ছুটন্ত উল্কার মতো ছয় মাস পর আজ সামনে এসে দাঁড়ালেন ৭৫ বৎসর বয়সী মিসেস নজিতা। পরনে ক্লাউনের মতো দেখতে তার হস্তনির্মিত জামা ও মাথায় ক্যাপ। বিগত ছয় মাস তাঁর সাথে দেখা হয়নি। তবে অর্ধ বৎসর পর তাকে দেখে মনে হল চলনে-বলনে তার দ্রুতি আরো বেড়েছে। এতদিন সে স্বেচ্ছায় দূরে সরে ছিল তার এক সময়ের বন্ধু মিসেস তোদার সাথে তার মতের অমিল ও ঝগড়ার কারণে। যখন ঝগড়া হয় মিস মিদরি তার সাথেই ছিল। কিন্তু মিদরি সঙ্গে থাকলেও ঝগড়াতে অংশ নেয় নি, চুপচাপ বসে ছিল। এ সব মেয়েলি ঝগড়াতে আমার আগ্রহ নেই। কিন্তু বাধ্য হয়ে তাদের ঝগড়ার কারণ সমূহ শুনতে হয়েছে। সে ব্যাপারে পরে বিস্তারিত বলব। কিছুদিন পূর্বে কাওয়াগুয়ে নগরীর সিটিজেন গ্রুপ বাংলাদেশের জন্ম ইতিহাস ও বর্তমানের পরিস্থিতির উপর বক্তব্য রাখতে আমাকে আহবান করেছিল। দিনটি ছিল ৯ জুলাই, ২০১৬, সময় সকাল সাড়ে ন’টা! জাপানের বর্ষাকাল। কিন্তু আজ সূর্যোজ্জ্বল একটি দিন।নজিতা সে অনুষ্ঠানে যোগদান করেছিল। জুলাই মাস থেকে জাপানে বিশ্রী রকম গরম পড়তে থাক। কিন্তু আজকের দিনটি ব্যতিক্রম। কারণ, আজ বায়ু প্রবাহের বেগ উল্লেখযোগ্য – তাই তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায় নি।
নজিতা বললেন, “আমি এই সিটিজেন গ্রুপের মেম্বার আর আপনি হলেন আজকের বক্তা – তাই আগ্রহ নিয়ে আপনার কথা শুনতে এসেছি!”
তার সাথে অনেকদিন পর দেখা। সঙ্গে আমার স্ত্রী ও গিয়েছিল। মিসেস তোদার সাথে নজিতার ঝগড়ার ব্যাপারে সে জড়িত হতে চায়নি কিন্তু বড় বিরক্ত বোধ করেছে। বলেছে, ‘নজিতা এবং তোদা দু’জনেই ঝগড়াটে, একজন আরেক জনকে সয্য করতে পারেনা। আড্ডা দিতে এসে অন্যের ঘরে বসে ঝগড়া করাটা পছন্দ করি না!’ তাই সে এতোদিন দু’জনের উপর ক্ষুব্দ ও অসন্তুষ্ট ছিল। বিগত ছ’মাসে নজিতা তাকে কয়েকবার ফোন করেছিল কিন্তু সে ইচ্ছা করেই রিসিভ করেনি। আজ নজিতার বিনম্র ভাব দেখে কথা বলতে শুরু করল। মনে হল আগের রাগটুকু কমে গিয়েছে। নজিতা বললেন, ‘ চলুন আজকের লাঞ্চ রেষ্টুরেন্টে আমরা একসাথে খাব!’
