sliderমতামতশিরোনাম

জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠার বাস্তবতার হিসাব নিকাশ

মোহা: সফিকুল ইসলাম: বিশ্বের ধ্বংসলীলার ক্ষেত্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বনেতৃবৃন্দ বিশ্বে শান্তি, নিরাপত্তা,শৃংখলা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা রক্ষা কল্পে -১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবরে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত করেন। প্রকৃত পক্ষে জাতিসংঘ হলো একটি সারা বিশ্বেও আন্ত:রাষ্ট্রীয় সংস্থা। এ সংস্থার প্রতিষ্ঠাকালীন প্রধান লক্ষ্যই ছিল ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যুদ্ধের ধ্বংসলীলা থেকে রক্ষা করা ও সংলাপের মাধ্যমে সকল আন্তর্জাতিক বিরোধ মীমাংসা করা। ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ সনদ কার্যকর হওয়ার পর ৮১ বছর পরও এই লক্ষ্য অত্যাবশ্যাক রয়ে গেছে।

প্রতিষ্ঠাকালীন আদর্শ ও বাস্তবতার প্রেক্ষিতে সময়ের প্রশ্ন; জাতিসংঘ কি তার প্রতিশ্রুতি পূরণে সক্ষম? নাকি উদাসীন? ২৪ অক্টোবর “জাতিসংঘ দিবস” হিসেবে বিশ্বব্যাপী উদযাপিত হয়। সেই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালে জাতিসংঘের সদস্য দেশে এ দিবসটি পালিত হচ্ছে এমন এক সময়ে- বেসামরিক মানুষের জীবন বিপন্ন করছে যুদ্ধ, মানবাধিকার সুরক্ষায় দেখা যাচ্ছে দ্বৈতনীতি এবং জলবায়ু সংকটের সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করছে বিশ্বের ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী।

অকার্যকর কার্যকারিতা: বর্তমানে জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্রর সংখ্যা ১৯৩। এর বাইরে ভ্যাটিকান ও ফিলিস্তিন এ রাষ্ট্র দুটি সদস্য না হলেও পর্যবেক্ষক রাষ্ট্রের মর্যাদায় রয়েছে। ১৯৪৫ সালে ৫১ সদস্য নিয়ে যাত্রা শুরু হলেইও বাংলাদেশ জাতিসংঘে যোগ দেয় ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর। সর্বশেষ সদস্যরাষ্ট্র দক্ষিণ সুদান, যার সদস্যপদ নিয়েছে ২০১১ সালের ১৪ জুলাই। সাধারণ পরিষদে প্রতিটি সদস্যরাষ্ট্রের একটি করে ভোট দেয়ার অধিকার থাকলেও বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সবার প্রভাব সমান নয়। বিশেষ করে নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামোয় ক্ষমতার অসম বণ্টন স্পষ্টই বোঝা যায়। এর ফলে সংস্থাটি কতটা কার্যকর, প্রতিনিধিত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বিশ্বে যুদ্ধ প্রতিরোধের লক্ষ্যে। কিন্তু ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের ক্ষমতা প্রায়ই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে। যখন সম্মিলিত দায়িত্বের চেয়ে জাতীয় কৌশলগত স্বার্থ প্রাধান্য পায়,তখন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যায়। এর মূল্য দিতে হয় সাধারণ মানুষকে। পরিবার হারায় ঘরবাড়ি, শিশুরা হারায় শিক্ষার সুযোগ এবং লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয় নির্বিচারে। শান্তি মানে কি শুধু যুদ্ধ বন্ধ হওয়া? শান্তি হলো- নিরাপদে ঘরে ফেরা, ভয়মুক্ত জীবনযাপন এবং মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকা। সংঘাত প্রতিরোধে আগামসতর্কতা, কূটনৈতিক উদ্যোগ ও মধ্যস্থতা জোরদার জরুরি। সেই সঙ্গে নিরাপত্তা পরিষদে অনু-প্রতিনিধিত্বশীল অঞ্চলগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং ব্যাপক নৃশংসতার ক্ষেত্রে ভেটো ব্যবহারে সংযম প্রতিষ্ঠা দরকার। এজন্য প্রয়োজন প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

টেকসই উন্নয়ন প্রতিবন্ধকতাঃ জাতিসংঘের ২০৩০ সালের এজেন্ডা ও ১৭টি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা দারিদ্র্য, বৈষম্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পরিবেশ সুরক্ষায় অভিন্ন কাঠামো তৈরি করেছে। কিন্তু অর্থনৈতিক অভিঘাত, ঋণসংকট, অপর্যাপ্ত অর্থায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন অগ্রগতিকে মন্থর করছে। পরিবেশগত সংকটে যাদের অবদান সবচেয়ে কম, অনেক ক্ষেত্রে তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য সহজলভ্য জলবায়ু অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ন্যায্য অর্থনৈতিক ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামোর সংস্কার, স্বল্পসুদে উন্নয়ন অর্থায়ন এবং অসহনীয় ঋণের বোঝা কমানো জরুরি।উন্নত দেশগুলোকে জলবায়ু প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তব আর্থিক সহায়তার সমন্বয় ঘটাতে হবে। তবে শুধু বৈদেশিক সহায়তা যথেষ্ট নয়। জাতীয় নেতৃত্ব, সুশাসন ও জবাবদিহিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘের দায়িত্ব হলো অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা এবং উন্নয়নের সুফল যেন ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছেও পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করা।

