sliderজাতীয়শিরোনাম

ভাষা সৈনিক আবদুল মতিনের শততম জন্মবার্ষিকী আজ

(৩ ডিসেম্বর ১৯২৬ – ৮ অক্টোবর ২০১৪)

আজ বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার অন্যতম অগ্রযাত্রার নেতা ভাষা সৈনিক আবদুল মতিনের শততম জন্মবার্ষিকী।
‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’—এই ঐতিহাসিক দাবিতে তিনি ছিলেন সংগ্রামের অগ্রভাগে। আত্মত্যাগ, সাহস ও নেতৃত্বে তিনি হয়ে ওঠেন ভাষা আন্দোলনের চিরস্মরণীয় নায়ক—ভাষা মতিন।

১৯২৬ সালের ৩ ডিসেম্বর সিরাজগঞ্জের চৌহালি উপজেলার ধুবালীয়া গ্রামে এক মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বাবা আব্দুল জলিল ও মা আমেনা খাতুন। পরিবারের প্রথম সন্তান আবদুল মতিনের ডাক নাম ছিল গেদু, পরবর্তীতে যিনি সমগ্র দেশের কাছে পরিচিত হন ‘ভাষা মতিন’ নামে।
গ্রামের বাড়ি যমুনায় ভেঙে গেলে পরিবার দার্জিলিংয়ে চলে যায়। সেখানেই শুরু হয় তার শিক্ষাজীবন—মহারাণী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়,পরে দার্জিলিং গভর্নমেন্ট হাই স্কুলে পড়াশোনা।
১৯৪৩ সালে এনট্রান্স (এসএসসি), ১৯৪৫ সালে এইচএসসি পাস করে ভর্তি হন রাজশাহী গভর্নমেন্ট কলেজে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ আর্মিতে কমিশন পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন তিনি।
পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ১৯৪৭ সালে বি.এ. সম্পন্ন করেন এবং ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন্সে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন।

ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব-
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে আবদুল মতিন ছিলেন ছাত্রসমাজের অন্যতম প্রধান নেতা।
• তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক
• ২১ ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক কলাভবনের ছাত্রসভায় সভাপতিত্ব করেন
• তাঁর নেতৃত্বেই সিদ্ধান্ত হয় ১৪৪ ধারা ভেঙে বাংলার অধিকার আদায়ের পথে নামার।
তার দৃঢ় নেতৃত্ব, সাহসিকতা ও কর্মসূচির ফলে ভাষা আন্দোলন সর্বজনীন রূপ পায়। এই ভূমিকার কারণেই পঞ্চাশের দশক থেকে তিনি পরিচিত হন ‘ভাষা মতিন’ নামে।
ভাষা আন্দোলনের পর তিনি ছাত্র ইউনিয়ন গঠনে নেতৃত্ব দেন এবং সংগঠনটির সভাপতি হন।
পরবর্তীতে কমিউনিস্ট আন্দোলনে যুক্ত হন, মওলানা ভাসানীর ন্যাপে যোগ দেন এবং ১৯৯২ সালে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
স্বাধীনতা যুদ্ধেও তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।
স্বাধীনতার পর আধিপত্যবাদ-বিরোধী অবস্থান ও মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা বাস্তবায়নে কাজ করে যান সারাজীবন।
সংগ্রামের পাশাপাশি তিনি লিখেছেন চিন্তা-চেতনায় সমৃদ্ধ কয়েকটি গ্রন্থ-
• জীবন পথের বাঁকে বাঁকে
• গণচীনের উৎপাদন ব্যবস্থা ও দায়িত্ব প্রথা
তাঁর লেখায় প্রতিফলিত হয়েছে বিপ্লবী মনন, সমাজচিন্তা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি।
ভাষা আন্দোলনে অসাধারণ অবদানের জন্য তিনি ২০০১ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন—যা তাঁর জীবনসংগ্রামের প্রতি জাতির গভীর শ্রদ্ধার প্রতীক।
২০১৪ সালের ৮ অক্টোবর বিএসএমএমইউ-তে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর পর নিজের চক্ষু ও দেহ দান করে মানবতার প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে অমর, বাংলা মাতৃভাষার অভিভাবক, সাহসী বিপ্লবী—ভাষা সৈনিক আবদুল মতিন—
তাঁর শততম জন্মবার্ষিকীতে বিনম্র শ্রদ্ধা।
তাঁর জীবন, সংগ্রাম ও আদর্শ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পথ দেখাবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button