জাপানীরা কেমন : পর্ব – ২৭
কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জাপানে পাঁচ বার এসেছিলেন। একথা পূর্বের অধ্যায়ে উল্লেখ করেছি।
কথা আছে যে কোন দেশ ভ্রমনের পূর্বে সে দেশের সমাজ ব্যবস্থা ও সংস্কৃতির উপর পড়াশুনা করে ধারণা নিয়ে গেলে সে ভ্রমনের উদ্দেশ্য শতভাগ সিদ্ধ হয়। প্রচলিত কথা আছে যে পুঁথিগত শিক্ষাতে পঞ্চাশ ভাগ আর ভ্রমণ করে বাকী পঞ্চাশ ভাগ পূর্ণ করতে হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে আমরা অনেকেই একজন মহান কবি হিসাবে মনে করি। কিন্তু তাঁর দার্শনিক জীবন-দর্শন যে কতোটুকু উর্ধে ছিল তা আমরা অনেকেই জানি না। না জানার কারণও অনেক আছে। সেগুলির মধ্যে একটি হল আমরা তাঁর সৃষ্টি সম্পর্কে সঠিক ভাবে জানতে বা বুঝতে পারিনি। উচ্চমানের একজন ভাল পাঠক, যিনি তার সবগুলি লেখা পড়েছেন, তিনি হয়তো এই মহান কবির অন্তর-দর্শন করতে পেরেছেন। জাপানীদের মত মন-মানষিকতা বাংলালিদের মাঝে নেই। যদি থাকত তাইলে আমরা তাঁকে আরো আগেই সঠিক ভাবে মূল্যায়ন করতে পারতাম। রবীন্দ্রনাথ জাপানের উপর ভাল ধারণা নিয়েই এসেছিলেন। তাই অল্প সময়ে তিনি জাপানীদের প্রগতি, শীল্প, আর্ট ও তাদের জীবন যাত্রার উপর সঠিক ধারণা দিয়ে লিখতে পেরেছেন। তাঁর সময়ে বৃহৎ ভারত যে একটি দ্বীপের দেশ বৃটেনের উপনিবেশ ছিল এবং ভারতের জনগণ স্বাধীন নয়, পরাধীন ছিল – সে ব্যথাও কবিকে সর্বক্ষণ পীড়িত করেছে। তাই এশিয়ার একমাত্র স্বাধীন দেশ জাপানে পা রেখে তিনি বিস্মিত হয়েছিলেন এবং জাপান ও জাপানীদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন। তৃষ্ণার্থ প্রাণী যে ভাবে পানি পান করে তিনিও তেমনি একাগ্রচিত্তে জাপানের সংস্কৃতি এবং প্রগতি দেখে তাঁর সবকিছু হৃদয়ঙ্গম করতে পেরেছিলেন। কবি নজরুল ইসলাম যে কতোটুকু মহৎ কবি ছিলেন সে প্রমাণ তাঁর কবিতায় পাওয়া যায়। দুঃখের বিষয় যে আমাদের অনেকে নজরুল ইসলামকেও এখনো সঠিক ভাবে মূল্যায়ন করতে পারিনি। একটি কথা এখানে না বলে পারছিনা। তা হল, যে জাতী ধর্মের লেবাস পরে বড় কোন রাজনৈতিক বা সামাজিক সমস্যার সমাধান করতে গিয়েছে তারা ব্যর্থ হয়েছে।

