
ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি: ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলায় অষ্টম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রীকে অপহরণ ও ধর্ষণের অভিযোগ এবং পরে তার বাবার ওপর হামলা ও পঙ্গু করে দেওয়ার ঘটনায় অপমান, মানসিক নির্যাতন ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে ওই বাবা আত্মহত্যা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। আলোচিত এ মামলার প্রধান আসামি মো. সাইফুল ইসলাম (৩৫)-কে ঢাকার সাভার থেকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)।
গত ৮ আগস্ট রাতে র্যাব-১৩ ও র্যাব-৪-এর যৌথ আভিযানিক দল ঢাকার সাভার থানাধীন কাতলাপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তার সাইফুল ইসলাম ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী থানার মহিষমারী গ্রামের রফিকুল ইসলামের ছেলে।
র্যাব জানায়, ভুক্তভোগী কিশোরী স্থানীয় একটি উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী। অভিযোগ রয়েছে, একই এলাকার সাইফুল ইসলাম বেশ কিছুদিন ধরে তাকে উত্ত্যক্ত ও প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে আসছিলেন। কিশোরী সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে তাকে অপহরণের পরিকল্পনা করা হয়।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ২৫ জুন সকাল ১০টার দিকে বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে স্কুলসংলগ্ন রাস্তা থেকে আসামিরা জোরপূর্বক ওই স্কুলছাত্রীকে একটি অটোরিকশায় তুলে অপহরণ করে। পরে তাকে ঠাকুরগাঁও রোডের কাছাকাছি এলাকায় নিয়ে ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে কয়েকটি সাদা কাগজ ও স্ট্যাম্পে জোরপূর্বক স্বাক্ষর নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
পরবর্তীতে তাকে একটি অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে গিয়ে প্রধান আসামি সাইফুল ইসলাম অন্য আসামিদের সহযোগিতায় কিশোরীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে ধর্ষণ করেন বলে মামলায় অভিযোগ রয়েছে।
পরে কিশোরী কৌশলে আসামিদের কবল থেকে মুক্ত হয়ে বাড়িতে ফিরে পরিবারের সদস্যদের বিষয়টি জানায়। মেয়ের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদ জানাতে তার বাবা আবুল কাসেম আসামি সাইফুলের বাড়িতে গেলে তাকে উল্টো হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। এ সময় কিশোরীর স্বাক্ষর ব্যবহার করে বিয়ের জাল কাবিননামা তৈরি করা হয়েছে বলেও তাকে জানানো হয়। আইনি পদক্ষেপ নিলে পুরো পরিবারকে হত্যা করা হবে—এমন হুমকি দিয়ে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয় বলে এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।
এরপর গত ২ জুলাই বিকেলে বাড়ি থেকে বের হয়ে কাঁচারাস্তায় পৌঁছালে ওৎপেতে থাকা আসামিরা লোহার রড ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে আবুল কাসেমের ওপর হামলা চালায় বলে অভিযোগ। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, প্রধান আসামি সাইফুল লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে তার ডান পায়ের হাঁটু ভেঙে দেন। অপর এক আসামি পিঠ ও কোমরে মারাত্মক জখম করেন। তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লে সাইফুলের ভাই ফরহাদ ওরফে কোম্পানি (৪০) তার গলা চেপে ধরে শ্বাসরোধ করে হত্যার চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
পরিবারের অভিযোগ, মেয়ের ওপর নির্যাতন, নিজের ওপর হামলা ও পঙ্গুত্ব, আসামিদের অব্যাহত প্রাণনাশের হুমকি এবং চরম নিরাপত্তাহীনতায় আবুল কাসেম মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। পরে গত ৫ জুলাই রোববার বেলা ১১টার দিকে পরিবারের সদস্যদের অগোচরে নিজ বসতবাড়ির গোয়ালঘরে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেন তিনি।
এ ঘটনায় একই দিন ভুক্তভোগী কিশোরীর মা বাদী হয়ে বালিয়াডাঙ্গী থানায় আটজনের নাম উল্লেখ করে মামলা দায়ের করেন। মামলা (নং- ০৪) ঘটনার পর প্রধান আসামিসহ অন্য অভিযুক্তরা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে আত্মগোপনে চলে যায় বলে জানায় র্যাব।
মামলাটির গুরুত্ব বিবেচনায় অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে র্যাব-১৩ গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করে। এরই ধারাবাহিকতায় সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সিপিসি-১, র্যাব-১৩ দিনাজপুর ক্যাম্প এবং র্যাব-৪, সিপিসি-২ সাভার ক্যাম্পের একটি যৌথ আভিযানিক দল গত ৮ আগস্ট রাত ৮টা ৪৫ মিনিটে সাভারের কাতলাপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্রধান আসামি মো. সাইফুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে।
র্যাব-১৩-এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও সিনিয়র সহকারী পরিচালক (মিডিয়া) বিপ্লব কুমার গোস্বামী জানান, গ্রেপ্তার আসামিকে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, সমাজ থেকে হত্যা, অপহরণ, ধর্ষণসহ বিভিন্ন মারাত্মক অপরাধ দমনে র্যাবের নিয়মিত অভিযান অব্যাহত থাকবে।



