উপমহাদেশস্পটলাইট

দিল্লিবাসী কীভাবে এক ট্যাক্সিচালকের দেনা মেটালো

বিহারের বাসিন্দা দেভেন্দর কাপরি দিল্লিতে থাকেন ৫ বছর ধরে – বহু মানুষই তাকে রোজ দেখেন, কিন্তু এতদিন তার নাম ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা ছাড়া বিশেষ কেউ জানতেন না।
জানার কথাও নয়, কারণ তিনি থাকেন দিল্লি বিমানবন্দরের কাছে একটা আধাগ্রামের ছোট্ট ঘরে – আরও দুজনের সঙ্গে। দিল্লির রাস্তায় কালো-হলুদ রঙের ট্যাক্সি চালান তিনি।
কিন্তু কয়েকদিন আগে তার নামই শোনা গিয়েছিল বেসরকারি এফএম স্টেশন রেডিও মির্চিতে আর জে নাভেদের গলায়।
ঠিক কী করেছিলেন ওই ট্যাক্সিচালক, যার জন্য তার নাম রেডিওতে বলা হচ্ছিল?
জানতে চেয়েছিলাম সরাসরি মি. কাপরির কাছেই।
মি. কাপরির কথায়, “এক যাত্রী দুটো ব্যাগ নিয়ে উঠেছিলেন বিমানবন্দর থেকে। একটা হোটেলের সামনে তিনি নেমে যাওয়ার পরে একটা ব্যাগ পেছনের সিটে রয়ে যায়। ট্যাক্সি নিয়ে ওই হোটেলের কাছে ফিরে গিয়েও ওই যাত্রীকে আর খুঁজে পাইনি। মালিকের সঙ্গে কথা বলে থানায় যাই। ব্যাগ খুলে দেখা যায় গয়ান, ল্যাপটপ, আইফোন রয়েছে – পুলিশ বলে এগুলোর দাম প্রায় আট লাখ টাকার মতো হবে। ব্যাগের মধ্যেই একটি বিয়ের কার্ডে একটা মোবাইল নম্বর পাওয়া যায়। সেটাতে ফোন করে ওই যাত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ হয়।”
“কিছুক্ষণের মধ্যেই বিমানবন্দরে এসে নিজের ব্যাগ ফিরে পেয়ে আপ্লুত হয়ে গিয়েছিলেন ভারত শাসিত কাশ্মিরের রাজধানী শ্রীনগরের বাসিন্দাওই যাত্রী। যাওয়ার সময়ে দেড় হাজার টাকাও দিয়ে গেছেন,” জানাচ্ছিলেন দেভেন্দর কাপরি।
একবারও মনে হয় নি যে রেখে দিলেই হয় ব্যাগটা?
“আমার মাথাতে কথাটা আসেই নি,” বললেন দিল্লির ট্যাক্সিচালাক দেভেন্দর কাপরি।
এরকম ঘটনা বিরল হলেও মাঝে মাঝেই সংবাদমাধ্যমে আসে।
সেইভাবেই সংবাদমাধ্যম জানতে পারে, যে দেভেন্দর কাপরি অত টাকা মূল্যের জিনিষ পেয়েও ফিরিয়ে দিয়েছেন, তিনি বিহারের গ্রাম থেকে পড়াশোনা ছেড়ে খুব কষ্ট করে দিল্লিতে রয়েছেন গত ৫ বছর ধরে, কারণ দুই বড় দিদির বিয়ের সময়ে বাবা যে টাকা ধার করেছিলেন, তার মধ্যে ৭০ হাজার টাকা প্রায় নবছর পরেও শোধ করতে পারে নি মি. কাপরির পরিবার।
এই খবর পত্রিকায় ছাপার পরে সেটা চোখে পড়ে যায় রেডিও মির্চির এক আর জে নাভেদ খান ও তার প্রযোজকের।
তখনই তারা ঠিক করেন যে চেষ্টা করে দেখা যাক দেভিন্দরের দেনা শোধ করার জন্য টাকা যোগাড় করা যায় কী না।