আজকের বিশ্ব সবার হাতের নাগালে। একটি আই ফোনের ভিতরে রয়েছে আমাদের পৃথিবী। অনেক দেশে যুগযুগ যাবত রাজনৈতিক সমস্যা ও জাতীগত বৈষম্য প্রকট আকার ধারণ করেছে। এসব সমস্যা সমাধানে ধর্মকে টেবিলের উপর রেখে যতই আলোচনা চলুক – কোন ফল পাওয়া যাবে না। এই সমস্যা নিয়ে কতিপয় দেশে যুগযুগ যাবত আলোচনা চলছে। কিন্তু সমাধান সম্ভব হয়নি। সে সমস্যা বরং আরো প্রকট ভাবে বিকট আকার ধারণ করছে। এই জমানায় আমরা যদি উদারনৈতিক মনোভাবাপন্ন হতে না পারি – তাহলে কোন আলোচনায় সফলতা আসবে না। মোগল সম্রাটগণ কয়েক শত বৎসর ভারতের শাসনকর্তা ছিলেন। বলাই বাহুল্য যে তাঁদের দীর্ঘ শাসন কালে তাঁরা ধর্মকে সামনে রেখে দেশ পরিচালনা করেন নি।
জাপানীরা প্রাচীন কাল থেকে একই বর্ণের এবং একই ভাষাতে কথা বলে। তারা ধর্মের স্লোগান দিয়ে দেশ পরিচালনা করে নি। প্রয়োজনে তারা নিজের ধর্মের উপর বিশ্বাস রেখে অন্য ধর্মকেও বরণ করে নিয়েছে। বৌদ্ধ ধর্মের ঔধার্য দেখে সে ধর্মেও দীক্ষা নিতে কার্পণ্য করে নি। এই কাজটি করে তারা প্রগতির পথ আরো সুগম করেছে। যারা ভিন্ন জাতীর সংস্কৃতির সাথে সহজে নিজেদের মানিয়ে নিতে পেরেছে তারাই বেশি লাভবান হয়েছে। জাপান তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়,” যে মুহূর্তে জাপানের মস্তিষ্কের মধ্যে এই চিন্তা স্থান পেল যে আত্মরক্ষার জন্যে ইউরুপের কাছ থেকে তাকে দীক্ষা গ্রহণ করতে হবে সেই মুহূর্তে জাপানের সমস্ত কলেবরের মধ্যে আকুল চেষ্টা জাগ্রত হয়ে উঠল। ইউরুপের সভ্যতা একান্তভাবে জঙ্গম মনের সভ্যতা, তা স্থাবর মনের সভ্যতা নয়। এই সভ্যতা ক্রমাগতই নুতন চিন্তা,নুতন চেষ্টা, নুতন পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে তরঙ্গের চূড়ায় চূড়ায় পক্ষবিস্তার করে উড়ে চলেছে। এশিয়ার মধ্যে একমাত্র জাপানের মনে সে স্বাভাবিক চলনধর্ম থাকাতেই জাপান সহজেই ইউরুপের ক্ষিপ্রতালে চলতে পেরেছে এবং তাতে করে তাকে প্রলয়ের আঘাত সইতে হয় নি। কারণ, উপকরণ সে যা কিছু পাচ্ছে তার দ্বারা সে সৃষ্টি করেছে; সুতরাং নিজের বর্ধিষ্ণু জীবনের সঙ্গে এ-সমস্তকে সে মিলিয়ে নিতে পারছে। সেই সমস্ত নতুন জিনিষ যা তার মধ্যে কোথাও কোন বাধা পাচ্ছেনা, তা ঠিক নয়, কিন্তু সচলতার বেগেই সেই বাধা ক্ষয় হয়ে গিয়েছে। প্রথম প্রথম যা অসঙ্গত অদ্ভূত হয়ে দেখা দিচ্ছে ক্রমে ক্রমে তার পরিবর্তন ঘটে সুসংগতি জেগে উঠছে। একদিন যে-অনাবশ্যককে গ্রহণ করেছে আর-একদিন সেটাকে ত্যাগ করেছে; একদিন যে আপন জিনিষকে পরের হাটে গিয়ে খুইয়েছে আরেকদিন সেটাকে আবার ফিরে নিচ্ছে। এই তার সংশোধনের প্রক্রিয়া – এখনো নিত্য তার মধ্যে চলছে!”

