানা ২৫ শতাংশ।

তবে গ্লোবাল উইটনেস এক নতুন রিপোর্টে বলছে , মাইনিং কোম্পানিগুলোন মধ্যে অন্তত ৮টির সাথে সাবেক বা বর্তমান সামরিক কর্মকর্তা এবং জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর নেতাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। তবে তারা বলছে, ১৬৩টি মাইনিং কোম্পানির সরকারি তালিকা অসম্পূর্ণ এবং এতে ট্রিপল ওয়ান অন্তর্ভুক্ত হয় নি।

ওই ভূমিধসের এক মাস পরও অনেকে নিখোঁজ আছে – যাদের মৃতদেহ এখনো পাওয়া যায়নি।

যারা এই ধসের শিকার হয়েও বেঁচে গেছেন তারা জানেন যে কোন সময় আবার আরেকটি ধস নামতে পারে।

কিন্তু তা জেনেও তারা আবার কাজ করতে ফিরে যাচ্ছেন সেই খনিতেই।

সি থু বলছেন, তিনি অপেক্ষা করছেন কবে তার আঘাত পুরোপুরি সেরে যাবে – তাহলে তিনিও আবার কাজে ফিরবেন।

“তবে আবার যদি ধস নামে তাহলে আমি দৌড়ে পালাতে দেরি করবো না” – বলেন তিনি।

সুত্র : বিবিসি

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button