তার প্রস্তাবে সে রাজী হল। অনুষ্ঠান শেষে আমরা তিনজন ‘GUSTO’ নামে একটি চেইন ফ্যামিলি রেষ্টুরেন্টে গেলাম। এই রেষ্টুরেন্টটির শত শত ব্রাঞ্চ রয়েছে। ছুটির দিন ছাড়া অন্যান্য দিনে খাবার তুলনমুলক ভাবে অন্যান্য রেস্টুরেন্ট থেকে সস্তা। ফ্রীতে সুপ যতবার ইচ্ছা ততবার খাওয়া যায়। কিন্তু আজ শনিবার ছুটির দিন। ফ্রী সুপ দিবে না। অর্ডার দিয়ে খেতে হবে। পয়সাও আলাদা দিতে হবে। তবে একটি অপশন আছে। তা হলো ‘ড্রিং বার।’ ড্রিং বার নাম হলেও সেখানে বীয়ার বা কোন ওয়াইন এসব কিছু রাখা হয় না। ড্রিং বারে থাকে ফান্টা, অরেঞ্জ জুস, কোক, কফি এবং চা। সেটার সামনে কাপ, গ্লাস ও চামচ রাখা আছে। কিন্তু নিজে গিয়ে এনে খেতে হয়। খাওয়া দাওয়া সেরে যখন বের হবো তখন দেখলাম নজিতা তার পয়সা আলাদা দিল। আমার স্ত্রী আমারটা সহ দু’জনের পয়সা দিল। বের হয়ে আসার সময় তাকে বললাম, ‘নজিতা প্রস্তাব রেখেছে রেস্টুরেন্টে খেতে। পয়সাতো তার দেওয়ার কথা। কিন্তু সে কোন জবাব দিল না। একটু পর বলল, “আমি জানি এ মহিলা আমাদেরকে একসাথে খেতে বললেও সে আমাদের পয়সা দিবে না। নজিতা যাদের সাথে চলে তারা সবাই খাবার শেষে আলাদা করে পয়সা দেয়।”

অনেকদিন পর তার সাথে দেখা হয়েছে বটে। খুব সম্ভবত মনের জড়তা হালকা করার জন্য নজিতা বড় এক প্যাকেট গিফ্ট দিলেন। তাতে বিভিন্ন ফল দিয়ে তৈরী মুল্যবান জেলি ও বিভিন্ন রকম জাপানী মিষ্টান্ন রয়েছে। কম করে হলেও এ সেটের দাম আড়াই হাজার টাকা বা আরো বেশি হবে!
রেষ্টুরেন্টে ঘন্টা খানেক কথা হলো। বেশির ভাগ কথাই চলছে বিতর্কিত মিসেস তোদাকে নিয়ে। আমি এখানে একজন শ্রোতা মাত্র। তোদার সাথে সম্পর্ক চ্ছেদ করার পর নজিতা আসা যাওয়া বন্ধ করেছিল। তার শর্ত ছিল মিসেস তোদা উপস্থিত থাকলে তিনি আসবেন না। তোদার জন্ম নাকি গ্রাম্য এক নিকৃষ্ট পরিবারে। তার চাল চলনে তা নাকি প্রকাশ পায়, ইত্যাদি। ‘নেকো’ রেষ্টুরেন্টে যারা আড্ডা দিত তাদের মধ্যে ৭৫ বৎসর বয়সের মিঃ আদাচি অন্যতম। হাল্কা স্লিমদেহি এ লোকটির সারা মাথায় টাক। যা কিছু চূল তার মাথায় আছে সেগুলিকে যত্নের সাথে সেভ করে রাখেন। অবিবাহিত এ লোকটি একাই টিলার উপরে একটি ছোট বাড়িতে থাকেন। কথা প্রসঙ্গে জানতে পারলাম যে তার সে ঘরে মিসেস তোদার ব্যাপক যাতায়াত আছে। নজিতাও মিদরিকে নিয়ে সে বাড়িতে গিয়েছেন। তাদের আড্ডাতে যে ক’জন পুরুষ রয়েছেন তাদের মধ্যে মিঃ আদাচির জনপ্রিয়তা বেশি। উল্লেখ্য যে মিস মিদরি ছাড়া সেখানের সকল মহিলার বয়স সত্তরের উর্ধে। কল্পনাও করিনি যে তাদের স্বামি থাকা সত্তেও তাদের মাঝে প্রেম নিয়ে প্রতিযোগিতা হয়। নজিতাকে তেমন সন্দেহ না হলেও মিঃ আদাচির সাথে মিসেস তোদার সম্পর্ক সবার চোখে পড়ে। মিসেস তোদার ‘টয়োটা মার্ক – এক্স’ গ্রেডের একটি কার আছে। সেটিকে স্বামি-স্ত্রী উভয়ে ব্যবহার করেন।