প্রায় শত বৎসর পূর্বে জাপান দেখে রবীন্দ্রনাথ তাঁর অন্তর্দৃষ্টিতে যতটুকু দেখেছেন তা বর্তমান জমানাতেও অনেকে বুঝতে চাইছে না। আমরা এখনো জাপানের কাছ থেকে কিছুই শিখতে পারি নি! জাপানে অবস্থান করছেন কিছু জ্যেষ্ঠ প্রবাসী দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জাপানে উচ্চশিক্ষার্থে এসে এবং কর্মরত এমন যারা ছিলেন তাঁরা তখন নব্য স্বাধীন বাংলাদেশ যদি জাপানের প্রগতির মূল থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে নিত তাইলে দেশ দ্রুত উন্নত হত ভাবতেন। আশির দশকের প্রথম দিকে এক ইঞ্জিনীয়ার প্রবাসী এক ঘরোয়া সমাবেশে বার বার বলেছিলেন যে জাপানের টাউন অফিস ও গ্রাম্য ইউনিয়ন অফিস থেকে সব ইনফরমেশন পাওয়া যাবে। তাঁর সে কথা সঠিক ছিল। আজ থেকে ৭৭ বৎসর পূর্বে ইউনিয়ন কাউন্সিল অফিস থেকে “কাইরানবান” নামে একটি ছোট সংবাদপত্র বের হয়। এই সংবাদপত্রটি চার পাঁচ পাতার বা আরো বেশি পাতার হয়। একটি ইউনিয়নে বা টাউন কাউন্সিলে যতটি ওয়ার্ড আছে ততটি কপি বের হতো। অর্থাৎ আটটি ওয়ার্ড থাকলে মাত্র আটটি কপি ঘরে ঘরে এক ইউনিক পন্থায় পাঠানো হয়। ১৯৮০ সালে জাপানে এসে প্রথমে তা আমার চোখে পড়ে এবং তা নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে তথ্য সংগ্রহ করেছি। বৃষ্টির পানিতে যাতে ভিজে না যায় সেজন্যে কাইরানবানটি প্লাস্টিকের মলাটে রেখে সবার ঘরে পাঠানো হয়।
একটি ওয়ার্ডে যদি ১০০টি পরিবার থাকে সেক্ষেত্রে সিরিয়াল নাম্বারে প্রথম ঘরে পাঠানো হয়। প্রথম ঘরের কর্তা সেটি পড়ে দ্বিতীয় ঘরে নিজে গিয়ে দিয়ে আসেন। এমন পন্থায় তৃতীয় ঘর থেকে চতুর্থ ঘরে – কয়েকদিনের মধ্যে একশত ঘরে পাঠানো হয়। তারপর সেটি এলাকার মেম্বার কাউন্সিল অফিসে আবার পাঠিয়ে দেন। এই কাইরানবানে কাউন্সিলের মেয়র, চেয়ারম্যান ও মেম্বারগণ প্রগতিমূলক কি কি কাজ হাতে নিয়েছে তা উল্লেখ থাকে। তাতে ট্যাক্স, রাস্তা-ঘাট নির্মান বা রিপেয়ার এবং সমাজের বিশেষ খবরাদি থাকে। বালাই বাহুল্য যে এই কাইরানবান হল প্রগতির একটি প্রতিজ্ঞা পত্র। উন্নয়নের প্রতিজ্ঞা পত্র। নির্বাচনে জীতে যারা কাউন্সিল অফিসে আসলেন তারা কি কি কাজ হাতে নিলেন বা সম্পাদন করলেন সে খবর এতে থাকে। এলাকার বাসিন্দারা এই কাইরানবান থেকে প্রগতির কথা জানতে পারে। আধুনিক জমানায় অনেক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। জাপানের প্রতিটি ঘরে পত্রিকা যায়। কিন্তু পাশাপাশি কাইরানবান ও চলে আসছে এবং আগামি শত বৎসর যাবত যে চলবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। এই কাইরানবানে পরিকল্পনার যে প্রতিজ্ঞা থাকে তা করতে না পারলে সামনের নির্বাচনে প্রার্থিরা জীততে পারবে না। কাইরানবান থেকে এলাকার উন্নয়নের কী সুন্দর সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা রয়েছে তা ভেবে দেখার বিষয়!

