
রতন বালো, পায়রা বন্দর( কলাপাড়া) থেকে: পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়ায় রামনাবাদ চ্যানেলে নির্মিতব্য দেশের তৃতীয় সমুদ্রবন্দর পায়রা বন্দরে পণ্য খালাসের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পায়রা সমুদ্রবন্দর চালু হওয়ায় বরিশাল, পটুয়াখালি এবং ভোলাসহ গোটা দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নে নতুন দিগন্ত সৃষ্টি হয়েছে।
শনিবার বেলা সাড়ে ১২টায় গণভবনে ভিডিও কনফারেন্সে জাহাজ থেকে পণ্য খালাসের মাধ্যমে পায়রা সমুদ্রবন্দরের অপারেশন কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’র উদ্বোধন করেন। এর পরই পায়রা সমুদ্রবন্দরে প্রথম পর্যায়ে জাহাজ থেকে মালামাল খালাস শুরু করা হয়।
২৫ হাজার কোটি টাকা ব্যায়ে এ বন্দর প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে ইপিজেড, জাহাজ নির্মাণসহ নতুন নতুন শিল্প এলাকা গড়ে ওঠার সুবাদে বরিশাল, পটুয়াখালীর কলাপাড়া, বরগুনা, কুয়াকাটা,কলাপাড়া, লালুয়া, রামনাবাদসহ পায়রা বন্দর এলাকার ২০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে এবং আর্থ সামাজিক অবস্থার অভূতপূর্ব উন্নয়ন ঘটবে।এদিকে পায়রা বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম চালু করাকে কেন্দ্র গোটা পায়রা বন্দর এলাকা ঘিরে এক বর্ণিলসাজে সাজানো হয়েছে। বিশেষ করে কলাপাড়া, রামনাবাদ সহ আশপাশ এলাকার মানুষের মধ্যে এক উৎসাহ-উদ্দীপনা বিরাজ করছে। সবমিলে পায়রা বন্দর এলাকায় এখন সাজ সাজ রব। আজ পায়রা বন্দর এলাকা সরজমিনে এসব চিত্র পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, এ বন্দরে তৈরী হচ্ছে কন্টেইনার, বাল্কহেড, সাধারণ কার্গো, এলএনজি, পেট্রোলিয়াম ও যাত্রী টার্মিনাল। সেই সাথে অর্থনৈতিক অঞ্চল, তৈরি পোশাক, ঔষধশিল্প, সিমেন্ট, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মৎস্য প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল, সার কারখানা, তৈল শোধনাগার ও জাহাজ নির্মাণশিল্পসহ আরো অনেক শিল্প কারখানা গড়ে তোলা সম্ভাব হবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় স্বপ্নের এই সমুদ্র্রবন্দর নির্মিত হচ্ছে। এরই মধ্যে এ বন্দরে পণ্যবাহী বিদেশী জাহাজ আসতে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে চীন থেকে পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য ৫৩ হাজার মেট্রিক টন পাথর নিয়ে পায়রা বন্দর বহিঃনোঙরে হিরণ পয়েন্টে চীনা জাহাজ এফভি ফরচুন বার্ড পৌঁছায় গত ১ আগস্ট। ওইদিন পরীক্ষামূলকভাবে বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে পণ্য খালাস করার কথা ছিল। কিন্তু দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে তা স্থগিত করা হয়। গতকাল থেকে পণ্য খালাস শুরু হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের সময় নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান এবং পায়রা বন্দরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ক্যাপ্টেন মোঃ সাইদুর রহমান কলাপাড়াস্থ পায়রা বন্দরে উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মেজর (অব:) রফিকুল ইসলাম (অব:) বীর উত্তম, নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল নিজামউদ্দিন আহমেদ, সংসদ সদস্য মোঃ মাহবুবুর রহমান, এনবিআর-এর চেয়ারম্যান মোঃ নজিবুর রহমান এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব আবদুল মালেকও উপস্থিত ছিলেন।
নৌ-মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, পায়রা সমুদ্রবন্দরের এই মেগা প্রকল্পটি স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি, দীর্ঘমেয়াদি তিন ভাগে নির্মাণ করা হচ্ছে। স্বল্পমেয়াদির শেষ পর্যায়ের কার্যক্রম দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। একই সঙ্গে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদির কার্যক্রমও চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
ইতোমধ্যে নির্মিতব্য পায়রা সমুদ্রবন্দরে টাওয়ার, লাইট, বয়া স্থাপনসহ অন্য কার্যক্রম শেষ করা হয়েছে। এসব কাজের জন্য ইতোমধ্যে ১৬ একর জমি অধিগ্রহণ ও ভরাটের কার্যক্রমও শেষ হয়েছে। একটি জেটি নির্মাণ ও বসানো হয়েছে দুটি শক্তিশালী ক্রেন। এই জেটির সঙ্গে একটি সংযোগ সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। তবে দেশের তৃতীয় এই সমুদ্রবন্দরের কাজ পুরোপুরি প্রস্তুত করে কাযক্রম শুরু হবে ২০১৮ সালে।
