slider

নেত্রকোণায় বাবার হত্যাকারীরা ৩বছরেও গ্রেপ্তার না হওয়ায় আতংকে তিন কন্যা

মেহেদী হাসান আকন্দ: ২০২০ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারী দিবাগত রাতে নেত্রকোণার বারহাট্টা উপজেলার রাম জীবনপুর গ্রামের মাহবুর হত্যাকান্ডের তিনবছর অতিক্রম হলেও হত্যাকারীরা গ্রেপ্তার না হওয়ায় মৃত মাহবুরের তিন কন্যা প্রতিনিয়িত চরম আতংকে দিন কাটাচ্ছে।

হত্যাকান্ডের ঘটনায় মৃত মাহবুরের স্ত্রী স্বর্ণা আক্তার ও স্বর্ণা আক্তারের পরোকীয়া প্রেমিক একই গ্রামের আলেক চানের পুত্র সাজিদুর রহমান ওরফে নওয়াব আলীসহ অজ্ঞাতনামা ২/৩ জনকে আসামী করে মৃত মাহবুবের বোন বাদী হয়ে ২৮ ফেব্রুয়ারী বারহাট্টা থানায় ৩৫ নং মামলা দায়ের করেন। এ ঘটনায় প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বর্ণা আক্তার হত্যাকান্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে ২৯ ফেব্রুয়ারী বিজ্ঞ জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী প্রদান করেন। হত্যাকান্ডে সরাসরি জড়িত একই গ্রামের আলেক চানের পুত্র সাজিদুর রহমান ওরফে নওয়াব আলীসহ অজ্ঞাতনামা আরেকজনের জড়িত থাকার কথা তিনি স্বীকার করেন।

দীর্ঘ তদন্ত শেষে পুলিশ ২০২২ সালের ৮ মার্চ এজাহার নামীয় গ্রেপ্তারকৃত আসামী স্বর্ণা আক্তার ও পলাতক আসামী আলেক চানের পুত্র সাজিদুর রহমান ওরফে নওয়াব আলীর বিরুদ্ধে দন্ড বিধি ৩০২/৩৪ ধারায় বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। অজ্ঞাতনামা আসামীর স্বনির্ভর তথ্য পাওয়া যায়নি মর্মে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়।

এজাহার নামীয় গ্রেপ্তারকৃত আসামী স্বর্ণা আক্তারের ফৌজদারী কার্যবিধি ১৬৪ ধারায় আদালতে দেওয়া দোষ স্বীকারোক্তি মূলক জবানবন্দী অনুযায়ী পলাতক আসামী গ্রেপ্তার ও অজ্ঞাতনামা আসামী সনাক্ত ও গ্রেপ্তার না করে হত্যাকান্ডের রহস্য উদঘাটন ছাড়াই মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করায় বাদী পক্ষের ২০২২ সালের ২২ মার্চের আবেদনের প্রেক্ষিতে বিজ্ঞ আদালত পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিজেশন (পিবিআই) নেত্রকোণাকে মামলাটি তদন্তের নির্দেশ দেন।

মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিজেশন (পিবিআই) নেত্রকোণার সাব ইনস্পেক্টর (এস আই) এনামুল হক সাগর বলেন, মামলার পলাতক আসামী সাজিদুর রহমান ওরফে নওয়াব আলীকে গ্রেপ্তারে চেষ্টা চলছে এবং অজ্ঞাতনামা আসামী সনাক্তকরণে যাচাই-বাচাই করা হচ্ছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে মামলা অভিযোগপত্র আদালতে প্রেরণ করা হবে।

