sliderস্থানিয়

কাজিপুরে ভাসমান নৌকার হাটে পাট কেনাবেচা জমজমাট

মোঃ আব্দুর রব মনসুর, সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি:বাংলাদেশের ‘সোনালি আঁশ’ পাটের গৌরব ও ঐতিহ্য এখনো ধরে রেখেছেন গ্রামবাংলার কৃষক। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও তারা পাটের আবাদে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেননি। ফলে পাটের উৎপাদন এখনো বেশ ভালো।

সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলায় যমুনা নদীর তীরে সাড়ে ১৪ হাজার হেক্টর জমিতে বর্ষা মৌসুমে পাটের ভাসমান হাট কেনাবেচায় জমজমাট হয়ে ওঠে। যমুনা নদীর বুকে বসছে এক ব্যতিক্রমী হাট। নৌকার সঙ্গে নৌকা লাগিয়ে বসানো হয়েছে এই ভাসমান হাট। এই হাটে নৌকার ওপরেই কেনাবেচা হয় হাজার হাজার মণ পাট। এখানকার ক্রেতা-বিক্রেতা সবাই হাটে আসেন নদীপথে নৌকায় চড়ে। শত বছর ধরে এমন ব্যতিক্রমী হাট বসছে সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার নাটুয়ারপাড়ায়, যমুনা নদীর তীরে।

যমুনা নদীবিধৌত কাজিপুর উপজেলার চরাঞ্চলের ৬ ইউনিয়নসহ পুরো উপজেলাতেই পাটের আবাদ হয়। চলতি মৌসুমে এ উপজেলায় ৪ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। কৃষি বিভাগ থেকে প্রণোদনা ও সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়ায় কৃষকরা বেশ ভালো ফলন পেয়েছেন। বাজারে এবার পাটের ভালো দাম থাকায় তা বিক্রি করে কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন।

স্থানীয়দের মতে, এ অঞ্চলে ব্যাপক পাটের আবাদ হওয়ার কারণে প্রায় শত বছর পূর্ব থেকেই পাট ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য কাজিপুর উপজেলার নাটুয়ারপাড়ায় যমুনা নদীর চরে এই হাটের সূচনা হয়। বিশাল যমুনার চারদিকে পানি আর পানি। এই নদী কাজিপুর উপজেলাকে দুই ভাগে ভাগ করেছে। আশপাশের মানুষ এই নদীপথে নৌকায় করে হাটে আসেন। নৌকাই এখানকার মানুষের একমাত্র বাহন। তাই নাটুয়ারপাড়া যমুনার চরে নৌকাতেই এই হাটের প্রচলন শুরু হয়। সেই থেকে এই হাট চলে আসছে। সপ্তাহে প্রতি শনিবার ও বুধবার এখানে হাট বসে। ভোরবেলা থেকে হাটে কেনাবেচা শুরু হয়ে সন্ধ্যা অবধি চলে।

এই হাটে কাজিপুর ছাড়াও পার্শ্ববর্তী জামালপুর, বগুড়া ও টাঙ্গাইল জেলা থেকে নদীপথে বিপুলসংখ্যক চাষি ও ব্যবসায়ী পাট কেনাবেচা করতে আসেন। এক নৌকা থেকে কেনা পাট সরাসরি অন্য নৌকায় তোলা সুবিধাজনক। এতে পরিবহন খরচ ও শ্রমিকের ভোগান্তি দুটোই কমে যায়।

চাষী ও হাট-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রতি হাটে গড়ে এখানে ১ থেকে ২ হাজার মণ পাট কেনাবেচা হয়। জামালপুরের সরিষাবাড়ী ও মাদারগঞ্জ, বগুড়ার সারিয়াকান্দি, ধুনট ও শেরপুর, টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর এবং কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী থেকেও বহু ব্যাপারী এখানে পাট কিনতে আসেন। ফলে চাষিরা পাটের ভালো দাম পান। কেনাকাটা শেষে ব্যাপারীরা নদীপথেই এই পাট নিয়ে গন্তব্যে চলে যান। নদীকেন্দ্রিক এই হাটকে কেন্দ্র করে স্থানীয় নৌকা মালিকদেরও আয়-রোজগার হচ্ছে।নাটুয়ারপাড়া ভাসমান পাটের হাটে বর্তমানে মান ও জাতভেদে প্রতি মণ পাট বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার টাকায়।

সরিষাবাড়ী উপজেলার পাটের ব্যাপারী আবুল হাশেম জানান, পাট কিনে এক নৌকা থেকে অন্য নৌকায় তোলা সহজ হয়। যোগাযোগের সুবিধা হয় এবং পরিবহন খরচ কম হয়। প্রতি হাটে তিনি ৪০ থেকে ৬০ মণ পাট নৌকা থেকে ক্রয় করে থাকেন।চরগিরিশের সোবহান ব্যাপারী বলেন, অন্য হাট থেকে পাট কিনে নৌকায় তোলা অসুবিধা হয়। তাই তিনি নৌকা থেকে পাট কেনেন। তিনি প্রতি হাটে ৬৯ থেকে ৭০ মণ পাট ক্রয় করেন। প্রতি বছর নদীপথে লেনদেন সহজ হওয়ায় তারা প্রতি হাটে বিপুল পরিমাণ পাট সংগ্রহ করেন।

কাজিপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শরিফুল ইসলাম জানান, এই চাষাবাদে আমরা কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে চাষিদের প্রণোদনা দেওয়াসহ মাঠপর্যায়ে সব ধরনের সহযোগিতা দিয়েছি। অনুকূল আবহাওয়া ও সময়মতো পাট কাটতে পারায় লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ফলন পাওয়া গেছে। ভালো ফলন এবং দামে চাষিরা লাভবান হয়েছেন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button