শিরোনামশীর্ষ সংবাদ

২৭ চুক্তি সই ৬ প্রকল্পের উদ্বোধন

বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক কৌশলগত অংশীদারিত্বে উন্নীত

চীনের প্রধানমন্ত্রী শি জিনপিংয়ের ঢাকা সফরে দুই দেশের সম্পর্ক কৌশলগত অংশীদারিত্বে উন্নীত হয়েছে। ওয়ান বেল্ট-ওয়ান রোড উদ্যোগসহ এই সফরে ২৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর নিচ দিয়ে টানেল নির্মাণসহ ছয়টি প্রকল্পের উদ্বোধন করা হয়েছে। এসব চুক্তি ও এমওইউ’র ফলে দুই দেশের সম্পর্ক এখন নতুন উচ্চতায় উপনীত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
আজ শুক্রবার সকাল ১১টা ৪০ মিনিটে জিনপিং এয়ার চায়নার একটি বিশেষ ফ্লাইটে কম্বোডিয়ার রাজধানী নমপেন থেকে ঢাকায় পৌঁছান। তাকে বহনকারী বিমানটি বাংলাদেশের আকাশসীমায় পৌঁছালে সেটিকে স্কট করে নিয়ে আসে বিমানবাহিনীর চারটি জেট। বিমানবন্দরে চীনা প্রেসিডেন্টকে স্বাগত জানান রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ। এ সময় তাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানায় একটি শিশু। এরপর জিনপিং তিন বাহিনীর একটি চৌকস দলের দেয়া গার্ড অব অনার পরিদর্শন করেন।
বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে জিনপিং সরাসরি চলে যান এয়ারপোর্ট রোডের লা মেরিডিয়ান হোটেলে। সেখানে কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর দুপুরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে তিনি প্রথমে একান্ত এবং পরবর্তী সময়ে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন। এরপর বিভিন্ন চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান প্রত্যক্ষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে যৌথভাবে ছয়টি প্রকল্পের প্রতীকি ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করেন।
বিকেলে হোটেল লা মেরিডিয়ানে চীনের প্রেসিডেন্টের সাথে জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া আলাদাভাবে দেখা করেন। সন্ধ্যায় রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সাথে বঙ্গভবনে সাক্ষাত করেন শি জিনপিং। এরপর তার সম্মানে রাষ্ট্রপতির দেয়া নৈশভোজে যোগ দেন।
যৌথ বিবৃতি : প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকতা শেষে দুই নেতা যৌথ বিবৃতি দেন। এতে নিজেদের মধ্যকার বৈঠককে ফলপ্রসূ বলে অভিহিত করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। দুই নেতাই মনে করছেন, সই হওয়া চুক্তি ও এমওইউ’র ফলে দুই দেশের সম্পর্ক এখন নতুন উচ্চতায় উন্নীত হয়েছে।
শি জিনপিং বলেন, ‘আমি খুব খুশি ছয় বছর পর বাংলাদেশের মতো একটা সুন্দর দেশ সফর করতে পেরেছি। চীন ও বাংলাদেশ ভালো প্রতিবেশী, ভালো বন্ধু এবং ভালো অংশীদার। আমি মনে করি, এই সফর সামগ্রিকভাবে দুই দেশের অগ্রযাত্রায় বিশেষ ভূমিকা রাখবে।’
তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনা সরকারের সাথে ফলপ্রসূ বৈঠকের পর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে চুক্তি সই হয়েছে। কৌশলগত যোগাযোগের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক কীভাবে আরো উচ্চপর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যায়, সে বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে আমাদের উভয়ের স্বার্থসংশ্লিষ্ট দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক ইস্যুতে ফলপ্রসূ বৈঠক হয়েছে। আমরা ‘একচীন’ নীতির প্রতি জোরালো সমর্থন দিয়েছি। আমরা খুবই ঘনিষ্ঠভাবে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিকভাবে পারস্পরিক স্বার্থে কাজ করতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছি।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা ব্যবসায় ও বিনিয়োগ, অবকাঠামো, শিল্প, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি এবং কৃষি খাতে একযোগে কাজ করতে ঐকমত্যে পৌঁছেছি। আজ আমরা এখানে ২৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সাক্ষী হলাম। এই চুক্তিগুলো হয়েছে ব্যবসায়, বিনিয়োগ, সমুদ্র অর্থনীতি, বিসিআইএম-ইসি, সড়ক ও সেতু, রেলপথ, বিদ্যুৎ, সমুদ্র সম্পদ আহরণে সহযোগিতা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, শিল্প উৎপাদন, সক্ষমতা বৃদ্ধি ও দক্ষতার উন্নয়নসংক্রান্ত।’