তোদার স্বামিটি দু’বার এসেছিলেন। ভদ্র নম্র ব্যক্তি, বয়স তার পঁচাত্তরের অধিক হবে। সারা জনম কোম্পানীর কাজ করে বন্ধুবিহীন এ ব্যক্তিটি তার স্ত্রীকে নিয়ে থাকেন। একবার জিজ্ঞাসা করেছিলাম তাঁর কোন হবি আছে কি না! তার বিশেষ কোন হবি নাই বলেছেন। তবে মিসেস তোদা বলেছেন যে তার স্বামিটি সারাদিন ঘরেই থাকেন এবং একাকি টিভি দেখেন এবং প্রতিদিন সকালে উঠে গাড়িটি পরিষ্কার করেন। আর মিসেস তোদা সে গাড়িটি ড্রাইভ করে গিয়ে রেষ্টুরেন্টে আড্ডা দেন।
আমাদের সাথে প্রথম পরিচয় হয়েছিল নজিতার সাথে। সেই সুবাদে মিসেস তোদাও এসেছেন। একাত্তর বৎসর বয়সি এ মহিলাটি দীর্ঘাঙ্গি এবং দেখতে এলিগেন্ট মনে হলেও তার সাথে এক মিনিট কথা বলে বুঝা যায় তার মুদ্রা-দুষগুলি। প্রথমত সে আস্তে কথা বলতে পারে ন,, হাসি দিলে ঘরের দেয়াল কেঁপে উঠে। এক কথায় মহিলা- সুলভ কন্ঠ তার নয়। কিন্তু দামি ব্রান্ডের কাপড় পরে শুষ্ক মুখাবয়বে তিনি রঙ মাখেন বড় যত্ন করে। তোদা যখন আসেন তখন মিঃ আদাচিকে সঙ্গে নিয়ে আসেন। আদাচি সদালাপি ব্যক্তি। কর্ম জীবনে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে জাপানের সরকারি প্রজেক্টে কাজ করেছেন। তাই তাঁর বিয়ে করার সময় ছিল না। একদিন কথায় কথায় তা আমাকে তিনি বলেছিলেন। তাই বলে তিনি নারী সংঘ পাননি এমন কথাও নয়। তামিলনারু, শ্রীলংকা, ইথিওপিয়া, কেনিয়া থাকাকালীন সময়ে বিভিন্ন নারীর সাথেই রাত কাটিয়েছেন। শুধু ইরাকে যখন তার এসাইনমেন্ট – সেখানে তিনি নারী সঙ্গ পাননি বলেছেন। তাই এখনো তিনি অবিবাহিত একজন ব্যাচেলর! তকিওগাওয়া শহরের বাড়িটিতে তোদার নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে। কেনো সেখানে তার এতো বেশি যাতায়াত তা সবাই বুঝে নিয়েছেন। তাই কারো ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে প্রকাশ্যে কেউ কিছু না বললেও সুযোগ পেলে একে অন্যের কানে ফিসফিস করেন। এ সব পরকীয়া প্রেম ঘটিত ব্যাপার বুঝে নিতে হয়।
এখন মিসেস তোদা আমাদের বাড়িতে আসেন না। তার সাথে অভাবনীয় এমন এক ব্যাপার হয়েছে যা আমাদের কল্পনাতেও ছিল না। সে কারণেই তিনি আসেন না। মিঃ আদাচি তার ঘরের পাশের জমিতে শাকসবজির চাষ করেন। তার একটি ৫০ সিসি এঞ্জিনের মোটর সাইকেল আছে। একদিন তিনি এক থলেতে করে শব্জি এনে আমার স্ত্রীর হাতে দিয়েছিলেন। এমন দেয়া নেয়া সমাজে স্বাভাবিক। সেদিন আদাচি বলেছিলেন, ‘আমি যে শব্জি দিলাম একথা মিসেস তোদাকে বলবেন না!’