বিংশ শতাব্দিতে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সমসাময়িক কালে জাপানের একজন বিখ্যাত কবি নাম তাঁর মিয়াজাওয়া কেনজি। তাঁর জন্ম ২৭ আগষ্ট, ১৮৯৬ এবং মৃত্যু ২১ সেপ্টেম্বর, ১৯৩৩ সাল। মিয়াজাওয়া কেঞ্জির নাম জানেনা এমন লোক জাপানে নেই। জাপানের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি ছাত্রও তা জানে। কবি মিয়াজাওয়া কেন্জি প্রথম জীবনে শিশুদের জন্য কবিতা, ছোট বড় গল্প ও উপন্যাস লিখেছেন। জীবনের শেষ ভাগে ‘তানকা’ কবিতার সম্পাদনা করেছেন। তাঁর একটি কবিতা “আমে নি মো মাকেজু; কাজে নি মো মাকেজু”( বৃষ্টিতেও অপরাজিত; তুফানেও অপরাজিত) কবিতাটি জাপানের রানীতিবিদ, বৈজ্ঞানিক, কৃষক ও শিশুদের মুখে মুখে শুনা যায়। এই কবিতাটি জাপানীদের অন্তরে প্রতিজ্ঞার বাণী হয়ে জাগ্রত রয়েছে। নিম্নে তাঁর কবিতাটিড় বাংলা অনুবাদ করেছি।
বৃষ্টিতেও অপরাজিত
তুফানেও অপরাজিত
তুষার কিংবা গ্রীষ্মতাপে অদমিত
বলিষ্ঠ দেহ
লিপ্সা থেকে মুক্ত
ক্রোধ থেকেও মুক্ত
সর্বদা শান্ত
এক মুষ্টি ভাতে, মিসোসুপে সামান্য শব্জিতে সন্তুষ্ট
যাহাই হোক বা ঘটুক
অন্যদের প্রথমে, নিজে সবার পরে
অভিজ্ঞতা ও নিরীক্ষণে উপলদ্ধি
কক্ষণো তা থেকে সরাবেনা দৃষ্টি
পাইন বনের ছায়াতে মাঠে
শান্ত থাকো খড়ের ঘরে
পূর্বে যদি কোন পীড়িত শিশু থাকে
তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করো
পশ্চিমে যদি কোন ক্লান্ত মা থাকে
তার বোঝা লাঘব করো
দঃক্ষিণে যদি মৃতপ্রায় পুরুষ থাকে
তাকে শান্তনা দিয়ে বল, ‘ভয়ের কিছু নেই’
উত্তরে যদি কলহ-বিবাদ বাধে
তাদের বুঝাও, ‘এটা কোন ব্যাপার নয়’
খড়াতে নয়ন জলে দাও চালা
শীতল গ্রীষ্মে হাঁটো ধীরে ধীরে
এতে যদি লোকেরা বোকা বলে
জবাব দিবে-
সে রকম মানুষই হতে চাই আমি
কবি মিয়াজাওয়া কেনজি মাত্র ৩৭ বৎসর বয়সে নিউমোনিয়াতে মৃত্যু বরণ করেন। এতো আল্প বয়সে সাহিত্যে যে বিশাল অবদান রেখেছেন তা বলতে গেলে এক বিস্ময়কর ব্যাপার। তাঁর জীবদ্দশায় তাঁর সৃষ্ট অসাধারণ সাহিত্যকর্মের উপর জাপানে অনেকেই জানত না। মিয়াজাওয়ার সাহিত্যকর্ম উদ্ভাসিত হয়েছে তাঁর মৃত্যুর অনেক পরে – ১৯৯০ দশকের মধ্যবর্তিকালীন সময়ে। ১৯৮২ সালে সাহিত্যে বিশেষ অবদান রাখার জন্য তাঁর নামে একটি মিউজিয়াম স্থাপন করা হয়েছে। শিশুদের জন্য ছোট বড় যত গল্প ও উপন্যাস লিখেছেন সেগুলির অধিকাংশ animeহয়েছে। সেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘Night on the Galactic Railroad’। তিনি তানকা কবিতাও লিখেছেন এবং সম্পাদনাও করেছেন। তাঁর অনেক তানকা ও পদ্য বিশ্বের অনেক ভাষাতে অনুবাদ করা হয়েছে। তিনি আন্তর্জাতিক ভাষা Esperanto জানতেন। তিনি নিজেও এই ভাষাতে তাঁর অনেক সাহিত্যকর্ম অনুবাদ করেছেন।
(চলবে)



