রাত হলেই পাল্টে যায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পের চেহারা
কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পাগুলোতে সাত লাখেরও বেশি শরনার্থী আশ্রয় নিয়েছে। দিনের বেলায় এসব রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সবকিছু ঠিকঠাক চললেও রাত হলেই পাল্টে যায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পের চেহারা। কিছু রোহিঙ্গা দুর্বৃত্ত ক্যাম্পে বসেই মাদকসহ চোরাচালান ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে দিন দিন নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ছে ক্যাম্পগুলো।
এদিকে ক্যাম্পের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের পক্ষ থেকে ১৬টি প্রস্তাবনা বাস্তবায়নের জন্য লিখিতভাবে সংশ্লিষ্টদের জানানো হয়েছে। তা নাহলে রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে বিভিন্ন সন্ত্রাসী জঙ্গিগোষ্ঠী মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রশাসনের এক সূত্র জানিয়েছে, রোহিঙ্গাদের একটি অংশ সন্ত্রাসী-গোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে। যার কারণে ক্যাম্পের ভেতরে খুন, অপহরণসহ অন্যান্য অপরাধ সংঘঠিত হচ্ছে। দেশি অস্ত্রের পাশাপাশি ভারী আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের খবরও পাওয়া যাচ্ছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সন্ত্রাসী কার্যকলাপ নজরে এসেছে পুলিশের। ইতোমধ্যে এসব সন্ত্রাসী কার্যকলাপ রোধে শরাণার্থী ত্রাণ ও পুনর্বাসন কমিশনার বরাবর ১৬টি প্রস্তাবনা বাস্তবায়নের জন্য লিখিতভাবে একটি সুপারিশ পুলিশের পক্ষে পাঠানো হয়েছে।
প্রস্তাবনায় যেসব বিষয়ে বলা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো- ক্যাম্পের ভেতরে অবৈধভাবে যত্রতত্র বাজার বসানো বন্ধ করে বাজার পরিচালনায় বৈধ নীতিমালা তৈরি, ক্যাম্পের ভেতরে স্বর্ণের দোকান বসানো এবং স্বর্ণ বন্ধকের ব্যবসা বন্ধ, ক্যাম্পে লাইট পোস্ট এবং সিসি ক্যামেরা স্থাপন, ক্যাম্পের মাঝি নির্বাচনের ক্ষেত্রে সুন্দর নীতিমালা প্রণয়ন, রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করা অবৈধ মোবাইল সিম বন্ধ করে বৈধভাবে সিম ব্যবহারের ব্যবস্থা, রোহিঙ্গাদের ত্রাণ উত্তোলনের ক্ষেত্রে সদস্যদের স্বশরীরে উপস্থিতি নিশ্চিত করা, রোহিঙ্গাদের দাবি প্রদানের জন্য বৈধ সংগঠনের নীতিমালা প্রণয়ন, ক্যাম্পে কাঁটাতারের বেড়া তৈরি, ক্যাম্পে মাদ্রাসা তৈরির ক্ষেত্রে বৈধ বা অনুমতির ব্যবস্থা গ্রহণ, রাতে ক্যাম্পে শরাণার্থী ত্রাণ ও পুনর্বাসন কমিশনের প্রতিনিধির উপস্থিত নিশ্চিত করা, এছাড়াও ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে পুলিশের জন্য বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে।
এই প্রসঙ্গে সম্প্রতি ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে দ্রুত ফিরিয়ে না নিলে তারা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী-গোষ্ঠীর শিকার হতে পারে। যে সন্ত্রাস শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বের জন্য হুমকি হয়ে পড়বে।
পুলিশের মাসিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২১ মাসে খুন, অপহরণ, চাঁদাবাজি, চোরাচালান, ধর্ষণ, ডাকাতি, মানবপাচারসহ নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে তারা। গত ২১ মাসে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যেসব অপরাধ সংঘঠিত হয়েছে, তার মধ্যে ৩২৮টি ঘটনায় মামলা হয়েছে। এসব মামলায় আসামির সংখ্যা ৭১১ জন। এরমধ্যে খুনের ঘটনা রয়েছে ৩১টি, অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে ১৯টি ও মাদক উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে ১১৮টি।
তবে রাতে রোহিঙ্গা ক্যাম্প অনিয়ন্ত্রিত বা অরক্ষিত বলতে রাজি নন কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন। তিনি জানান, ইতোমধ্যে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ২৪ ঘণ্টা পুলিশের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে। যৌথ বাহিনী টহল দেওয়া হচ্ছে। স্থাপন করা হয়েছে পুলিশ ক্যাম্পও। ফলে আগের তুলনায় পরিস্থিতি অনেক নিয়ন্ত্রণে।এছাড়া ক্যাম্প থেকে যেসব অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে সেসব দেশীয় অস্ত্র, আধুনিক বা ভারী অস্ত্র এখনও পাওয়া যায়নি। তবে দিনের চেয়ে রাতের অভিযান চালানো একটু কঠিন বলেও জানান তিনি।
ক্যাম্পের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, বিদ্যুতায়ন, সিসি ক্যামেরা এবং কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার ব্যবস্থা হয়ে গেলে পরিস্থিতি আরও স্বাভাবিক হবে বলে মনে করেন পুলিশ সুপার। সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন




