রতন রায়হান, রংপুর: অদ্য ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের কনফারেন্স রুমে বিভাগীয় উন্নয়ন কমিটির সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় সভাপতিত্ব করেন বিভাগীয় কমিশনার মোঃ শহিদুল ইসলাম, এনডিসি। উপস্থিত ছিলেন রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মু. মাহবুবুর রশীদ, বিভাগের আট জেলার জেলা প্রশাসক, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সাংবাদিকবৃন্দ।
সভায় সরকারি দপ্তরগুলোর পারস্পরিক সমন্বয় জোরদার, জনসেবা নিশ্চিতকরণ, সরকারি সম্পদ সুরক্ষা, অপরাধ প্রতিরোধ এবং আইনানুগ কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
এ সময় রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে অপরাধ প্রতিরোধ, অপরাধীদের শনাক্তকরণ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় ও পুলিশি কার্যক্রম
১। গণপূর্ত অধিদপ্তর
সরকারি স্থাপনা ও জমি দখল, চুরি, ভাঙচুর এবং সরকারি সম্পদ ক্ষতিসাধনসংক্রান্ত অপরাধ প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সরকারি সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে নজরদারি জোরদার করা হবে।
২। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর
মহাসড়ক ও সড়কের জায়গা অবৈধ দখল, চাঁদাবাজি, সড়ক অবরোধ এবং দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থানে শৃঙ্খলা রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে প্রয়োজনীয় পুলিশি সহায়তা ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
৩। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)
গ্রামীণ সড়ক, সেতু ও সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের নির্মাণসামগ্রী চুরি, ভাঙচুর এবং প্রকল্প এলাকায় অপরাধ প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের নিরাপত্তা ও জনস্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় তথ্য আদান-প্রদান এবং আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
৪। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড
নদী, বাঁধ, বেড়িবাঁধ ও পানি নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত করা, অবৈধ বালু উত্তোলন এবং সরকারি সম্পদ দখলসংক্রান্ত অপরাধ প্রতিরোধে সমন্বিত কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তথ্যের ভিত্তিতে অপরাধীদের শনাক্তকরণ ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে পুলিশ সহায়তা করবে।
৫। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড
বিদ্যুৎ অবকাঠামোতে নাশকতা, বিদ্যুৎ চুরি, অবৈধ সংযোগ এবং সরকারি সম্পদ ক্ষতিসাধন প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করা হবে। বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন সৃষ্টিকারী অপরাধ শনাক্তকরণ ও প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় পুলিশি সহায়তা প্রদান করা হবে।
৬। বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড
পল্লী বিদ্যুতের অবকাঠামো, ট্রান্সফরমার ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম চুরি এবং বিদ্যুৎ-সংক্রান্ত অনিয়ম প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট সমিতির সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। অপরাধের তথ্য দ্রুত পুলিশকে অবহিতকরণ এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
৭। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর
নিরাপদ পানি সরবরাহের অবকাঠামো, গভীর নলকূপ ও সরকারি পানির স্থাপনা চুরি, ভাঙচুর এবং অবৈধ দখল থেকে সুরক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হবে। জনস্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট স্থাপনায় অপরাধের তথ্য পেলে দ্রুত তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
৮। স্বাস্থ্য বিভাগ
মামলা-সংশ্লিষ্ট মেডিকেল সার্টিফিকেট (এমসি), চিকিৎসা প্রতিবেদন ও প্রয়োজনীয় আলামত যথাসময়ে সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষকে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান অপরাধ তদন্তের স্বার্থে চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি দ্রুত প্রাপ্তি এবং হাসপাতালের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সমন্বয় জোরদার করা ।
৯। স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর
হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের নির্মাণকাজ, সরকারি সম্পদ এবং অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। নির্মাণসামগ্রী চুরি, ভাঙচুর ও অন্যান্য অপরাধ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় পুলিশি সহায়তা প্রদান করা হবে।
১০। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর
পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয় ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের নিরাপত্তা এবং সরকারি ওষুধ ও সরঞ্জামের অপব্যবহার প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ, চুরি বা অন্যান্য অপরাধের তথ্য পাওয়া গেলে তদন্তপূর্বক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
১১। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর
