জাতীয়শিরোনাম

১ মে’র চেতনা

সুরুয খান
মানি না, এ অন্যায় অবিচার মানি না। আমার জীবন ব্যর্থ করে দেবার অধিকার কারো নেই, হোক সে দেবতা কিংবা মানব।’ সর্পদেবতার অন্যায়ে, অবিচারে বিক্ষুব্ধ হয়ে বিদ্রোহে ফেটে পড়েছিলো বেহুলা। এখন দেবদেবীর বালাই নেই। সেখানে স্থান গেড়ে আছে রক্ত-মাংসের মানুষ। এই মানুষের কতিপয় অংশ দেবদেবীরচে’ও চরম পন্থায় শাসন পীরন করে চলছে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ওপর। কিন্তু বঞ্চিত মানুষ এতে নীরব নেই। তারা বঞ্চনকারীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছে, বিদ্রোহ করছে। এজন্য জীবন দিতে হচ্ছে অসংখ্য বঞ্চিত মানুষদের। এমনি একবার জীবন দিয়েছিলো পারসন্স, ফিসার, স্পাইস, এঙ্গেল, গীর, সোয়াব এবং ফিলডেনরা। প্রতি ১মে বিশ^ তাদের স্মরণ করে।
১৮৮৬ সালের ঘটনা। আমেরিকার শিকাগো শহরে নিপীড়িত শোষিত মানুষেরা দৈনিক আট ঘন্টা খাটুনী এবং অন্যান্য কতিপয় দাবী দাওয়ার সংগ্রামে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। কিন্তু অন্যদিকে স্বৈরাচারী বুর্জোয়া গোষ্ঠী হুঙ্কার দিয়ে ওঠে। তারা ১মে তারিখে শ্রমিকদের মিছিলের ওপর অমানবিক ভাবে গুলি চালালো। শ্রমিকের রক্তে শিকাগো শহরের হেমার্কেটে রক্তের নদী বয়ে গেল। জন্ম হলো একটি রক্তাক্ত ইতিহাসের। শিকাগো শহরের রক্তাক্ত দিনটি আন্তর্জাতিক চেতনার উন্মেষরূপে আত্মপ্রকাশ করলো আমেরিকার ভৌগলিক সীমা পেরিয়ে পৃথিবীর দেশে দেশে। বিপ্লবী শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে নিজের দেশের শোষকশ্রেণী ও আন্তর্জাতিক শোষক সা¤্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে জাতিগত ও আন্তর্জাতিক শোষণমুক্তির ঐক্যবদ্ধ বিপ্লবী সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বিদায় হলো জার, হিটলার, মুসোলিনী ও ইয়াহিয়া-টিক্কা-নিয়াজীরা।
এ আলোচনায় শ্রমিকশ্রেণীর বিপ্লবী চেতনার উৎস সন্ধানের প্রয়োজন বোধ করছি। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ইউরূপের প্রধান প্রধান দেশগুলোতে ধনতন্ত্রের বিজয় হয়। আর পুঁজিদাররা পূর্ণভাবে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে বসে। অপরদিকে শ্রমিকশ্রেণী বুঝতে শুরু করে যে, ধনতন্ত্রও এক ধরনের শোষণ। তাই তারা বুর্জোয়া শ্রেণীর বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। ১৮২০ এবং ১৮৩০ এর দশকে অর্থনৈতিক সংকটের দরুন বুর্জোয়াশ্রেণীর এবং শ্রমিকশ্রেণীর দ্বন্দ্ব তীব্রতর রূপ নেয়। কিন্তু শোষণমুক্ত সমাজ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে, সামাজিক শ্রেণী হিসাবে নিজের ইতিহাস-নির্দিষ্ট বৈপ্লবিক ভ’মিকা সম্পর্কে, নিজের সামাজিক লক্ষ্য সম্পর্কে শ্রমিকশ্রেণীর তখনও কোন