বিবিধশিরোনাম

ফিরিয়ে নেয়ার দাবিতে রোহিঙ্গাদের বিক্ষোভ

গোলাম আজম খান
রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে আজ ২৫ আগস্ট শনিবার রোহিঙ্গারা বিক্ষোভ ও কালো দিবস হিসাবে পালন করেছে।
কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের বিভিন্ন ক্যাম্পে রোহিঙ্গারা একত্রিত হয়ে বিক্ষোভ প্রর্দশন করেছে। এই সময় তারা নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের দাবি সংবলিত বিভিন্ন ব্যানার ফেস্টুন প্রদর্শন করেন।
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে রোহিঙ্গারা এদেশে অনুপ্রবেশ করে। উখিয়া-টেকনাফ ও নাইক্যংছড়ি বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করতে থাকে লাখ লাখ রোহিঙ্গা। বিগত এক বছরে বাংলাদেশে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছে ৭ লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গা। এছাড়া আগে থেকে অবস্থান করা রোহিঙ্গাসহ বর্তমানে উখিয়া-টেকনাফে ৩০ ক্যাম্পে প্রায় ১১ লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গা বসবাস করছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগী রাখাইন মগদের হত্যা, ধর্ষণ, জ্বালাও-পোড়া এর কারণে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে।
রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের এক বছরপুর্তির দিনে আজ শনিবার সকাল থেকেই ক্যাম্পে ক্যাম্পে রোহিঙ্গারা বিক্ষোভ প্রদর্শন শুরু করে। দিনটিকে তারা কালো দিবস হিসাবে ঘোষণা দেয়। এতে তারা বিভিন্ন ক্যাম্পে এক সঙ্গে বিক্ষোভ প্রদর্শণ করে রোহিঙ্গারা।
পরে তারা ক্যাম্প থেকে কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কে নামা চেষ্টা করলে পুলিশ বাধা দেয়। পুলিশের বাধা পেয়ে তারা ক্যাম্পের ভেতরেই বিক্ষোভ প্রদর্শনসহ সভা সমাবেশ করে। রোহিঙ্গা বিভিন্ন ব্যানার ফেস্টুন প্রদর্শন করেন।
এই সময় তারা জানান, নিরাপদ পরিবেশ, নাগরিকত্ব ও একটি রাষ্ট্রের যাবতীয় সুযোগ-সুবিধাসহ নিজ দেশে ফিরে যেতে চায়। তারা রাখাইনে নিজ ভিটেমাঠিতে ফিরে যেতে চায় অবশ্যই মিয়ানমারের নাগরিকত্ব নিয়ে রোহিঙ্গা পরিচয়ে। এবং নিরাপদ পরিবেশে বসবাস করতে চায় রাখাইনে নিজ গ্রামে। তারা এমন নিজ দেশে ভাবে ফিরে যেতে চায় যাতে আবারো শরণার্থী হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে না হয়।
বিক্ষোভে রোহিঙ্গা নেতারা বলেন,‘মিয়ানমারের রাখাইনে সেনাবাহিনী ও উগ্রপন্থী মগররা আমাদের ওপর নির্বিচারে হত্যা, ধর্ষণ ও বর্বর নির্যাতন চালিয়েছে। বাধ্য হয়ে আমাদের প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে হয়েছে। কিন্তু, এক বছর পার হয়ে গেলেও আন্তর্জাতিক মহল এখনও পর্যন্ত কোনও ধরনের সুরাহা করতে পারেনি।
আমরা আমাদের মাতৃভূমি মিয়ানমারে ফেরত যেতে চাই। এজন্য আমাদের নিরাপদ পরিবেশ, নাগরিকত্ব ও একটি রাষ্ট্রের যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে।
উখিয়ায় বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় একটি অংশের রোহিঙ্গা নেতা মোহাম্মদ ইদ্রিস বলেন,‘রোহিঙ্গা নির্যাতনের এক বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু, আমাদের ভাগ্যের কোনও উন্নয়ন হয়নি। এজন্য আন্তর্জাতিক মহলকে নাড়া দিতে আজকের এই বিক্ষোভ সমাবেশ।’
উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নেতা মোহাম্মদ আবু তাহের বলেন,‘সকাল থেকে আমরা আমাদের ব্লকে শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ করছি। এতে করে অন্তত আমাদের মনে একটু হলেও শান্তি আসবে। আমরা আমাদের অধিকার ফিরে পেতে চাই। আমরা দেশে ফিরে যেতে চাই।’
উখিয়ার বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের লালু মাঝি বলেন,‘আমাদের এই বিক্ষোভ মিয়ানমারের বিরুদ্ধে। আমরা আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য এই বিক্ষোভ সমাবেশ করছি। আজ এক বছর পার হলেও আমরা সুষ্ঠু বিচার নিয়ে সন্দিহান। আমরা বিচার চাই, মিয়ানমারের শাস্তি চাই।’
উখিয়ার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবুল খায়ের এর সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন,‘আজ সকালে হঠাৎ করেই রোহিঙ্গারা ক্যাম্প থেকে রাস্তার নামার চেষ্টা করে। আমরা বাধা দিলে তারা ক্যাম্পের ভেতরেই শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোপ সমাবেশ করার অনুরোধ জানায়। পরে উখিয়া ও বালুখালীর বিভিন্ন ক্যাম্পে রোহিঙ্গারা তাদের কর্মসূচি পালন করে। রোহিঙ্গারা প্রতিবাদ সরূপ প্রায় দুই ঘণ্টা তাদের বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন। এতে কোনও ধরণের অপ্রীতিকার ঘটনা ঘটেনি।’
১৯৮০ সালে আইন করে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার পর মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ওপর দমন নিপীড়ন শুরু করে । এর পর নানা অজুহাতে রোহিঙ্গাদের ওপর নেমে আসে বর্বর নির্যাতন। গত ১৯৭৮ ও ১৯৯২ সাল থেকে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসা শুরু করে। মিয়নমার সেনাবহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবর এবং ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট ভয়াবহ নির্যাতন শুরু করে।
উল্লেখ্য, কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনারের নিবন্ধিত ২টিসহ মোট ৩০টি ক্যাম্পে ১১ লাখ ১৬ হাজার ৪১৭জন রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। জাতিসংঘসহ আন্তজার্তিক সম্প্রদায়ের চাপ এবং বাংলাদেশের কুটনৈতিক প্রচেষ্টার ফলে গত বছরের ২৩ নভেম্বর বাংলাদেশের সাথে মিয়ানমারের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে সম্মত হয়ে একটি চুক্তি করে। কিন্তু জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তজার্তিক সংস্থা এবং বিভিন্ন প্রভাবশালী দেশ রাখাইনে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ পরিবেশ,স্বাধীন ভাবে চলা ফেরা করা, নিজ ভিটেমাটি ফিরিয়ে দেয়াসহ স্বেচ্চায় প্রত্যাবর্তনের উপর গুরুত্ব আরোপ করেন। নয়া দিগন্ত।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button