মামলা সূত্রে জানা যায়, বারহাট্টা উপজেলার রাম জীবনপুর গ্রামের মৃত নুরুজ্জামানের স্ত্রী জমিলা আক্তারের কোনো সন্তানাদি না থাকায় বাদী সালেহার ভাই মাহবুরকে ২২ দিন বয়সে দত্তক নেন। ঘটনার প্রায় ১৫ বছর পূর্বে মামলার ১নম্বর আসামী স্বর্ণা আক্তার মাহবুরের সাথে পারিবারিকভাবে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। বিবাহের পর তাদের ঔরশে তিনটি মেয়ে- মাহি আক্তার, মুন আক্তার ও মীম আক্তার জন্ম গ্রহন করে। সাংসারিক প্রয়োজনে ও জীবিকার তাগিদে বাদীর ভাই মাহবুর বিদেশ যায়। বিদেশে উপার্জিত অর্থ মাহবুর স্ত্রী স্বর্ণা আক্তারের নিকট প্রেরণ করেন। স্বর্ণা আক্তার স্বামীর অনুপস্থিতিতে প্রতিবেশী আলেক চানের পুত্র সাজিদুর রহমান ওরফে নওয়াব আলীর সাথে পরোকিয়া প্রেমে জড়িয়ে পড়ে এবং বিদেশ থেকে স্বামীর পাঠানো টাকা নওয়াব আলীর সাথে ব্যবসায়ীক কাজে লেন-দেন করে। স্ত্রী স্বর্ণা আক্তার ও নওয়াব আলীর পরোকীয়া প্রেমের ঘটনা জানাজানি হলে মাহবুর দেশে ফিরে আসেন।

এজাহার নামীয় গ্রেপ্তারকৃত আসামী স্বর্ণা আক্তারের ফৌজদারী কার্যবিধি ১৬৪ ধারায় আদালতে দেওয়া দোষ স্বীকারোক্তি মূলক জবানবন্দী অনুযায়ী জানা যায়, স্বর্ণা আক্তার ও নওয়াব আলী অজ্ঞাতনামা অপর আসামীকে নিয়ে পূর্ব পরিকল্পিত ভাবে মাহবুরকে হত্যা করেছে।

মামলার বাদী সালেহা আক্তার জানান, জীবিকার তাগিদে তিনি ঢাকায় থাকেন। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অফিসার ফোন করে মামলার বিষয়ে জানতে চায়, দেখা করতে বলে। তাদের সাথে দেখা করি। আমার ভাইয়ের হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার এবং অজ্ঞাত আসামীকে সনাক্ত না করেই অভিযোগ পত্র দাখিল করায় আদালতে অভিযোগ পত্রের বিরুদ্ধে নারাজী দিয়েছিলাম। বর্তমানে মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিজেশন (পিবিআই) তদন্ত করছে। প্রায় এক বছর ধরে পিবিআই তদন্ত করলেও তেমন কোন অগ্রগতি দেখছি না।

মৃত মাহবুরের মা বিধবা জমিলা আক্তার জানান, নিজের সন্তানাদি না থাকায় ভবিষ্যতের সুখের আশায় ২২ দিনের মাহবুরকে দত্তক এনে বড় করলাম, বিয়ে করালাম, নিজের জমি বিক্রি করে বিদেশ পাঠালাম। নিজের কোনো কৃষি জমি না থাকায় আজ সুখের পরিবর্তে মাহবুরের তিন এতিম মেয়েকে নিয়ে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাতে হচ্ছে।

মাহবুরের বড় মেয়ে মাহী আক্তার বলেন, পরিবারে কোনো পুরুষ মানুষ না থাকায় প্রয়োজনীয় কাজে তাকেই বাহিরে যেতে হয়। দাদীর ডায়েবেটিক্স এবং মেঝ বোন হার্টের সমস্যায় প্রায় অসুস্থ থাকে তাদের ঔষধ ক্রয় ও সাংসারিক প্রয়োজন মেটানো একদিকে হিমসীম খেতে হচ্ছে অন্যদিকে বাবার হত্যাকারীরা গ্রেপ্তার না হওয়ায় প্রতিনিয়ত আতংকের মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button