আস্থার অভাব: রাজনৈতিক মেরুকরণ বৈশ্বিক সহযোগিতাকে দুর্বল করছে। কিছু কিছু রাষ্ট্রের সরকার আন্তর্জাতিক চুক্তিকে জাতীয় সার্বভৌমত্বের সীমাবদ্ধতা হিসেবে ভাবে। অন্যরা মনে করে, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো সব ক্ষেত্রে একই নীতি অনুসরণ করে না। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে এই বিতর্ক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০২৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মাইলেই জাতিসংঘকে ‘অকার্যকর সংস্থা’ এবং এর কর্মকর্তাদের ‘অহংকারী পরজীবী’ বলে আখ্যায়িত করেন বলে দ্য টাইমস অব ইসরায়েল জানিয়েছে। তাঁর অভিযোগ, সংস্থাটি সম্মিলিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। অন্যদিকে, স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ নিরাপত্তা পরিষদে সব অঞ্চলের ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে সংস্কারের আহ্বান জানান এবং ভেটো ক্ষমতা বিলুপ্ত করার পক্ষে মত দেন বলে আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদনে উল্লেখিত। মহামারি, জলবায়ু পরিবর্তন ও সাইবার হুমকি প্রমাণ করে, স্বার্থের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতা অপরিহার্য। দায়িত্বশীল বহুপাক্ষিকতা জাতীয় স্বার্থকে অস্বীকার করে না; বরং তা সুরক্ষায় সহায়তা করে। এজন্য আন্তর্জাতিক ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, প্রতিশ্রুতি রক্ষা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জাতিসংঘের অন্যতম দায়িত্ব হওয়া উচিৎ।

সর্বজনীন মানবাধিকার প্রশ্নঃ মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র মানুষের মর্যাদা, স্বাধীনতা ও সমতার অভিন্ন মানদণ্ড দিয়েছে। কিন্তু এর বাস্তবায়ন এখনো অসম। কোনো কোনো সরকার সমালোচনা এড়াতে সার্বভৌমত্বের যুক্তি তুলে ধরে।অন্যদিকে নজরদারি, অনলাইন সেন্সরশিপ ও ডিজিটাল দমন-পীড়ন ব্যক্তি-স্বাধীনতার জন্য নতুন হুমকি তৈরি করছে।রাজনৈতিক সুবিধা অনুযায়ী নয়, সর্বক্ষেত্রে মানবাধিকার রক্ষা করতে পারলেই জাতিসংঘের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়বে। বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও আইনের দৃষ্টিতে সমতা কোনো রাজনৈতিক সমঝোতার হাতিয়ার হতে পারে না। গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের নিরপেক্ষ তদন্ত, জবাবদিহি এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সুরক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
ঘোষণার চেয়ে বাস্তবায়ন কম জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের প্রতিপাদ্য- ‘আস্থা পুনরুদ্ধার, পরিবর্তন মোকাবিলা: সবার জন্য কার্যকর জাতিসংঘ’ -বর্তমান চ্যালেঞ্জের সারকথা তুলে ধরে। মানুষের জীবনে দৃশ্যমান অগ্রগতিই আস্থা ফেরানোর প্রধান শর্ত। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়, ফলাফলের জবাবদিহি এবং প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার বাড়াতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জনসেবা উন্নত করতে পারে, তবে এর ব্যবহার মানবাধিকার ও স্বচ্ছতার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য হওয়া জরুরি। সদস্যরাষ্ট্রগুলোর পাশাপাশি নাগরিক সমাজ, তরুণ প্রজন্ম, গবেষক ও সাংবাদিকদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোকে শুধু আন্তর্জাতিক বৈঠকে অংশ নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ন্যায্য বৈশ্বিক নিয়ম প্রতিষ্ঠা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর স্বার্থ তুলে ধরে তা আদায় করতে হবে।

দরকার নতুন অঙ্গীকার জাতিসংঘ দিবস কেবল বার্ষিকী উদ্যাপনের দিন নয়; বরং প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ব্যবধান পর্যালোচনার উপলক্ষ্য। জাতিসংঘ নিখুঁত প্রতিষ্ঠান নয়, কিন্তু রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আলোচনা ও সমঝোতার জন্য একটি অভিন্ন বৈশ্বিক মঞ্চের প্রয়োজন। বহুপাক্ষিক সহযোগিতা পরিত্যাগ করলে বৈশ্বিক সংকট দূর হবে না; বরং সেগুলো মোকাবিলা আরও কঠিন হবে। ৮১ বছরে পদার্পণ করা জাতিসংঘের প্রয়োজন প্রতিষ্ঠাকালীন আদর্শের প্রতি নতুন অঙ্গীকার, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, নির্ভরযোগ্য অর্থায়ন এবং সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে মানবতাকে স্থান দেওয়ার মানসিকতা। এর সাফল্য নির্ধারিত হবে শুধু গৃহীত প্রস্তাব দিয়ে নয়; বরং যুদ্ধের দুর্ভোগ কমছে কি না, মানবাধিকার সুরক্ষিত হচ্ছে কি না, উন্নয়নশীল দেশগুলো ন্যায্য সুযোগ পাচ্ছে কি না এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ পৃথিবী নিশ্চিত হচ্ছে কি না, তার ভিত্তিতে।

জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালিহ বলেছেন, ‘শান্তির পরিমাপ শুধু স্বাক্ষরিত চুক্তির মাধ্যমে নয়, বরং মানুষের জীবনে আসা পরিবর্তনের মাধ্যমেও করতে হবে।’সার্বজনীন মানবাধিকার ও শান্তি বাস্তবায়ন করতে পারলে জাতিসংঘ নিয়ে মানুষের মনে আস্থা পাবে অন্যথায় উল্লেখিত প্রশ্ন, প্রশ্নই থেকে যাবে।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, বিনোদপুর কলেজ ও সাংবাদিক, দৈনিক ইত্তেফাক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button