স্পষ্ট ধারণা এবং কোন সুনির্দিষ্ট কর্মসূচী ছিল না। হেনরী সন্ত-সাইমন, চার্লস ফুরিয়ার এবং রবার্ট ওয়েন প্রমুখ কাল্পনিক সমাজতন্ত্রীরা শ্রমিকশ্রেণীকে যে সমাজতন্ত্রবাদের প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ করে তা ব্যর্থ প্রচেষ্টা মাত্র। লেলিন তার ‘মার্কসবাদের তিনটি উৎস এবং তিনটি উপাংশ’-এ এ ব্যাপারে বলেন, “যখন সমাজতন্ত্র উৎখাত হলো এবং পৃথিবীতে ‘স্বাধীন’ ধনতান্ত্রিক সমাজের উদয় হলো এ কথা তৎক্ষণাৎ সুস্পষ্ট হয়ে উঠলো যে, এই স্বাধীনতা মানে মেহনতী মানুষের ওপর এক নতুন ব্যবস্থার নিপীড়ন ও শোষণ। সংগে সংগেই এই নিপীড়নের প্রতিফলন ও এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসাবে নানা ধরনের সমাজতান্ত্রিক মতবাদের উদ্ভব হলো। প্রথম দিকের সমাজতন্ত্রবাদ অবশ্য কাল্পনিক সমাজতন্ত্রবাদ ছিল। এই মতবাদ ধনতান্ত্রিক সমাজকে সমালোচনা করেছে, তাকে নিন্দা করেছে ও অভিশাপ দিয়েছে, তাকে ধ্বংসের স্বপ্ন দেখেছে, উন্নততর ব্যবস্থার কল্পচিত্র এঁকেছে এবং শোষণ যে দুর্নীতি সে কথা ধনীকে বোঝাতে চেষ্টা করেছে। কিন্তু কাল্পনিক সমাজতন্ত্রবাদ আসল সমাধানের হদিস দিতে পারে নি। এই মতবাদ ধনতন্ত্রের আমলের মজুরী-দাসত্বের আসল চরিত্রকে ব্যাখ্যা করতে পারে নি, ধনতন্ত্রের বিকাশের বিধানগুলোকে উদঘাটিত করতে পারে নি, অথবা কোন্ সামাজিক শক্তি নতুন সমাজের ¯্রষ্টা হতে পারে তাও দেখাতে পারে নি।”
মার্কস ও এঙ্গেলসই সর্বপ্রথম কল্পনাবিলাসী সমাজতন্ত্রীদের মত খন্ডন করে বুঝিয়ে দেন যে, সমাজতন্ত্র স্বপ্নচারীদের (ইউটোপিন) উদ্ভাবনা নয়, সমাজতন্ত্র আধুনিক পুঁজিতান্ত্রিক সমাজের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি। তাঁরা সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠনে শ্রমিকশ্রেণীর বাস্তব রণনীতি ও রণকৌশল নির্ধারণ করে দেন।তাঁরা পুঁজিবাদী সমাজ বিকাশের নিয়মগুলো আবিস্কার করেন এবং বিজ্ঞান সম্মত উপায়ে প্রমাণ করেন যে, পুঁজিবাদী সমাজের বিকাশ ও সমাজের মধ্যে অবিরাম শ্রেণী সংগ্রামের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হলো পুঁজিতন্ত্রের পতন, সর্বহারা শ্রেণীর বিজয়, সমাজে সর্বহারা শ্রেণীর একাধিপত্য। তাঁরা শিক্ষা দেন যে,সমাজে কলকারখানায় সর্বহারারাই সবচে’ বিপ্লবী, সবচে’ অগ্রসর শ্রেণী এবং একমাত্র সর্বহারা শ্রেণীই পারে পুঁজিবাদী শোষণে যারা ক্ষুব্ধ তাদের সকলকে নিজের নেতৃত্বে একজোট করে পুঁজিতন্ত্রের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালাতে। লেলিনের ভাষায়, “শ্রমিক শ্রেণীর প্রতি মার্কস ও এঙ্গেলস এর যা অবদান সেটা অল্প কথায় এইভাবে বলা যায় ঃ শ্রমিক শ্রেণীকে তাঁরা আত্মজ্ঞান ও আত্মচেতনার শিক্ষা দেন এবং স্বপ্ন দর্শনের স্থানে স্থাপন করেন বিজ্ঞান।”
