
রতন ঘোষ, কটিয়াদী প্রতিনিধি : কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে ১৬ জুলাই বৃহস্পতিবার শুরু হলো সনাতন ধর্মালম্বীদের ৫শত বছরের ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রা উৎসব।
এই উপলক্ষে সকাল থেকেই বহু দূর দূরান্ত থেকে ভক্তবৃন্দ এসে জড়ো হচ্ছেন গোপীনাথজীউর মন্দিরে। তারপরেই শুরু হয় বিভিন্ন ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান। মন্দির প্রাঙ্গণে সমাগত শত শত হিন্দু মহিলাদের শঙ্খধ্বনি এবং উলুধ্বনির মাধ্যমে শুরু হয় ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান । বিকেল চারটায় শ্রী শ্রী গোপীনাথজীউর মন্দির প্রাঙ্গনে এক সংক্ষিপ্ত আলোচনা ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান শেষে ৪.৩০মিনিটে শঙ্খধ্বনি ও সমবেত শত শত হিন্দুধর্মালম্বী মহিলাদের উলুধ্বনি এবং কাসর ঘন্টা বাজিয়ে শুরু হয় রথযাত্রা। আবার ২৪ জুলাই শুক্রবার উল্টো রথ যাত্রার মাধ্যমে শেষ হবে এই রথযাত্রা উৎসব।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অপর নাম শ্রী শ্রী জগন্নাথ বা শ্রী শ্রী গোপীনাথ। কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলায় ভোগবেতাল গ্রামে অবস্থিত ইশাখাঁ ও রাজা নবরঙ্গ রায়ের স্মৃতিধন্য ঐতিহাসিক হিন্দু ধর্মীয় তীর্থস্থান শ্রী শ্রী গোপীনাথ জিউর মন্দির, যা জেলার অন্যতম প্রত্নতত্ত্ব সম্পদ। ষোড়শ শতাব্দীর প্রথমার্ধে সামন্ত রাজা নবরঙ্গ রায় এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন। রাজা স্বপ্নাদৃষ্ট হয়ে কোটামন দিঘিও বাউলসাগর নামক নদী তীর থেকে দুটি নিম কাঠের খন্ড থেকে শ্রী শ্রী গোপীনাথ, শ্রী শ্রী বলরাম ও সুভদ্রা দেবীর মূর্তি তৈরি করে এ মন্দিরে স্থাপন করেন। পরবর্তী সময়ে মন্দিরের পুন: সংস্কার করেন ঈসাখাঁ।
এলাকায় একটি কিংবদন্তি রয়েছে ঈশাখাঁ তার সৈন্যদের নিয়ে যখন এগারসিন্দু দুর্গ থেকে এই মন্দিরের উপর দিয়ে দিয়ে নিজ বাড়ি, জঙ্গলবাড়িতে যাচ্ছিলেন, সে সময় মন্দিরে পূঁজার ভোগের জন্য ভোগ রান্না হচ্ছিল। ঈশাখাঁ তখন ভোগের রান্নার গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে মন্দিরের সামনে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করেন। তখন মন্দিরের পুরোহিতের আতিথেয়তায় সন্তুষ্ট হয়ে, ঈশাখাঁ একটি তাম্র পাত্রে লিখে বহু জমি তিনি এই মন্দিরকে দান করে যান। তারপর থেকে এই অঞ্চলটি ভোগবেতাল নামে পরিচিত।
