
মোঃ আব্দুর রব মনসুর,সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি: ঢেঁকি নিয়ে এক সময়ের জনপ্রিয় গান ও প্রবাদ রচিত হয়েছিল। যেমন “ধান ভাঙ্গিরে ঢেঁকিতে পাড় দিয়া, ঢেঁকি নাচে আমি নাচি হেলিয়া -দুলিয়া ও ধান ভাঙ্গিরে।” এই গানটি এক সময় গ্রাম বাংলার খুব জনপ্রিয় গান ছিল। একসময় ভোরের আলো ফুটতেই কিংবা গভীর রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে উপজেলার প্রায় প্রতিটি গ্রামের বাড়ি থেকে ভেসে আসত ঢেঁকির পরিচিত ‘ঢকর ঢকর’ শব্দ। উঠানের মাটিতে তাল মিলিয়ে ওঠানামা করা সেই কাঠের যন্ত্র যেন গ্রামীণ জীবনের নিজস্ব সুর বয়ে আনত। ঢেঁকিতে ধান ভানা, পিঠা তৈরির জন্য চাল গুঁড়া করা, চিড়া তৈরির আয়োজন চলত গ্রামের ঘরে ঘরে।
‘ঢকর ঢকর’ সে শব্দ ছিল পরিশ্রম, সহমর্মিতা ও পারিবারিক উষ্ণতার প্রতীক। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আজ গ্রামগুলোর এক সময়ের প্রাণচঞ্চল উঠান এখন নীরব হয়ে পড়ে আছে। ধান ভানার মিল, বিদ্যুৎচালিত মেশিন, আধুনিক রাইস মিল ঢেঁকির প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দিয়েছে। বরশীভাঙ্গা গ্রামের সালেহা বেগম স্মৃতিচারণ করে বলেন, দুই-তিন দশক আগেও ধান থেকে চাল তৈরি, চালের গুঁড়া বানানো, হলুদ, মরিচ গুঁড়া করা, চিড়া তৈরি কিংবা পিঠা প্রস্তুতি সবকিছুতেই ঢেঁকি ছিল অপরিহার্য। বিশেষ করে শীত মৌসুমে পিঠা তৈরির সময়ে বেড়ে যেত এর ব্যবহার । ঢেঁকি ছাড়া একটা দিন চিন্তা করা ছিল অসম্ভব।
মাথাইলচাপড় গ্রামের আমিনা বেগম (৬০) বলেন, ভোরে উঠেই ঢেঁকিতে ধান ভানতাম। পাশের বাড়ির নারীরাও এসে যোগ দিত। ঢেঁকির শব্দে যেন পুরো গ্রাম জেগে উঠত। তখন বাড়ির উঠানে একসঙ্গে কাজ করতেন প্রতিবেশী নারীরা। কাজের ফাঁকে গল্প, হাসি ও গান-গীত, ভাগ করে পান খাওয়া, সব মিলিয়ে তৈরি হতো প্রাণবন্ত এক পরিবেশ। নতুন প্রজন্মের অনেকেই ঢেঁকি ব্যবহারের অভিজ্ঞতা তো দূরের কথা, এটি কীভাবে কাজ করে তাও জানে না। প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে বেড়ে ওঠা শিশু-কিশোরদের কাছে ঢেঁকি এখন প্রায় অজানা এক বস্তু।
বিয়াড়া দ্বি মুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ নুরুল ইসলাম বলেন, এইতো প্রায় এক যুগ আগেও গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতে ঢেঁকি ছিল। ঢেঁকি ছাঁটা চাল খেতাম আমরা।
পলাশবাড়ী বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ ফিরোজ উদ্দিন বলেন, ঢেঁকি ছিল গ্রামীণ বাংলার জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ। ঢেঁকি শুধু অতীতের স্মৃতি নয়, এটি আমাদের শেকড়ের সঙ্গে সংযোগের প্রতীক। সেই শেকড়কে বাঁচিয়ে রাখাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আমাদের দায়। নতুন প্রজন্ম যদি এই ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত না হয়, তবে ভবিষ্যতে গ্রামীণ সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হারিয়ে যাবে।
দ্রুত কাজ সম্পন্ন করা, শ্রম সাশ্রয় ও সময় বাঁচানোর সুবিধার কারণে মানুষ এখন যান্ত্রিক পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ফলে ধীরে ধীরে উঠান থেকে সরিয়ে রাখা হয়েছে ঢেঁকি, কোথাও পড়ে আছে ভাঙা কাঠামো-অতীতের নিঃশব্দ সাক্ষী হয়ে। কাজিপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, কিছু বাড়ির পেছনে কিংবা পরিত্যক্ত কোণে পড়ে থাকা ঢেঁকির কাঠামো যেন গ্রামীণ ঐতিহ্যের বিলুপ্তির গল্প বলছে।



