নারী-পুরুষের অবাধ কনসার্টে ছুরিকাঘাত করায় সৌদিতে যুবকের শিরশ্ছেদ
আর মাত্র কয়েকদিন বাদেই পবিত্র রমযান মাস শুরু হচ্ছে। বহু মুসলিম দেশে প্রথা রয়েছে, ক্ষমার মাস রমযান উপলক্ষ্যে মামলার গুরুত্ব ও সাজা ভোগের ওপর ভিত্তি করে বেশ কিছু কয়েদিকে মুক্তি দেওয়া হয়। এবার মুহাম্মদ বিন সালমান শাসিত সৌদি আরব ভিন্ন পথে হাঁটল।
রমযানের প্রাক্কালে সৌদি কতৃর্পক্ষ শিরশ্ছেদ করল একজন আসামির। সৌদি আরব কর্তৃপক্ষ বর্তমানে বিভিন্ন বিষয়ে আমেরিকা ও পাশ্চাত্যের অন্যান্য দেশকে অনুসরণ করছে। তারমধ্যে রয়েছে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধও। তারা সারাদেশে নাচ-গানের আসর কনসার্ট নাইটক্লাব ইত্যাদির ঢালাও আয়োজন শুরু করেছে। আর তাতে সৌদি আরবের তরুণ-তরুণীদের অংশ নেওয়ার জন্য প্রভূত উৎসাহ জোগাচ্ছে।
ইসলামের দুই পবিত্র শহর মক্কা-মদিনার দেশ এবং নবী মুহাম্মদের (সা.) জন্মস্থান ও কর্মক্ষেত্র হিসেবে এই এলাকার ছিল আলাদা মর্যাদা ও গুরুত্ব। ফলে এখানে ‘পপ কালচার’, ‘বার কালচার’, ‘নাইটক্লাব’, অচেনা নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা প্রভৃতি নিষিদ্ধ ছিল। দেশের প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী সউদির যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমান এসব কিছুই পালটে দিয়েছেন। অন্ধভাবে মার্কিনিদের অনুসরণই এখন সৌদির নয়া লক্ষ্য।
ইমাদ-আল-মানসৌরি নামে ৩৩ বছর বয়স্ক যে যুবককে সৌদি জল্লাদরা শিরশ্ছেদ করে, তার অপরাধ হল, রাজধানী রিয়াদে একটি কনসার্টে নারী-পুরুষ শ্রোতা দর্শকদের কাছে নর্তকীরা তখন উদ্দাম নাচ করছিল, ক্ষুব্ধ ইমাদ-আল-মানসৌরী মূল্যবোধের এই অবক্ষয় সহ্য করতে পারেননি। তিনি হাতে ছুরি নিয়ে ওই নর্তকীদের দিকে ধেয়ে যান। কিং আবদুল্লাহ পার্কের বিনোদনের ওই ঘটনায় ৩ জন নর্তকী অল্পবিস্তর আহত হন। এই ঘটনাকে সউদি-রাজকীয় পরিবার নিজেদের আধিপত্যর জন্য চ্যালেঞ্জ বলে মনে করে। এছাড়া পাশ্চাত্যের বন্ধুদের কাছে ‘মুখ পুড়ল’ বলেও তারা ধারণা করেন।
ইমাদ-আল-মানসৌরীর বিরুদ্ধে ছোট-বড় নানা ধরনের অভিযোগ চাপিয়ে দেওয়া হয়। একইসঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়, মানসৌরী নাকি জঙ্গি সংগঠন আল-কায়দার সদস্য। কোনো কোনো খবরে মানসৌরীকে আইএস বলেও অভিহিত করা হয়েছে। অবশ্য আল কায়দা কিংবা আইএস এই ঘটনার কোনো দায় স্বীকার করেনি। সৌদি রাজা-যুবরাজরা এই ঘটনাটিতে এতো ক্রুব্ধ হন যে তারা ওই বন্দি ইমাদ-আল-মানসৌরীর দ্রুত বিচারের জন্য একটি ‘স্পেশাল’ বা বিশেষ আদালত গঠন করেন।
সৌদি রাজ পরিবার গঠিত ওই আদালত এক রায়ে মানসৌরীকে বৃহস্পতিবার দোষী সাব্যস্ত করে এবং জল্লাদ দিয়ে তার মাথা কেটে ফেলার নির্দেশ দেয়। কারণ সে ওই নৃত্যানুষ্ঠানে নর্তকীদের শারীরিকভাবে আক্রমণ করে এবং সৌদি নারী পুরুষদের আনন্দ উপভোগে বাধার সৃষ্টি করে।
সাধারণত আগে বলা হত, সৌদি আরবে শারিয়া আইন অনুযায়ী বিচার হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে শারিয়া আইন প্রয়োগ হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে না। কারণ কাউকে হত্যা না করা হলে আসামিকে সাধারণত জেল জরিমানা করা হয়। প্রাণনাশ করা হয় না।
সৌদি আরব অবশ্য মানসৌরীর বিরুদ্ধে আরও একটি গুরুতর অভিযোগ তুলেছে। বলেছে, ইমাদ-আল-মানসৌরী নাকি ইয়েমেনের অধিবাসী। আরবে আগে ইয়েমেন, লিবিয়া, ফিলিস্তিন, জর্ডন, মিশর, সুদান প্রভৃতি এলাকার নাগরিকদের পশ্চিমাদের মতো ‘বিদেশি’ বলে গণ্য করা হত না।
রাজকীয় আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী শুক্রবার তলোয়ার নিয়ে জল্লাদরা প্রকাশ্য চৌরাস্তায় ইমাদ-আল-মানসৌরীর ধড় থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে দেয়। সৌদি যুবরাজের ঘনিষ্ঠ মহলের বক্তব্য, এই ধরনের শাস্তির ফলে অন্যরা নারী-পুরুষের একসঙ্গে নৃত্য, পপ কালচার, কনসার্ট, নাইটক্লাব এগুলোর বিরোধিতা করার সাহস পাবে না।
উল্লেখ্য, মুহাম্মদ-বিন-সালমান সউদি আরবে পশ্চিমা বিনোদনের প্রসারের জন্য একটি নতুন সংস্থাও গঠন করেছেন। নাম দেওয়া হয়েছে, ‘এনটারটেইনমেন্ট অথোরিটি’। যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমান সৌদি আরবে আধুনিকতা নিয়ে আসতে ‘ভিশন-২০৩০’ নামে লাখ লাখ ডলারের একটি বড় পরিকল্পনার কথাও ঘোষণা করেছেন। সউদি যুবরাজ ‘রেড সি’-র বিস্তীর্ণ উপকূলে রিসোর্ট, হোটেল এবং পশ্চিমা বিনোদনমূলক শহরসমূহ তৈরি করার জন্য এক বিরাট প্রকল্প বাস্তবায়িত করা শুরু করেছেন।
তিনি ঘোষণা করেছেন, এবার থেকে তারা বিবাহিত কি না, সেই প্রশ্নও তোলা যাবে না। পুবের কলম।