এখানে প্রতিবছর রথযাত্রা, বার্ষিক উৎসব, দোল পূর্ণিমা, জন্মাষ্টমী, শিবরাত্রি ব্রত, ঝুলন যাত্রা, বাসন্তী পূজা সহ নিত্য পূজা পার্বণ অনুষ্ঠান, অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। গোপীনাথজীউর মন্দিরের, সবচেয়ে বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান রথযাত্রা। ১৮৮৫ সালে সামন্তরাজা নবরঙ্গ রায় এই মন্দিরের প্রথম রথযাত্রা শুরু করেন। কিংবদন্তি রয়েছে, “উড়িষ্যার জগন্নাথ, বঙ্গের এই গোপীনাথ”। বলা হয় প্রাচীন বাংলার সর্ববৃহৎ রথযাত্রা ছিল শ্রী শ্রী গোপীনাথজীউর রথযাত্রা। এককালে এ রথযাত্রা উপলক্ষে এখানে ১৫ দিনব্যাপী মেলা বসত। ভাটি এলাকা ও হাওড় অঞ্চল সহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আগত নৌকা ও বজরার বহর জড়ো হতো বাউল সাগর নদীতে। সেই সময় ১০৫ ফিট উচ্চতা সম্পন্ন ৩২ চাকার রথ স্থানীয় জমিদারদের পোষা হাতি দিয়ে মন্দির থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দীর্ঘ ও আধা কিলোমিটার প্রস্থ গোপীনাথ জীউর নিজস্ব বিশাল সড়ক পথ দিয়ে টেনে নিয়ে যেত গোণ্ডিচাবাগে। আবার আট দিন পরে ফিরে আসেন নিজ বাড়িতে। এটিই বাংলাদেশের মধ্যে সবচেয়ে দূরপাল্লার বড় রথযাত্রা।
জনশ্রুতি আছে ১৫৯৫ সালে এগারসিন্দু দুর্গে ঈশাখাঁ, সম্রাট আকবরের সেনাপতি মানসিংহ কর্তৃক অবরুদ্ধ হন। সেখানে মল্ল যুদ্ধে সেনাপতি মানসিংহ, ঈশাখাঁর নিকট পরাজয় বরন করেন। সেই সময় বিজয়ী সৈন্যরা গিয়ে উল্লাস করেন এই রথ মেলার সুপ্রশস্ত্র রাস্তায়। ১৩৪২ বঙ্গাব্দের ঝড়ে এই রথটি ভেঙে পড়ে। তখন রথটি সংস্কার করে ৩২ চাকার জায়গার কালক্রমে ২৪ চাকা, পরবর্তীতে ১৬ চাকা এবং বর্তমানে সর্বশেষ ৯ চাকায় এসে ঠেকেছে। তবে বর্তমান অতীত রথ যাত্রার কিছু কারুকার্যের স্মৃতি আজও বহন করছে। এই রথের মেলায় বিভিন্ন প্রজাতির পাখির হাট বসে, যে কেউ নানা ধরনের পাখি দেখার জন্য চলে আসতে পারেন। রথ উপলক্ষে পাঁচ গ্রামের সর্বস্তরের মানুষের মাঝে উৎসবের আমেজ বিরাজ করে। এলাকার লোকজন তাদের মেয়ে ও জামাতা সহ কুটুম্বদের দাওয়াত করে বাড়িতে আনেন। যা এলাকার একটি রেওয়াজে পরিণত হয়েছে।
গোপীনাথ জিও মন্দির ট্রাস্টি কমিটির সভাপতি বিশিষ্ট শিল্পপতি (সিআইপি) স্বপন কুমার সাহা জানান, রথযাত্রা উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে লক্ষাধিক ভক্ত ও দর্শনার্থীর সমাগম হয়। আমরা এখানে স্থানীয় জনগণ ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা পেয়ে আসছি।
কিশোরগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য এডভোকেট জালাল উদ্দিন ইতিমধ্যেই শ্রী শ্রী গোপীনাথজীর মন্দির পরিদর্শন করেছেন। তিনি বলেন এই রথযাত্রা দেশের প্রাচীন ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করছে। একে আমাদের ধরে রাখতে হবে এবং এই ঐতিহ্যকে রক্ষা করতে হবে।
কটিয়াদী মডেল থানার ওসি রফিকুল ইসলাম জানান হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী এই গোপীনাথ জিউর রথযাত্রা উপলক্ষে, আইনশৃঙ্খলার জন্য যা যা করার দরকার সবই করা হয়েছে।