কৃষকদের হয়রানি, প্রতারণা, ভেজাল কৃষি উপকরণ সরবরাহ এবং সরকারি কৃষি সহায়তা আত্মসাৎসংক্রান্ত অপরাধ প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় অপরাধের তথ্য সংগ্রহ, তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে পুলিশ সহযোগিতা করবে।
১২। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)
সরকারি সার ও বীজের অবৈধ মজুত, পাচার, কালোবাজারি এবং বিতরণে অনিয়ম প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বিত নজরদারি জোরদার করা হবে। কৃষি উপকরণসংক্রান্ত অপরাধের তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে পুলিশ সহায়তা করবে।
১৩। কৃষি বিপণন অধিদপ্তর
সারসহ কৃষিপণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, অবৈধ মজুত, কারসাজি ও অতিরিক্ত মূল্য আদায়ের অভিযোগ প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, অপরাধের তথ্য যাচাই এবং প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণে পুলিশ প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করবে।
১৪। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্থানে সরকারি ওষুধ চুরি, অবৈধ বিক্রয়, নকল ওষুধ এবং ওষুধের অপব্যবহার প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বিত কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে। অপরাধীদের শনাক্তকরণ, প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ এবং আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে পুলিশ ও ঔষধ প্রশাসন যৌথভাবে কাজ করবে।
১৫। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর
গবাদিপশু চুরি, পশুসম্পদ পাচার, অবৈধ জবাই এবং প্রাণিসম্পদসংক্রান্ত প্রতারণা প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। অপরাধের তথ্য দ্রুত আদান-প্রদান এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণে পুলিশ সহায়তা করবে।
১৬। মৎস্য অধিদপ্তর
মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণ, অবৈধ মাছ আহরণ, নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার এবং জলাশয়ে অপরাধ প্রতিরোধে মৎস্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করা হবে। প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী ক্ষমতাপ্রাপ্ত মৎস্য কর্মকর্তাদের আইনানুগ দায়িত্ব পালনে সহায়তা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পুলিশি সহযোগিতা প্রদান করা হবে।
১৭। খাদ্য বিভাগ
সরকারি খাদ্যশস্য চুরি, অবৈধ মজুত, পাচার, ওজনে কারচুপি এবং খাদ্য বিতরণে অনিয়ম প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। খাদ্যগুদাম ও সরকারি খাদ্যশস্যের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে পুলিশ কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।
১৮। সমাজসেবা অধিদপ্তর
সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ভাতা আত্মসাৎ, প্রতারণা, জালিয়াতি এবং অসহায় ব্যক্তিদের হয়রানি প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ গ্রহণ, অপরাধীদের শনাক্তকরণ এবং আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে পুলিশ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে।
১৯। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর
ভেজাল পণ্য, প্রতারণা, অবৈধ মজুত, অতিরিক্ত মূল্য আদায় এবং ভোক্তা অধিকারবিরোধী অপরাধ প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করা হবে। অপরাধের ধরন ও আইনগত এখতিয়ার অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পুলিশি সহায়তা এবং আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
২০। পরিবেশ অধিদপ্তর
অবৈধ ইটভাটা, বায়ু ও শব্দদূষণ, নদী-জলাশয় দূষণ এবং পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করা হবে। পরিবেশ আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় আইনানুগ অভিযান ও ব্যবস্থা গ্রহণে প্রয়োজনীয় পুলিশি সহায়তা প্রদান করা হবে।
২১। সামাজিক বন বিভাগ
সরকারি বনভূমি দখল, অবৈধ গাছ কাটা, কাঠ পাচার এবং বনজ সম্পদ চুরি প্রতিরোধে বন বিভাগের সঙ্গে সমন্বিত নজরদারি ও অভিযান পরিচালনা করা হবে। বন কর্মকর্তাদের আইনানুগ দায়িত্ব পালনে সহযোগিতা এবং বনজ সম্পদসংক্রান্ত অপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সমন্বিত কার্যক্রমের বিষয়ে ডিআইজি’র বক্তব্য
ডিআইজি মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ বলেন, “জনসাধারণের নিরাপত্তা, সরকারি সম্পদ সংরক্ষণ এবং অপরাধ দমনে পুলিশের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সব সরকারি দপ্তরের কার্যকর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পারস্পরিক সমন্বয়, দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান এবং নিজ নিজ আইনগত এখতিয়ারের মধ্যে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের মাধ্যমে জনসেবা নিশ্চিত করতে হবে।”
তিনি রংপুর রেঞ্জের আওতাধীন সংশ্লিষ্ট পুলিশ ইউনিটগুলোকে সরকারি দপ্তরগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা, অপরাধসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ, প্রয়োজনীয় পুলিশি সহায়তা প্রদান এবং আইনানুগ কার্যক্রমে সমন্বয় অব্যাহত রাখার নির্দেশনা প্রদান করেন।