বন্যায় মানবিক বিপর্যয় : টিকে থাকার লড়াইয়ে ঘিওরের ২০ হাজার পরিবার

আব্দুর রাজ্জাক, মানিকগঞ্জ: কারো ঘরে বুক পানি, কারো ঘরে হাঁটু পানি। চারিদিকে শুধু পানি আর পানি। সপ্তাহখানেক আগে মাঝ রাতে হু হু করে ঢুকে পড়ে বন্যার পানি। এতে প্লাবিত হয়েছে মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলা। বর্তমানে বন্যার পানি কিছুটা কমতে শুরু করলেও ভোগান্তি আর জৈবিক কার্যাদীর কষ্ট বেড়ে গেছে বহু গুণে। অনেইে অর্ধাহারে করছে মানবেতর জীবন যাপন। কর্মচঞ্চল খেটে খাওয়া মানুষগুলো হয়ে পরেছে বেকার। তলিয়ে যাওয়া ফসলী জমি আর অর্ধ নিমজ্জিত বাড়ি ঘরের দিকে উদাস নয়নে তাকিয়ে আছে ফ্যালফ্যাল করে।
বন্যার পানিতে ঘিওর উপজেলার বড়টিয়া গ্রামের লাল চান নামের দুই বছরের একটি শিশু মারা যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এই শিশুর মরদেহ সমাধিস্থ করতে শুকনো জায়গা পেতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে স্বজনদের। বন্যায় জেলার সাত হাজার ৪০০ হেক্টর জমির ফসলের ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়াও বন্যার পানিতে ভেসে গেছে উপজেলার অর্ধশত পুকুরে চাষকৃত বেশ কয়েক কোটি টাকার মাছ। জেলার বন্যাকবলিত এলাকায় এ পর্যন্ত ৭৫ মেট্রিক টন চাল, নগদ সাত লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, যা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। জেলা প্রশাসক রাশিদা ফেরদৌস আরো পাঁচশ মেট্রিক টন চাল, ২০ লাখ টাকা ও ২০০ বান্ডিল ঢেউটিন বরাদ্দের জন্য চাহিদাপত্র পাঠিয়েছেন বলে জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে।

এরই মধ্যে পানি উঠে বন্ধ হয়ে গেছে ঘিওরের সাথে ৫টি ইউনিয়নের মধ্যে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা। বানিয়াজুরী, ঘিওর সদর, বালিয়াখোড়া, সিংজুরী, বড়টিয়া, নালী ও পয়লা ইউনিয়নের অভ্যন্তরিণ রাস্তা-ঘাট, দোকানপাট, কাঁচা বাড়ি, গাছপালার ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। এখানে এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি যেতে কলার ভেলা, নৌকা ও বাঁশের সাঁকো ছাড়া বিকল্প নেই। সড়ক, স্থানীয় ইউপি পরিষদ, বাঁধ ও স্কুলে আশ্রয় নিয়েছেন বন্যা কবলিত মানুষ। সেই সঙ্গে একই ছাউনিতে আশ্রয় মিলেছে ভেড়া, গরু ও ছাগলের। গবাদী পশু নিয়ে বেকায়দায় পরেছে কৃষকেরা। মাথার ওপরে পলিথিনের ছাউনী, ভেজা স্যাতঁস্যাতে মাটিতে রাস্তায় চট বিছিয়ে শুইয়ে আছে শিশু, বৃদ্ধ। বাড়িঘরে পানি ওঠায় কারো ভিজে গেছে কাঁথা-কাপড়, বিছানা। শিক্ষার্থীদের বইও ভিজে একাকার। সামনেই পরীক্ষা; লেখাপড়া বিঘœ হচ্ছে মারাত্মকভবে।

বানিয়াজুরী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আবুল কাসেম চতু জানান, তার প্রায় পুরো ইউনিয়নই বন্যা কবলিত। অনেক রাস্তা-ঘাট ভেঙ্গে গেছে পানিতে। এছাড়াও এ ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি স্থানে কালীগঙ্গা নদীর ভাঙনের কবলে পরেছে।
সরজমিন আজ বৃহস্পতিবার, ঘিওরের রাধাকান্তপুর ও দ্বিমুখা এলাকায় বুক সমান পানি পার হয়ে ভেজা মালপত্র রাস্তায় এনে শুকোতে দেখা গেলো বেশ কয়েকজন নারী-পুরুষকে। রান্নাটাও চলছে নৌকায়, উঁচু চালে কিংবা রাস্তাতেই। এরই মধ্যে থেমে থেমে বৃষ্টি যোগ করছে ভোগান্তির নয়া মাত্রা। সবমিলিয়ে ঘিওরের ২০ হাজার পরিবার নাওয়া, খাওয়া, টয়লেট বা ঘুমানোর যে কতটা মানবিক কষ্ট অতিক্রম করছে, তা চোখে না দেখলে বোঝা মুশকিল।