সবজির থলে যখন ঘরে দিয়ে গিয়েছেন তখন আমি ঘরে ছিলাম না। বিকালে ঘরে ফিরার পর আমার স্ত্রী থলেটি দেখিয়ে বলল যে আদাচি অনেক সবজি দিয়ে গেছেন। এতোটুকুই আমি জানি।
মাঝে মাঝে রোববারে আমাদের ঘরে বন্ধুদের আড্ডা হয়। প্রায় ১০ জনের মতো নারী পুরুষ আসেন। নজিতা ও আসতেন। কিন্তু তোদার সাথে মনোমালিন্য হওয়ার পর এখন আসেন না। তারপর এ সুযোগ কাজে লাগিয়েছেন মিসেস তোদা। আড্ডার দিন সবার আগে তিনি আসেন এবং আমার স্ত্রীকে সাহায্য করেন। এভাবে কয়েক মাস অতিবাহিত হয়ে গেল। যে মাসে মিঃ আদাচি সবজি দিলেন সে মাসের আড্ডাতে তোদা আসবেন কি না ফোনে জানতে চাইলে তিনি অস্বাভাবিক এক উত্তর দিলেন।
বললেন, “আদাচি যে আপনাকে সবজি দিয়েছেন তা আমি জানি। আমাকে বললেন না কেন? তাই ভাবছি এ মাসের আড্ডায় আমি যাবো না।”
তার স্বভাব ও মনমানসিকতা সম্পর্কে ইতিমধ্যে ধারণা পেয়েছে আমার স্ত্রী। তাই প্রতি উত্তরের অপেক্ষা না করেই জবাব দিল, “তাহলে আপনার না আসলেও চলবে!”
সে কারণে মিসেস তোদা মাস তিনেক আসেন না।সেদিন মিঃ আদাচি তার মোটর সাইকেল চালিয়ে একলা আসেন। তার পূর্বে মিসেস তোদা তাকে তার গাড়িতে করে এনেছেন ও বাসায় দিয়ে এসেছেন। আজ প্রথম তিনি মোটর সাইকেলে আসলেন। তাকে জিজ্ঞসা করলাম, “আজ মিসেস তোদা আসলেন না কেনো?”
জবাব দিয়েছেন, “আমি জানি না!”
তখন বলতে চেয়েছিলাম যে সমস্যা তো আপনার দ্বারা সৃষ্ট – জানেন না কেন বলছেন?”
কিন্তু ইচ্ছা করেই সে প্রসঙ্গ এড়িয়ে গেলাম।
দ্বিতীয় বারের আড্ডায় আমি বললাম, ‘মিসেস তোদার কমনসেন্স বলতে কিছু আছে তা আপনি মনে করেন কি?’
মিঃ আদাচি সঙ্গে সঙ্গে কোন প্রতিউত্তর করলেন না। চোখ বুঝে রইলেন।
“আপনি সবজি দিয়েছেন আমাদের – তাতে তার এত মান অভিমান কিসের?”
আদাচি সংক্ষিপ্ত জবাব দিলেন এবার। বললেন, “ বাদ দেন তার প্রসংগ! তাকে এড়িয়ে চলাটাই উত্তম! সে আমার ঘরে যায়, প্রতিবেশিরা তার গাড়ি দেখেই বুঝে ফেলে।মাইন্ড করার অনেক কিছুই আছে। কিন্তু সে তা বুঝে না!”
তারপর কয়েকমাস অতিবাহিত হল। আমরা মিসেস তোদার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। আজ রেষ্টুরেন্টটে নজিতা তোদার প্রসঙ্গ তুললেন। বললেন, “কিছুদিন আদাচির সাথে তোদার সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন ছিল। এখন আবার তার যাতায়াত শুরু হয়েছে, নির্লজ্জ নয় কি?”
আবাক হয়ে আমার স্ত্রী বলল, “তাই নাকি? আমিতো এ ব্যাপারে কিছু জানি না।”
“হ্যাঁ, ব্যাপার সত্য। আমি তার সব খবর রাখি! কী আর বলবো – ‘লাভ লাভ সম্পর্ক’!”
বললাম, “ মিসেস নজিতা, দয়াকরে তোদার ব্যাপারে কিছু বলবেন না। তার ব্যাপারে কিছু বলার অর্থ হবে শুধু সময় নষ্ট করা।”
অনেক মহিলা আছেন নিজের দুষের কথা অথবা তার সামাজিক অবস্থানের কথা – তা যতোই না খারাপ হোক, সে ব্যাপারে ভেবে দেখে না। নজিতা যে দুই স্বামি নিয়ে বছরের পর বছর এক ঘরে থাকেন তা অন্যের চোখে কেমন লাগে তা ভেবে দেখেছেন কিনা জানি না। তবে তাকে যারা চিনেন এমন কিছু মহিলার মুখে এ ব্যাপারে কটুক্তি করতেও শুনেছি!