মার্কস এর মৃত্যুর পর মার্কসবাদ সারা বিশে^র অধিকাংশ দেশে সকল প্রকার সামাজিক শোষণ ও জাতীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণী ও মেহনতী জনতার বিপ্লবী সংগ্রামের অজেয় পতাকায় পরিণত হয়। অনেকগুলো দেশে শ্রমিক শ্রেণী ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে একেবারে উপড়ে ফেলে সমাজতন্ত্র গড়ে তোলার জন্য নিজেদের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক একাধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। ঐ সব দেশে শ্রমিক শ্রেণী নিজেকে শাসক শ্রেণীর পর্যায়ে উন্নীত করে এবং শ্রমিক শ্রেণীর ওপর মালিক শ্রেণীর শোষণ চিরদিনের জন্য অবসান ঘটায়। শ্রমিক শ্রেণীর এই বিজয় পৃথিবীর অন্যান্য সকল দেশের শ্রমিক শ্রেণীকে রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হতে, মালিক শ্রেণীর শাসনকে ঝেড়ে ফেলতে অনুপ্রাণিত করে। অবশ্য দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে ইতিমধ্যে বিশ^ পরিস্থিতির নানান পরিবর্তন ঘটে গেছে। এ পরিবর্তন ঘটেছে দেশে দেশে।
আমাদের দেশের কথা ভাবলে দেখতে পাই, যুগ যুগ ধরে এ দেশের জনগণ যে আদর্শে বিশ^াসী শাসকগণ তাদেরকে তার উল্টো পথে টেনে নিয়েছে। জনগণকে যে মন্ত্র ঐক্যবদ্ধ করবে শাসকগণ তার বিপরীত মন্ত্র জপেছে। জনচিত্ত আন্দোলিত হয় যে সুর ও ছন্দে, যে গান জনগণকে উদ্বুদ্ধ করে সংগ্রামে ও সৃষ্টিতে, ত্যাগে ও দেশপ্রেমে, শাসকদের কন্ঠে বেজেছে তার বিপরীত রাগিনী। এই বৈপরিত্যের কারণেই স্বাধীনতার অমূল্য ঐশ^র্য হাতের কাছে পেয়েও আমরা স্বাধীনতার সুফল থেকে অনেকাংশেই বঞ্চিত। তাই ধরিত্রীর বুক চিরে ফালি ফালি করে যারা শস্য জন্মায় রুক্ষ হাতে, যারা সভ্যতার চাকা ঘোড়ায় কলে কারখানায়, পদ্মা-মেঘনা-যমুনার বিশাল তরঙ্গে যারা হাল ধরে দাঁড় টানে তাদের তেমন মঙ্গল হয় নি। মূল যে সমস্যা ছিলো, সিন্দবাদের দৈত্যের মত আজও ঘাড়ে চেপে আছে বঞ্চিত মানুষের। সম্পদ ক্রমশ: কেন্দ্রীভ’ত হচ্ছে একই শ্রেণীর হাতে। নি:স্ব সর্বহারা মানুষের কাতার উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে নি।
আমাদের দেশের মতো দুনিয়ার অনেক দেশে দেশেই শোসক তথা সরকার ও জনগণের বৈপরীত্যের কারণে জনগণের স্বাধীনতা স্বল্প সংখ্যক স্বার্থপরতার বেদিতে মাথা কুটে মরছে।
কিন্তু এভাবেই কি চলবে ক্রমাগত? এানুষ কি শুধু বঞ্চিতই হতে থাকবে? শোষণের ভারে ন্যূব্জ আর বেদনার ভারে ভারাক্রান্ত হবে মানুষের অধিকার চেতনা? না, ইতিহাস তো এটা বলে না। ১মে’র রক্তাক্ত শিকাগো এমনি একটি ইতিহাসের জন্ম দিয়েছিলো।
সুরুয খান: ভোরের কাগজ ও বাংলাদেশ বেতার প্রতিনিধি, মানিকগঞ্জ।
মোবাইল: ০১৫৫২৩১৬২৫৯।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button