৫০০ হিন্দুর সাথে সমসংখ্যক মুসলিমকে ফেরত নেবে মিয়ানমার
৩০ হাজার ধারণক্ষমতার অস্থায়ী শিবির নির্মাণ
৫০০ হিন্দুর সাথে সমসংখ্যক মুসলিম রোহিঙ্গা শরণার্থীকে ফেরত নিতে সম্মত হয়েছে মিয়ানমার। প্রত্যাবাসনের প্রথম ধাপের অভিজ্ঞতার পর বাদবাকী রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের জন্য উত্তর রাখাইনে ৩০ হাজার ধারণক্ষমতার অস্থায়ী শিবির নির্মাণ করেছে প্রতিবেশী দেশটি।
মিয়ানমার সরকারের মুখপাত্র জেও তেই বলেছেন, বাংলাদেশে পালিয়ে যাওয়া ৫০০ হিন্দুর সাথে ৫০০ মুসলিম রোহিঙ্গাকে নিয়ে প্রত্যাবাসনের প্রথম দলটি গঠন করা যায়। হিন্দু রোহিঙ্গারা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে তাদের সম্মতির কথা ইতোমধ্যে জানিয়েছে। তিনি বলেন, প্রত্যাবাসনের প্রথম পর্যায়টি গুরুত্বপূর্ণ। এর অভিজ্ঞতা থেকে আমরা ভালো-খারাপ দিক বুঝতে পারব। যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া শেষে মিয়ানমারে ফিরে এলে শরণার্থীরা নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারবেন।
মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল নিউ লাইটস অব মিয়ানমার জানিয়েছে, রাখাইনে সহিংসতার মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফেরত নিয়ে অস্থায়ী শিবিরে রাখা হবে। এজন্য দেশটির সরকার ৩০ হাজার রোহিঙ্গার জন্য একটি অস্থায়ী শিবির নির্মাণ করছে। রোহিঙ্গাদের জন্য এই অস্থায়ী শিবির হ্লা পো খাউং এলাকায় গড়ে তোলা হচ্ছে। এটি উত্তর রাখাইনে অবস্থিত। প্রত্যাবাসনে আগ্রহী রোহিঙ্গাদের জন্য এটি অস্থায়ী ট্রানজিট শিবির হিসেবে ব্যবহৃত হবে। ১২৪ একর জায়গায় ৬২৫টি ভবন নিয়ে এই অস্থায়ী শিবির নির্মাণ করা হচ্ছে। চলতি মাসের শেষ দিকে প্রায় ১০০টি ভবনের নির্মাণ কাজ শেষ হবে।
মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় মানবিক সহযোগিতা, পুনর্বাসন ও উন্নয়ন বিভাগের প্রধান সমন্বয়কারী অং টুন থেট জানান, হ্লা পো খাউং শিবিরটি হবে রোহিঙ্গাদের জন্য ট্রানজিট ক্যাম্প। তাদেরকে নিজ স্থানে প্রত্যাবাসন বা নিজ স্থানের কাছাকাছি স্থানে পাঠানোর আগে এখানে রাখা হবে।
তিনি বলেন, যারা ফিরতে চাইবেন তাদের মিয়ানমারের বাসিন্দা হিসেবে যাচাই করার পরই গ্রহণ করা হবে। এরপর তাদের পর্যবেক্ষণ শিবিরে পাঠানো হবে। সেখান থেকে অস্থায়ী শিবিরে। মিয়ানমারে যারা ফিরতে চাইবেন তাদের সবাইকে গ্রহণ করা হবে।
মিয়ানমারের সমাজকল্যাণ, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী সচিব সোয়ে অং অং জানান, রোহিঙ্গাদের নতুন বাড়ি বানানোর আগ পর্যন্ত অন্তত এক থেকে দুই মাস হ্লা পো খাউং শিবিরে থাকতে হতে পারে।
এদিকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন সংক্রান্ত যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের (জেডাব্লিউজি) প্রথম বৈঠক আজ মিয়ানমারের রাজধানী নেইপিডোতে শুরু হয়েছে। এতে প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে মাঠ পর্যায়ের খুঁটিনাটি বিষয় দেখভালের জন্য ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট চুক্তি সই হওয়ার কথা রয়েছে। রোহিঙ্গারা কোন সীমান্ত দিয়ে ফেরত যাবে, যাওয়ার আগে বাংলাদেশের কোন অস্থায়ী ক্যাম্পে অবস্থান করবে, মিয়ানমারে ফেরত যাওয়ার পরে কোথায় থাকবে ইত্যাদি বিষয়গুলো ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্টে থাকবে। সোমবারের মধ্যে এটি চূড়ান্ত করা সম্ভব না হলে আলোচনা মঙ্গলবারে গড়াবে।
যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকে ১৫ সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক। আর মিয়ানমার প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে রয়েছেন দেশটির পার্মানেন্ট সেক্রেটারি মিন্ট থো। বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, সশস্র বাহিনী বিভাগ, সামরিক গোয়েন্দা মহাপরিদফতর, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা অধিদফতর, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের প্রতিনিধিসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা রয়েছেন।
বৈঠকে প্রত্যাবাসনের জন্য এক লাখ রোহিঙ্গার তালিকা দেয়ার কথা পরিকল্পনা নিয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু মাঠপর্যায়ে এই তালিকা এখনও তৈরি হয়নি। রোহিঙ্গাদের পরিবারভিত্তিক নিবন্ধন না করার কারণে এক্ষেত্রে কিছুটা জটিলতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
গত ২৩ নভেম্বর মিয়ানমারের রাজধানী নেইপিডোতে সই হওয়া সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) অনুযায়ী জেডাব্লিউজি বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও স্বেচ্ছা প্রত্যাবাসন, রাখাইন রাজ্যে পুনর্বাসন এবং মিয়ানমার সমাজে পুন:একত্রিকরণের পদক্ষেপ নেবে। জেডাব্লিউজি সার্বিক প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করবে এবং নিজ নিজ দেশের সরকারকে তিন মাস অন্তর মূল্যায়ন প্রতিবেদন দেবে। প্রত্যাবাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে জাতিসঙ্ঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর এবং আগ্রহী আন্তর্জাতিক অংশীদারদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
গত ২৫ আগস্টের পর আসা সাড়ে ছয় লাখ রোহিঙ্গা এবং ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবরের পরে আসা ৮৭ হাজার রোহিঙ্গাকে প্রত্যাবাসনের জন্য বিবেচনায় নেয়া হবে। এর আগে থেকে বাংলাদেশে বসবাস করা প্রায় তিন লাখ রোহিঙ্গা চলমান প্রক্রিয়ায় বিবেচনার বাইরে থেকে যাবে। রোহিঙ্গাদের পরিচয় যাচাই-বাছাইয়ের ক্ষেত্রে শর্তগুলো এমওইউতে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় কোনো ক্ষেত্রে দ্বিমত থাকলে মিয়ানমারের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে। আগামী ২২ জানুয়ারি থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরুর আগ্রহের কথা জানিয়েছে মিয়ানমার।
সুত্র : নয়া দিগন্ত



