অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত করার সুপারিশ টিআইবি’র

অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধান এককভাবে সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত করার সুপারিশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। বৃহস্পতিবার টিআইবি’র ‘বাংলাদেশের অধস্তন আদালত ব্যবস্থা : সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গবেষণায় এ সুপারিশ তুলে ধরা হয়।
গবেষণায় বলা হয়েছে, দ্বৈত প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কারণে চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হচ্ছে। অধস্তন আদালত সংক্রান্ত কোনো উদ্যোগ বা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দুটি প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক সমন্বয়ের ঘাটতির কারণে কিছু ক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণ বা দীর্ঘসূত্রিতা হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে কোনো সিদ্ধান্ত বা প্রস্তাব সুপ্রিম কোর্ট নাকচ করে দেয়ার পরও মন্ত্রণালয় তা বাস্তবায়ন করেছে। উদাহরণ হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও প্রেষণে কর্মরত বিচারিক কর্মকর্তাদের বিদেশে প্রশিক্ষণে যাওয়ার ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়।
দ্বৈত প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কারণে বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে ঝুঁকি সৃষ্টি হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেছে টিআইবি।
গবেষণায় আরো বলা হয়, বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের আগে বিচারকদের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির বিষয়গুলো সংস্থাপন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ছিল। বর্তমানে তা আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে রয়েছে। যা কিছু ক্ষেত্রে নিম্ন আদালত ব্যবস্থার কার্যক্রমে প্রভাব ফেলার ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।
ঘুষ বা নিয়মবর্হিভূত অর্থ লেনদেন বিষয়ে বলা হয়, অধস্তন আদালতে একটি মামলার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে দ্রুত কাজ করানোর জন্য আদালতের কর্মচারী, রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী, আইনজীবী, আইনজীবীর সহকারী বা মুহুরীকে নিয়মবর্হিভূতভাবে অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করারও অভিযোগ তুলে ধরা হয়।
সুপারিশে অধস্তন আদালতের সাংবিদানিক দায়িত্ব পালনে পেশাগত উৎকর্ষতা বৃদ্ধি, জনগণকে ন্যায় বিচার প্রদান, জনগণের আস্থা বৃদ্ধির বিষয়টি উল্লেখ করে গবেষনায় বলা হয়, আইন প্রণয়ন ও আইনী সংস্কার নিশ্চিত করতে হবে। অধস্তন আদালতের পর্যাপ্ত আর্থিক বরাদ্দ নিশ্চিত করা, দেশের সব অধস্তন আদালতের জন্য পর্যাপ্ত জনবল, অবকাটামো, লজিস্টিকস ও আধুনিক প্রযুক্তিগত সুবিধা নিশ্চিত, বিচারকদের নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা, আদালতের সহায়ক কর্মচারিদের নিয়োগে স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত করা, রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী নিয়োগে স্বচ্ছ ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার বিষয়টিও পবেষণায় উঠে এসেছে।
টিআইবি’র এ গবেষণা প্রতিবেদন তৈরিতে দেশের ১৮টি জেলা থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। মুখ্য তথ্যদাতা ও নিবিড় সাক্ষাৎকারদাতারা হলেন নিম্ন আদালতের বিভিন্ন পর্যায়ের বিচারক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিচারপ্রার্থী, আইনজীবী, রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী, আইনজীবীদের সহকারী, জেলা আইনগত সহায়তা কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, এনজিও প্রতিনিধি, গণমাধ্যম কর্মী ও অন্যান্যরা। এছাড়া আইনজীবী ও গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে দলগত আলোচনা করা হয়েছে। মোট ৪৩৭ জনের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬৬ জন বিচারক রয়েছেন।
গবেষণা প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন টিআইবি’র রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি বিভাগের প্রোগ্রাম ম্যানেজার শাম্মী লায়লা ইসলাম ও অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রোগ্রাম ম্যানেজার নাজমুল হুদা মিনা। এ সময় ছিলেন টিআইবি ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, নির্বাহী ব্যবস্থাপনা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের, মো. রফিকুল হাসানসহ অন্যান্য কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন।
গবেষণো প্রতিবেদন তুলে ধরার পর সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দ্বৈত প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণের কারণে মামলা বিচারের ক্ষেত্রে তীর্ঘসূত্রতা সৃষ্টি সৃষ্টি হচ্ছে। বিচারের এই দীর্ঘসূত্রতার দায় নিতে হবে আইন মন্ত্রণালয়কে। আইন মন্ত্রণালয় কোনোভাবেই এর দায় এড়াতে পারবে না বলেও জানান তিনি।
মামলা বিচারের দীর্ঘসূত্রতার কথা উল্লেখ করে টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক বলেন, দুর্নীতির কারণে সুশাসনের ঘাটতি হয় এবং বিচার বিবগে আস্থার সংকট তৈরি হয়। শুধু বিচারের দীর্ঘসূত্রতা একমাত্র কারণ নয়, এক্ষেত্রে আইনী জটিলতাও এর অন্যতম কারণ বলে উল্লেখ করেন তিনি।