শেখ হাসিনা আরো বলেন, ‘আমরা ছয়টি প্রকল্পও উদ্বোধন করেছি। এই চুক্তি ও প্রকল্পগুলো উদ্বোধনের পর দুই দেশের পারস্পরিক বোঝাপড়া উচ্চপর্যায়ে পৌঁছাবে। আজকে আমরা ঘনিষ্ঠ পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্র থেকে কৌশলগত অংশীদারত্বের পর্যায়ে উন্নীত হয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘এই কৌশলগত অংশীদারিত্বের অধীনে আমরা দুই দেশের জনগণের আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য কাজ করতে সম্মত হয়েছি। আমাদের এই প্রচেষ্টার লক্ষ্য হচ্ছে ২০২১ সালের মধ্যে জ্ঞানভিত্তিক মধ্য আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে উপনীত হওয়া। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও বঞ্চনামুক্ত হবে। আমরা বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা বাংলাদেশ গড়তে সক্ষম হব।’
পররাষ্ট্র সচিবের ব্রিফিং : বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার অংশীদারিত্বমূলক সম্পর্ক এখন কৌশলগত সম্পর্কে উন্নীত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠকের পর সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন।
পররাষ্ট্র সচিব বলেন, কৌশলগত সম্পর্কে উত্তীর্ণ হওয়ার ফলে বাংলাদেশ ও চীনের আর্থ-সামাজিক, অর্থনৈতিক ও অন্যান্য বিষয়ের ব্যাপ্তি আরও বাড়বে।
তিনি বলেন, দুই পক্ষের আলোচনার মধ্য দিয়ে পারস্পারিক সম্পর্কে নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছে। আমাদের সম্পর্ক এখন কৌশলগত সম্পর্কে পরিণত হয়েছে। এখন দুই দেশের সম্পর্ক আরও গভীর হবে এবং ব্যাপ্তি বাড়বে।
শহীদুল হক জানান, দুই নেতার উপস্থিতিতে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ২৭টি চুক্তি ও সমঝোত স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে। চুক্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে ওয়ান বেল্ট-ওয়ান রোড উদ্যোগ, অবকাঠামো, সড়ক, রেল, জলপথ, আইসিটি, তথ্য, মেরিটাইম সহযোগিতাসহ নতুন কয়েকটি ক্ষেত্রে সহযোগিতার নতুন দিক উন্মোচিত হয়েছে। চীন পাট এবং তৈরি পোশাক শিল্পে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী।
বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার : চীন দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।
তিনি বলেন, পারস্পরিক রাজনৈতিক আস্থা আরো গভীর করতে এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও বাস্তব সহযোগিতা আরো উচ্চতায় উন্নীত করতে বাংলাদেশের সাথে কাজ করতে আমরা প্রস্তুত রয়েছি। ৪১ বছরের কূটনৈতিক সম্পর্কে চীন-বাংলাদেশ বন্ধনের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রয়েছে।
দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে ঢাকা পৌঁছে চায়না ডেইলিকে দেয়া এক আগমনী বার্তায় চীনের প্রেসিডেন্ট একথা বলেন।
জিনপিং বলেন, আমি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও অন্যান্য নেতার সাথে দুই দেশের সম্পর্ক, ভবিষ্যত সহযোগিতার পথ নিয়ে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট ইস্যু এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একটি নতুন অধ্যায়ে প্রবেশের জন্য বিস্তৃত ও গভীর মতবিনিময় প্রত্যাশা করছি।
চীনের প্রেসিডেন্ট সকালে সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে ভারতের গোয়ার উদ্দেশে ঢাকা ছেড়ে যাবেন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button