Uncategorized

মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত একজন শামীম আহমেদ….

পরিচয়হীন মানসিক রোগীদের পূণর্বাসন করাই যার নেশা

আব্দুর রাজ্জাক, মানিকগঞ্জ: ঢাকা-আরিচা সড়কের মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার পুখুরিয়া বাসস্ট্যান্ড। যাত্রী ছাউনিতে প্রায় দুই বছর ধরে অবস্থান করছে মানসিক ভারসাম্যহীন এক তরুণী। খেতে না পেয়ে অপুষ্টিতে ভোগা ওই তরুণীর শারীরিক অবস্থা সংকটাপন্ন। কেউ জানতে চাইলে খুব অস্পষ্ট স্বরে নিজের নামটি বলতেন, পারুলী। গ্রামের বাড়ি যশোর। এর বেশি আর কিছু তিনি মনে করতে পারেন না। পরিবার-পরিজনের কোনো হদিস তিনি দিতে পারেন না। কেউ কিছু দিলে খান, না হলে উপোস দিনই কাটে। তাঁকে যিনি দেখেন তিনিই আফসোস করেন।
কিন্তু আসল কাজটি করলেন শামিম আহমেদ নামের এক মহৎ ব্যক্তি। সেই পারুলকে মমতার হাত বাড়ালেন তিনি। তাঁকে সুস্থ করে স্বাভাবিক জীবন ও স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব নিলেন যমুনা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ অফিসার শামীম আহমেদ। গত শনিবার সকালে ঘিওরে অ্যাম্বুলেন্স থেকে নেমে নতুন শাড়ি নিয়ে যাত্রীছাউনিতে থাকা পারুলের কাছে যান শামীম ও তাঁর বন্ধু আলী সাব্বিরসহ কয়েকজন। গায়ে নতুন শাড়ি জড়িয়ে উচ্ছল হয়ে উঠেন পারুল। সেখানে থেকে তাঁকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আগেই যোগাযোগ করে রেখেছিলেন শামীম। তাই শনিবারই জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে দ্রুত ভর্তি-প্রক্রিয়া শেষ হয়। পারুলীর ঠিকানা এখন এখানেই। এবার শামীমের এই মহৎকাজের সঙ্গী হয়েছেন তার সহকর্মী আলী সাব্বির, ফেসবুক বন্ধু ডা: শামীম হোসেন, পুলিশের এএসআই সাজিদুর রহমান, আব্দুল মালেকসহ কয়েজন।