আজ আনেক কথা হল নজিতার সাথে। তার পুত্র কেইসুকে নাকি এক বৎসর চাকুরি করে কাজ ছেড়ে দিয়েছে। যখন চাকুরিতে ছিল সে তার মায়ের হাতে প্রতি মাসে পঞ্চাশ হাজার ইয়েন দিয়েছে। এখন আর দেয় না!
আরো বললেন, “ আমি এখন তাকে রোজ বকা দেই!”
বললাম, “বকা দিবেন না। সে সবই বুঝে। আবার নতুন চাকুরি খুঁজে নিবে।”
আমাদের জীবন থেকে সময় দ্রুত চলে যাচ্ছে। আজকের দিনটি যদি পেরিয়ে যায় তা যে জীবনে কখনো ফিরবে না তা সবাই জানে। আগামি ভোরের সূর্য দেখে আমরা ভুলে যাই বিগত দিনটির কথা। এ ভাবে দিনের পর দিন আমাদের জীবনও যে ফুরিয়ে যাচ্ছে তা কিন্তু আমরা অনেকেই ভেবে দেখি না। চোখ আছে বলে নতুন দিনের আগমনের কথা টের পাই। চোখে যখন অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই দেখা যাবে না তখন তো জীবনের কোন মানে আর থাকবে না। পৃথিবীর রূপ ও আর দেখা যাবে না। শুনেছি মৃত্যুর পূর্ব ক্ষণে চোখে নাকি কিছুই দেখা যয় না। অন্ধকার দেখা যায়। একথাটি সুস্থ অবস্থায় কেউ ভেবে দেখেন না। সত্তর বৎসর বয়সের বৃদ্ধ হরিগুচির একটি মাত্র ছেলে। বয়স চল্লিশ। কিন্তু ছেলেটি বখাটে। চাকুরি স্থলে নিয়মিত যায়না বলে চাকুরি চলে যায়। হরিগুচির একটি পুকুর আছে। মাঝে

মাঝে সে পুকুরে আমি ঘন্টা হিসাবে টিকেট কিনে ছিপ দিয়ে রুই মাছ ধরতে যেতাম। দেখতে দেখতে দশ বছর পেরিয়ে গেল। হরিগুচি এখন অসুস্থ। হরিগুচির ছেলেটি যদি তার কাছে যায় তখন তিনি অত্যন্ত রেগে যান। ছেলেকে একদিন বলেছেন, “যতদিন যাবত আমি চোখে আলো দেখবো – তুই আমার সামনে আসবি না। এ ঘরেও থাকবি না। যখন আমি চোখে আর আলো দেখবো না – শুধু অন্ধকার দেখবো – তখন তুই এসে এ ঘরে থাকিস!”
এ কথাটি তার এক পরশি মহিলা আমাকে বলেছেন। জানতে চাইলাম, ‘তাহলে ছেলেটি এখন কোথায় থাকে?”
মহিলা বললেন, “ঐ দিকে ধানের জমিগুলি আছে। সেখানে গাড়ির ভিতরেই ছেলেটি থাকে। ঘরে যাওয়া নিষেধ।”
ভাবলাম সন্তানের প্রতি কতোটুকু অসন্তুষ্ট থাকলে একজন পিতা এমন দুঃখজনক কথা বলতে পারে।
তখন মুহূর্তে মনে পড়ল যে সে ধান ক্ষেতের পাশের রাস্তা দিয়ে বিকালে যখন হাঁটতে যাই তখন একটি ছোট মাইক্রো গাড়ির ভিতরে একটি যুবক রাত্রি যাপন করে। অন্ধকারে সে এলাকাতে লোকজনের সমাগম হয় না। দেরী করে সন্ধ্যায় যখন হাঁটতে যাই তখন নির্জনে গাড়ির ভিতরে কাউকে ঘুমিয়ে থাকতে যখন দেখি তখন অবশ্য ভয় লাগে।
একথা মহিলাকে বলার পর তিনি বললেন, “হ্যাঁ, সেটাই হরিগুচির নিষ্কর্মা ছেলে।” (চলবে)



