sliderস্থানিয়

সনাতনীদের প্রধান ও পবিত্র ধর্মীয় উৎসব জন্মাষ্টমী

স্বীকৃতি বিশ্বাস, যশোর: হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ও পবিত্র ধর্মীয় উৎসব হলো জন্মাষ্টমী। এটি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শুভ জন্মতিথি বা ধরা ধামে আবির্ভাব দিবস। সনাতন ধর্ম মতে, দ্বাপর যুগে ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে ও রোহিণী নক্ষত্রের শুভ সংযোগে মধ্যরাতে পাপাচার ও অধর্ম নাশ করতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অবতার হিসেবে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হন।
তিথি ও লগ্ন (জন্মাষ্টমীর পঞ্চাঙ্ক)
তিথি: ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথির রোহিণী নক্ষত্র যোগে মধ্যরাত্রির নিশীথ কাল বা লগ্নে শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব ঘটেছিল।

২০২৬ সালের শ্রীকৃষ্ণের পবিত্র জন্মাষ্টমীর বিস্তারিত তিথি, লগ্ন ও পূজার সময়সূচী নিচে দেওয়া হলো:
প্রধান তথ্য ও তিথি:তারিখ: ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ (শুক্রবার) বাংলা তারিখ: ২০ ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
অষ্টমী তিথি সূচনা: ৪ সেপ্টেম্বর ভোররাত ২:৫৫ মিনিটে। অষ্টমী তিথি সমাপ্তি: ৫ সেপ্টেম্বর রাত ১২:৪৩ মিনিটে।
পূজা ও আরাধনার শুভ সময় (লগ্ন):
নিশীথ পূজা (প্রধান পূজার মুহূর্ত): ৪ সেপ্টেম্বর রাত ১১:৩৪ মিনিট থেকে রাত ১২:২০ মিনিট (৫ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত (মোট সময়: ৪৬ মিনিট)।
রোহিণী নক্ষত্র সূচনা: ৪ সেপ্টেম্বর রাত ৯:২৫ মিনিটে।
পারণ (ব্রত ভঙ্গের সময়): ৫ সেপ্টেম্বর সকাল ৬:০২ মিনিটের পর (অষ্টমী তিথি ও রোহিণী নক্ষত্রান্তের পর)।

দ্বাপর যুগে মথুরার অত্যাচারী রাজা কংস তার বোন দেবকী ও ভগ্নিপতি বসুদেবকে কারারুদ্ধ করে। দৈববাণী হয়েছিল যে, দেবকীর অষ্টম সন্তান কংসকে বধ করবে। প্রাণভয়ে কংস দেবকীর একে একে সাতটি সন্তানকে হত্যা করে। অতঃপর ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথির এক ঘোর অমাবস্যার রাতে কারাগারে জন্ম নেন শ্রীকৃষ্ণ। শ্রীকৃষ্ণের জন্মের সাথে সাথেই প্রহরীরা অলৌকিকভাবে ঘুমিয়ে পড়ে, কারাগারের দরজা খুলে যায় এবং বসুদেবের হাতের শৃঙ্খল মুক্ত হয়। কংসের হাত থেকে রক্ষা করতে বসুদেব ভীষণ ঝড়ের রাতে যমুনা নদী পার হয়ে শিশুপুত্রকে গোকুলে নন্দরাজা ও মা যশোদার ঘরে রেখে আসেন এবং তাদের সদ্যজাত কন্যাকে মথুরায় নিয়ে আসেন। পরে গোকুলে লালিত-পালিত হয়ে শ্রীকৃষ্ণ কংস বধ করেন এবং সত্য ও ধর্মের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন।
জন্মাষ্টমীর রহস্য ও আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা
জন্মাষ্টমীর কেবল পৌরাণিক ঐতিহাসিক মূল্য নয়, গভীর আধ্যাত্মিক রহস্যও রয়েছে:

কারাগার ও অহংকার: অন্ধকার কারাগার রূপক অর্থে মানুষের অজ্ঞতা ও পার্থিব বন্ধন। আর অত্যাচারী কংস হলো মানুষের ভেতরের ‘অহংকার’ ও ‘কাম- ক্রোধের’ প্রতীক।

প্রহরীদের নিদ্রা: যখন হৃদয়ে ঈশ্বরের প্রকাশ বা ভক্তির উদয় হয়, তখন পঞ্চেন্দ্রিয় রূপী প্রহরীরা সুপ্ত হয়ে যায়, অর্থাৎ বাহ্যিক বিভ্রান্তি কমে আসে।

অষ্টমী তিথির তাৎপর্য: অষ্টমী হলো পূর্ণিমা (সম্পূর্ণ আলো) ও অমাবস্যা (সম্পূর্ণ অন্ধকার)—এ দুইয়ের মাঝামাঝি সমতা। শ্রীকৃষ্ণের জন্ম এই তিথিতে হওয়ার অর্থ তিনি দৃশ্যমান বস্তুজগত ও অদৃশ্য আত্মিক জগতের এক পরম ভারসাম্য বা লীলা রূপ।
মাহাত্ম্য ও ধর্মীয় শিক্ষা
অধর্মের বিনাশ ও ধর্মের রক্ষা: গীতার বিখ্যাত বাণী—“যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত…”। অধর্মের বাড়বাড়ন্ত হলে ঈশ্বর যুগে যুগে আবির্ভূত হন সততা ও ধর্মকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে।
ফলের আশা ছাড়া কর্ম (নিষ্কাম কর্ম): শ্রীকৃষ্ণ ভগবাদ্গীতায় শিক্ষা দিয়েছেন যে, মানুষের অধিকার কেবল কর্মে, ফলের ওপর নয়। সৎ উদ্দেশ্যে নিঃস্বার্থভাবে কাজ করাই জীবনের মূল শিক্ষা।
অন্যায় প্রতিরোধ ও সাহস: পরিস্থিতি যতই প্রতিকূল হোক না কেন, সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে লড়াই চালিয়ে যাওয়া উচিত।

ভালবাসা ও ভক্তির বার্তা: শ্রীকৃষ্ণ তার বালক লীলা ও কর্মের মাধ্যমে মানুষকে শিখিয়েছেন কীভাবে সর্বাবস্থায় আনন্দময় ও ভালোবাসাপূর্ণ জীবন যাপন করা যায়।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button