Ghior pic 2
কেবল পারুলই নয়, শামিম আহমেদের মানবিকতায় এর আগেও মানসিক ভারসাম্যহীন আরও দুই নারীকে মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ভর্তি করিয়েছিলেন শামীম। এখন তাঁরা সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন। ফিরেছেন স্বজনদের কাছে। তাঁদের একজন নোয়াখালীর মাইজদী উপজেলার লক্ষ্মীনারায়ণপুর গ্রামের রিকশাচালক আলাউদ্দিনের মেয়ে জবা। অন্যজন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার দাওরিয়া গ্রামের সতীর্থ সরকারের মেয়ে শিউলী রানী সরকার। জবাকে ঢাকা থেকে আর শিউলী রানীকে বান্দরবানের থানচি থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল।
ঢাকায় একটি ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ নির্বাহী কর্মকর্তা শামিম আহমেদ বললেন জবা ও শিউলী রানীকে সুস্থ করে তাঁদের পরিজনদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাহিনী। গত বছর তিনি অফিসে যাওয়ার পথে পল্টন মোড়ে মানসিক প্রতিবন্ধী তরুণী জবাকে দেখতে পান ছেঁড়া কাপড়ে জড়ানো অবস্থায়। প্রথম দিন তিনি জবাকে খাবার কিনে দেন। অফিসে গিয়ে সহকর্মী আলী সাব্বিরের সঙ্গে আলাপ করে সিদ্ধান্ত নেন, জবাকে চিকিৎসা করাবেন। যোগাযোগ করেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তাদের সঙ্গে। তাঁরাও ইতিবাচক সাড়া দেন। শেষে পল্টন পুলিশের সহায়তায় গত বছরের জুলাই মাসে জবাকে সেখানে ভর্তি করেন। তখনো জবার পরিচয় জানা ছিল না। শামিম আহমেদের দেওয়া আদুরী নামেই তাঁকে ভর্তি করে মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট। কয়েক দিনের চিকিৎসাতেই অনেকটা স্বাভাবিকতা আসে জবার মধ্যে। তাঁর কিছু কিছু কথার সূত্র ধরে ফেসবুক ও পোস্টারিংয়ের মাধ্যমে খুঁজে পাওয়া যায় জবার বাবাকে।
বান্দরবানের থানচিতে বেড়াতে গিয়ে শামিম আহমেদ একটা গাছের নিচে মানসিক প্রতিবন্ধী তরুণী শিউলীকে দেখতে পেয়েছিলেন বিপর্যস্ত অবস্থায়। শিউলীকে তিনি অন্তরা নামে ভর্তি করেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে। একইভাবে বান্দরবানে পোস্টারিং করেন। পরে খুঁজে পাওয়া যায় শিউলীর আত্মীয়স্বজনকে।
শামিম পারুলীর খবর পান এক পরিচিতজনের মাধ্যমে। খবর পেয়েই পারুলীকে দেখতে গত সপ্তাহে তিনি বন্ধু সাব্বিরকে নিয়ে ছুটে আসেন ঘিওর উপজেলার পখুুরিয়া বাসস্ট্যান্ডে। সিদ্ধান্ত নেন পারুলীকেও চিকিৎসা করাবেন। ঘিওর থানার অনুমতি নিয়ে পারুলীকে উদ্ধার করে মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে ভর্তি করান। মানিকগঞ্জের পশ্চিম সাহিলী একতা সমাজকল্যাণ সংস্থা নামের একটি প্রতিষ্ঠান অ্যাম্বুল্যান্স ভাড়া করে দিয়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়।
পারুলীর ডেরায় (যাত্রী ছাউনি) শামিম আহম্দে ও তাঁর বন্ধুরা পৌঁছার পর এক নয়ন জুড়ানো দৃশ্যের অবতারণা হয়। শামিম পরম মমতায় জড়িয়ে ধরেন পারুলীকে। উপহার দেন একটি নতুন শাড়ি। পারুলীও বায়না ধরে ব্লাউজ, পাউডার আর সুগন্ধির। ব্লাউজের বায়না পূরণ করতে না পারলেও সঙ্গে সঙ্গে কিনে আনা হয় পাউডার আর সুগন্ধি। উপহার পেয়ে পারুলীর হতক্লিষ্ট মুখ ভরে উঠে আনন্দের হাসির ফোয়ারায়।
পারুলীকে নিয়ে ঢাকায় যাত্রা করার আগে স্থানীয় সাংবাদিকদের মানসিক ভারসাম্যহীন অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর এই নেশায় বিভোর শামিম আহমেদ বলেন, ‘একজন মানুষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি মাত্র।’ তিনি মনে করেন, যার যার অবস্থান থেকে প্রতিটি মানুষকেই হতে হবে মানবিক। তা হলেই সমাজে শান্তি ফিরে আসবে। জানা যায়, নিজের বেতনের টাকার কিছু অংশ বাঁচিয়ে এই কাজ করছেন শামীম আহমেদ। তিনি বলেন, সমাজ যাদের অবহেলা-অবজ্ঞা করছে তাদের মুখে হাসি ফোটানোর যে কি আনন্দ তা ভাষায় বোঝানো যাবে না। তিনি আশা করেন, তাকে দেখে সমাজের অন্যরাও যেন মানসিক ভারসাম্যহীনদের সাহায্যে এগিয়ে আসেন। তাদের পাশে দাঁড়ান। শামীম আহমেদের স্বপ্ন ভবিষ্যতে একটি মানসিক হাসপাতাল গড়ে তোলার। যেখানে নাম-পরিচয়হীন মানসিক রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসহ পূণর্বাসন করা হবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button