আসছে কোরবানি : প্রস্তুত রংপুরের খামারিরা

রাহুল সরকার : কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে গবাদি পশু মোটা তাজা করণে ব্যস্ত সময় পার করছেন রংপুর বিভাগের ৮ জেলার খামারিরা। করোনাকালেও বিভিন্ন স্থানে ছোট বড় গরু ও ছাগলের খামারিরা ভালো লাভের আশায় বুক বেঁধেছেন। এবার রংপুর বিভাগে কোরবানির জন্য পাঁচ লাখ ৬৮ হাজার গরু ও এক লাখ ৫০ হাজার ৪০৯টি ছাগল ও ভেড়া প্রস্তুত করা হয়েছে।
রংপুর বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের তথ্য মতে, রংপুর বিভাগে ৩ থেকে ৫টি গরু পালন করে এমন গরুর খামার রয়েছে এক লাখ ৫৭ হাজার ৮০৩টি। ৬ থেকে ১১টি গরু পালন করে এমন খামার রয়েছে ১২ হাজার ৭৭৯টি। ১২ থেকে ২৯টি গরু পালন করে এমন খামার রয়েছে ১ হাজার ১শ’৬৫টি এবং ৩০ থেকে ৫০টি গরুর খামার রয়েছে ১শ’৯টি। এছাড়াও ৫১টির উপরে পালন করে এমন খামার রয়েছে ৩০টি। এসব খামারে কোরবানির গরু এরই মধ্যে প্রস্তুত হয়েছে বলে প্রাণি সম্পদ অধিদপ্তর দাবী করেছে।
সরেজমিন বিভিন্ন এলাকা ঘুরে খামারিরা জানান, ¶তিকর হরমোন কিংবা ইনজেকশনের ব্যবহার ছাড়াই দেশীয় পদ্ধতিতে গবাদি পশু পালন করছেন তারা। কিন্তু করোনার এই পরিস্থিতিতে গরুর ন্যায্য দাম নিয়ে আশঙ্কা রয়েছে। তারা পশু খাদ্যের মূল্য স্থিতিশীল রাখতে সরকারের পক্ষ থেকে নিয়মিত মনিটরিংয়ের দাবী জানিয়ে বলেন- এতে মানুষের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে।
রংপুর মহানগরীর দর্শনা সুত্রাপুর এলাকার খামারী শাহ মোঃ আশরাফুদ্দৌলা আরজু জানান, ঈদে বিক্রয়ের জন্য তার খামারে বিভিন্ন জাতের প্রায় শতাধিক গরু প্রস্তুত করা হয়েছে। একটি গরুর পেছনে প্রতিদিন ব্যয় হচ্ছে ২০৬ টাকা থেকে ২১০টাকা পর্যন্ত। তিনি বলেন, প্রতিটি গরুই ভাল ও তরতাজা। তাই ভাল দাম পাওয়ার আশা করছি। মিঠাপুকুরের বলদিপুর এলাকার খামারি নজরুল ইসলাম বলেন, ৪৫ হাজার টাকায় তিন বছর আগে একটি উন্নত জাতের গরু কিনেছিলাম। গত বছর বাজারে এর দাম সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা উঠেলেও বিক্রি করিনি। বর্তমানে গরুটির বয়স তিন বছর ১১ মাস। শরীরীকভাবে এটির দৈর্ঘ্য ১০ ফুট ও প্রস্থ ৬ ফুট। এর ওজন প্রায় ২০ মণ। এটি কাঁচা ঘাস, খৈল, গমের ভুসি এবং চালের পালিশ (ধান ভাঙানোর সময় চালের গায়ে থাকা ভিটামিনসমৃদ্ধ গুঁড়ো) নিয়মিত খাওয়ানো হয়। এটিকে নিয়মিত গোসল করানো হয়। প্রতিদিন এর পিছনে প্রায় ২০০ টাকা খরচ হয়।
রংপুর সদর উপজেলার চন্দনপাট ইউনিয়নের শরিফুল ইসলাম জানান, একটি গরুর জন্য দিনে ১৩৫ টাকা খরচ হয়। প্রতিদিন খাবার হিসেবে খৈল, ভুসি, কুঁড়া, ফিড ও কাঁচা ঘাস দিতে হয়। তিনি বলেন, এ বছর ১২টি গরু মোটাতাজা করেছি। মানভেদে প্রতিটি গরুর দাম ৫০ হাজার থেকে
দুই লাখ টাকা পর্যন্ত হবে বলে আশা করছি। তবে একই এলাকার জাহাঙ্গীর আলম হতাশা প্রকাশ করে বলেন, করোনা দূর্যোগে গরুর মূল্য নিয়ে চিন্তায় আছি। রংপুর জেলা ডেইরি ফার্মার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি লতিফুর রহমান মিলন জানান, করোনা পরিস্থিতিতে সরকার বিভিন্ন সেক্টরে প্রণোদনা চালু রেখেছেন। ব্যবসায়ীদের বিভিন্নভাবে সাহায্য করা হচ্ছে। চাষিরা প্রণোদনা পাচ্ছেন। কিন্তু রংপুর জেলায় সাড়ে তিন হাজারের উপর গরুর খামার রয়েছে। যেখানে প্রায় সাত হাজার শ্রমিক-কর্মচারীর কর্মসংস্থান হচ্ছে। অথচ এই দূর্যোগে তারা কোনো তারাকোন সাহায্য পায়নি। এতে করে ছোট বড় অনেক খামার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ও বেকারত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে।
রংপুর কেন্দ্রীয় বাসটার্মিনাল এলাকার গবাদি পশুর খাদ্য সরবরাহকারী রশিদুল ইসলাম জানান, পশু খাদ্যের মূল্য তালিকা প্রতিদিন উঠানামা করছে। দেখা গেছে – একদিনের ব্যবধানে গমের ভুষি প্রতি বস্তায় বেড়েছে ১শ’ টাকা থেকে ১৫০ টাকা। তিনি বলেন, গমের মোটা ভুষি প্রতি বস্তা (৩৭ কেজি) বিক্রি করা হচ্ছে ১ হাজার ২শ’টাকা ও চিকন ভুষি (৫৫ কেজি) ১ হাজার ৬৫০ টাকায়। এছাড়া প্রতি বস্তা ডাবলি( ১৫ কেজি) বিক্রি হচ্ছে ৫৮০ টাকা, প্রতি বস্তা মসুরের ভুষি (২৫ কেজি) ৮৫০ টাকা, প্রতি বস্তা ধানের কুঁড়া (৩৭ কেজি) ৪৮০ টাকা, প্রতি বস্তা চালের খুদ(৫০ কেজি) খুদ বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৩শ’ টাকা।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে রংপুর বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের উপ-পরিচালক হাবিবুল হক জানান, গত বছর কোরবানিতে রংপুর বিভাগে ৩ লাখ ৪৮ হাজার ৮৩০টি গরু ও ৯৬৬টি মহিষ জবাই করা হয়েছিল। এ ছাড়াও এক লাখ ছাগল ও প্রায় দেড় লাখ ভেড়া কোরবানি করা হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে খামারিরা যাতে গবাদি পশুর ন্যায্য মূল পান সেই দিক বিবেচনা করে স্বাস্থ্যবিধি মেনে গরুর হাট বসানোর চিন্তা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, বর্তমানে গবাদী পশুরযে মজুদ রয়েছে তাতে রংপুর বিভাগের চাহিদা পূরণ করে অন্যান্য এলাকায় জোগান দেওয়া সম্ভব হবে।