পায়রা সমুদ্রবন্দর নির্মাণের জন্য মোট ছয় হাজার একর জমি অধিগ্রহণ করা হবে। আর এই জমি অধিগ্রহণ করার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পায়রা বন্দরে জাহাজ নোঙর করতে মোট ১৬টি জেটি নির্মাণ করা হবে। এছাড়া বড় বড় জাহাজ বন্দরে প্রবেশ করার জন্য ড্রেজিংয়ের কার্যক্রম আগামী বছর থেকে শুরু করা হবে।
রামনাবাদ নদীবন্দরকে ভাঙনের কবল থেকে রক্ষা করতে প্রায় এক হাজার মিটার নদীরক্ষা বাঁধ নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। বন্দরে নির্বিঘেœ রাতেও কর্ম সম্পাদনের জন্য ৭০টি সৌরবিদ্যুৎ স্ট্রিট লাইট স্থাপন করা হয়েছে। বসানো হয়েছে সিগন্যাল বাতি। আপাতত পণ্যবাহী জাহাজ সমুদ্রে নোঙর করবে। বন্দরে ভারী যন্ত্রপাতি পরিচালনার জন্য ক্রয় করা হয়েছে দুটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন জেনারেটর। বন্দরের নিরাপত্তার জন্য সেন্ট্রি পোস্টসহ নিরাপত্তা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া কলাপাড়ার ধানখালীতে নির্মাণ করা হচ্ছে ১৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র।
এ ব্যাপারে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. সাঈদুর রহমান জানান, ২০১৩ সালের ১৯ নভেম্বর পায়রা বন্দরের নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই মেগা প্রজেক্টটির কার্যক্রম তিন ভাগ করা হয়েছে। স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি। স্বল্পমেয়াদির শেষ পর্যায়ের কার্যক্রম দ্রুতগতিতে চলছে। একই সঙ্গে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদির কার্যক্রমও চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
বন্দর সূত্র জানায়, আউটার অ্যাঙ্করেজ থেকে রামনাবাদ চ্যানেলে প্রবেশের পথে পানির সর্বনিম্ন গভীরতা প্রায় পাঁচ মিটার। চ্যানেলের ভেতর এই গভীরতা ১৬ থেকে ২১ মিটার। চ্যানেলের ৩৫ কিলোমিটার এলাকায় ড্রেজিং করা হলে জোয়ারের সময় ১৪ মিটার গভীর (চট্টগ্রামে আসে সর্বোচ্চ ৯ দশমিক ২ মিটার) এবং ২৫০ মিটার দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট জাহাজ (চট্টগ্রামে আসে সর্বোচ্চ ১৮৬ মিটার) এখানে আসতে পারবে। মাদার ভ্যাসেলকে বহির্নোঙরে রেখে লাইটার জাহাজে এই বন্দর দিয়ে পণ্য ওঠানামা করা যাবে। বন্দর এলাকা এক্সক্লুসিভ জোনে পরিণত হবে।

এছাড়াও নৌবাহিনীকে আধুনিক ও ত্রিমাত্রিক বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে শীঘ্রই সাবমেরিন সংযোজিত হতে যাচ্ছে। দেশের তৃতীয় সমুদ্রবন্দরের পাশে স্থাপিত এই স্বয়ংসম্পূর্ণ ও আধুনিক নৌ-ঘাঁটিতে নৌ-কমান্ডো, অ্যাভিয়েশন, জাহাজ ও সাবমেরিন বার্থিং সুবিধা থাকবে। ছয় হাজার একর জায়গার ওপর গড়ে উঠবে সমগ্র পায়রা সমুদ্রবন্দর। বিপুল পরিমাণ ব্যবহারযোগ্য জায়গা পড়ে আছে পটুয়াখালির কলাপাড়ায়। এসব এলাকায় সরকারি এবং বেসরকারি কনটেইনার ডিপো, শিল্প এলাকা, ইপিজেড, আইজেড ইত্যাদি গড়ে তোলা সম্ভব। এ বন্দরকে ঘিরে সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনা রয়েছে।
নৌ-মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, নিরাপদে জাহাজ চলাচলের জন্য বঙ্গোপসাগর থেকে পায়রা বন্দর পর্যন্ত প্রায় ২৫ মাইল নৌপথে একটি ফেয়ারওয়ে বয়া নির্মাণকাজ শুরু হবে। এছাড়া কালীগঞ্জ থেকে বন্দর পর্যন্ত অ্যাপ্রোচ চ্যানেল বয়া নির্মাণসহ মধ্য সাগরে জাহাজ নোঙরের জন্য মুরিং বয়া নির্মাণ, জরুরি প্রয়োজনে জাহাজের নাবিকরা যাতে বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে এজন্য ভিএইচএফ যোগাযোগ সুবিধা সংবলিত একটি কেন্দ্রীয় স্থাপনা ও লাইট হাউস নির্মাণকাজ চলছে।
পায়রা বন্দর এলাকার সীমানা নির্ধারণ ইতোমধ্যে চূড়ান্ত হয়েছে। কর অঞ্চল নির্ধারণের কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। রামনাবাদ মোহনা থেকে কাজল, তেঁতুলিয়া নদী হয়ে কালীগঞ্জ পর্যন্ত সমুদ্রের (নৌপথের) গভীরতা যাচাইয়ের কাজ প্রায় শেষ হয়েছে। অধিকাংশ রুটের গভীরতা সাত থেকে ১৫ মিটার।
তবে চালিতাবুনিয়াসহ কয়েকটি এলাকায় খনন কাজ করতে হবে। পায়রা বন্দর থেকে কুয়াকাটাগামী মহাসড়কের রজপাড়া পর্যন্ত চার লেনের মূল সংযোগ সড়ক নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। এ বছরের মধ্যে এ সড়কের নির্মাণকাজ শুরু হবে। এজন্য মাটি ভরাটের কাজ চলছে। তাই পায়রা বন্দর এলাকার মালামাল রাখার জন্য গুদাম নির্মাণ, নদীপথে ড্রেজিং, নিরাপত্তা যন্ত্রপাতি ক্রয়, পাইলট বোট, টাগ বোট এবং অন্যান্য সরঞ্জামের জন্য সাড়ে আটশ’ কোটি টাকা চেয়ে উন্নয়ন প্রস্তাবনা পাঠিয়েছে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ।