মি. খান বলছিলেন, “যেদিন অনুষ্ঠানে আসার জন্য দেভেন্দরকে আমরা ডেকেছিলাম, সেদিন সকালে একবার ঘোষণা করেছিলাম যে ওই ট্যাক্সিচালক স্টুডিওতে আসবেন। শ্রোতাদের মধ্যে যে যতটা পারেন যেন সাহায্য করেন সেই আবেদনও ছিল। সঙ্গে সঙ্গেই ফোন আসা শুরু হয়ে গিয়েছিল। অবশেষে মি. কাপরিকে যখন অনুষ্ঠানে নিয়ে আসা হয় তখনও কেউই ভাবতে পারি নি যে সত্যিই টাকাটা তোলা যাবে। আমি তো ওর সঙ্গে চা খাওয়ানোর চ্যালেঞ্জ নিয়ে নিয়েছিলাম যে দুপুরের মধ্যেই টাকা উঠে আসবে।”
তবে অভাবনীয়ভাবে চল্লিশ মিনিটে মাত্র তিনবার ঘোষণার পরেই প্রয়োজনীয় ৭০ হাজার টাকা উঠে আসে। শেষমেশ সাড়ে দশটায় যখন টাকা জমা দেওয়ার সাইটটি বন্ধ করা হচ্ছে, তখন সেখানে ৯১ হাজার টাকা উঠে গেছে।
সাধারণভাবে বড় মেট্রো শহরগুলোর বাসিন্দারা রাস্তাঘাটে অজানা অচেনা কাউকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন না। দুর্ঘটনায় পড়লেও অনেকে মুখ ফিরিয়ে চলে যান।
কিন্তু দেভেন্দর কাপরির জন্য অর্থ সংগ্রহে নেমে সেই ধারনাটা বদলে গেছে নাভেদ খানের।
কলকাতার প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের প্রাক্তণ বিভাগীয় প্রধান শমিত কর ব্যাখ্যা করছিলেস সাধারন মানুষের এই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার কারণ।
“ওই ছেলেটি তার ডিউটিই করেছে ব্যাগটা ফেরত দিয়ে। কিন্তু এই যে নিজের অর্থের প্রয়োজন থাকা স্বত্ত্বেও একটা পয়সাও সরিয়ে না রেখে মহত্বের পরিচয় দিয়েছে, কোনও সমঝোতা করে নি ব্যক্তি স্বার্থের সঙ্গে, সেটাই অনেকের মনে দাগ কেটেছে। সাধারণ মানুষ তো দৈনন্দিন জীবনে অনিচ্ছা স্বত্ত্বেও সমঝোতা করতে বাধ্য হচ্ছেন নিয়মিত। সেই সময়ে কেউ যখন মহত্ব দেখাচ্ছে সমঝোতা না করে, সেই ব্যাপারটিকেই সাধারণ মানুষ কুর্ণিশ করেছে দেনা মেটানোর টাকা যোগাড় করে দিয়ে,” বলছিলেন মি. কর।
দেভেন্দর কাপরি এখনও সংগৃহীত টাকা হাতে পান নি।
টাকাটা পেয়ে দেনা শোধ করার পরেও যে বাড়তি হাজার কুড়ি থাকবে, সেটা দিয়ে কী করবেন এখনও ভেবে উঠতে পারেন নি।
তবে একটা জিনিষ যে কিনবেন, সেটা ঠিক করেই ফেলেছেন।
গ্রামের বাড়িতে বছরে একবার করে গেলেই মা একটা শাড়ি আনতে বলেন দেভেন্দরকে।
এবার সেপ্টেম্বর মাসে বাড়ি যাওয়ার সময়ে মায়ের জন্য সেই শাড়িটা নিয়ে যেতে হবে তাকে।সুত্র: বিবিসি

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button