sliderবিবিধশিরোনাম

সর্বকনিষ্ঠ ভাষা শহীদ অর্ধশতাব্দী ছিল বাঙালির স্মৃতির অন্তরালে

শহীদ অহিউল্লাহ

শেখ আসাদ : ৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে নিহত পুরান ঢাকার ঢাকাইয়া সন্তান, ইতিহাসের পাতায় অজানা একটি নাম শহীদ অহিউল্লাহ। সর্বকনিষ্ঠ ভাষা শহীদ অর্ধশতাব্দী ছিল বাঙালির স্মৃতির অন্তরালেঃ-

পুরান ঢাকার গর্বীত সন্তান শহীদ অহিউল্লাহর স্বরনে,পুরান ঢাকার লেখক ও গবেষক ফোরামের প্রতিবেদন।

বছর ঘুরে ফিরে আসে ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি। ৫২’র ভাষা আন্দোলন বাংলাদেশের বাঙালি জাতির ইতিহাসে ফেব্রুয়ারি একটি জ্বলজ্বলে আত্মত্যাগ, গৌরব ও সাহসের স্মারক বহনকারী মাস। বাংলা ভাষার জন্য সেই আত্মত্যাগে শহীদ হয়েছিলেন সর্বকনিষ্ঠ ভাষা শহীদ পুরান ঢাকার নবাবপুরের কিশোর অহিউল্লাহ।

দূর্ভাগ্যবশত প্রায় অর্ধ শতাব্দী এই ভাষা শহীদ অহিউল্লাহ ছিলেন সারা বাঙালি জাতি সহ পুরান ঢাকাবাসীর স্মৃতির অন্তরালে। রফিক, জব্বার, বরকত, সালাম, শফিউর প্রমুখ ভাষাশহীদ হিসেবে আমাদের স্মৃতিতে অক্ষয় অম্লান হয়ে আছে।

কিন্তুু সময়ের বিবর্তনে পুরান ঢাকার ভাষা শহীদ অহিউল্লাহ আমাদের স্মৃতি থেকে হারিয়ে গিয়েছিল। শুধু পুরান ঢাকার নবাবপুর এলাকা সহ আসেপাশের কয়েকটি এলাকার প্রবীণদের কাছে ভাষা শহীদ অহিউল্লাহ স্মৃতি অক্ষয় অম্লান হয়ে ছিল ভাষা আন্দোলনের পরবর্তী কয়েকবছর। ধীরে ধীরে এলাকাবাসী থেকে শুরু করে পুরো বাঙালি জাতির স্মৃতি থেকে আকাশের ক্ষয়ে যাওয়া তাঁরার মতো হারিয়ে গিয়েছিল পুরান ঢাকার ভাষা শহীদ অহিউল্লাহ।

লুৎফর রহমান রোডের স্হানীয় বাসিন্দা হাবিবুর রহমান ও আমেনা বেগমের তিন ছেলে, তিন মেয়ের মধ্যে ছিপছিপে গড়নের অহিউল্লাহ ছিল প্রচন্ড রকমের দুরন্ত প্রকৃতির। তার মাথাভর্তি ছিল ঝাঁকড়া চুল। তার শখ ছিল ছবি আঁকা। তার শার্টের বুক পকেটে সবসময় থাকতো ছবি আঁকার পেন্সিল আর সাদা কাগজ। অহিউল্লাহর পিতা তার সন্তানকে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন সমাজের প্রকৃত একজন মানুষ হিসেবে। তাই তিনি শত অভাবের সংসারেও ছেলেকে ভর্তি করিয়ে ছিলেন স্কুলে। সেসময় মাত্র তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল অহিউল্লাহ। দরিদ্র পিতার অনেক স্বপ্ন ছিল এই পুত্রকে ঘিরে। কিন্তুু ১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পিতার স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। পুত্র অহিউল্লাহ পুলিশের বুলেটে শহীদ হওয়ার পর লাশটিও পাননি তার পিতা।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে, ছাত্রসমাজ শুরু করে শান্তিপূর্ণ মিছিল। আর এ মিছিলে বিনা উসকানিতে নির্বিচারে গুলি চালায় পুলিশ। গুলিতে রফিক, জব্বার, বরকত ঘটনাস্থলেই শহীদ হন। গুরুতর আহত সালাম কে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। যদিও কিছুদিন পর সেও চলে যায় না ফেরার দেশে। ২১ তারিখের ঘটনার পর থেকেই পুরো ঢাকা শহরে থমথমে ও গুমোট পরিবেশ বিরাজ করেতে থাকে। শহরের সর্বত্র পুলিশ টহল বৃদ্ধি করা হয়। ভাষা আন্দোলনে কয়েকজন ছাত্র শহীদ হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো দেশে ছাত্র জনতা উত্তাল হয়ে ওঠে। দেশের সর্বত্র চলে মিছিল মিটিং সমাবেশ।
১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি সকালে সারাদেশ সহ পুরান ঢাকার নবাবপুর রোডে ও পুলিশের টহল চলছে। পুরো নবাবপুর রোড এলাকা সুনসান নীরবতা। লোকজনের মাঝে অজানা আতঙ্ক ভর করেছে। পারতপক্ষে কেউ বাড়িঘর থেকে বের হচ্ছেন না। মাঝে মাঝে দু-চারটা গাড়ি যাচ্ছে এদিক ওদিক। আকস্মিক সুনসান নীরব নবাবপুর এলাকা উত্তপ্ত হয়ে উঠে। বাংলা ভাষার দাবিতে আগের দিন পুলিশের গুলিতে হত্যার শিকার রফিক, জব্বার, বরকতদের স্মরণে শোক ও প্রতিবাদ মিছিল বের করেন ছাত্ররা। ছাত্রদের মিছিল আর স্লোগানে স্লোগানে নবাবপুর এলাকার আকাশ বাতাশ প্রকম্পিত হয়ে উঠছিল। পাকিস্তানি সরকারের পুলিশ ছাত্র জনতার সেই মিছিল প্রতিরোধের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ঠিক তখন ওই এলাকার মানসী সিনেমা হলের কাছে খোশমহল রেস্টুরেন্টের সামনে আনুমানিক ৯ বছর বয়সি একটি ছেলে দাঁড়িয়ে ছিল। তার সামনেই এসে থামে পুলিশের জীপ গাড়ি। তার যে ছিল ছবি আঁকার শখ ততক্ষণাৎ সে পকেট থেকে সাদা কাগজ আর পেন্সিল বের করে জীপ গাড়িতে বসা পুলিশদের ছবি আঁকার প্রস্তুতি নেয়। মাত্র ছবি আঁকা শুরু করেছে ছেলেটি এরই মধ্যে ছাত্রদের মিছিলটি জীপের ও অহিউল্লার কাছাকাছি চলে আসে। অবুঝ অহিউল্লাহ মিছিল দেখা মাত্র ছবি আঁকার কাগজ নিজের মুখে পুরে মিছিলে যোগ দেয়। মিছিলটি কয়েক হাত সামনে এগোতেই পুলিশ আকস্মিক গুলি ছুড়তে শুরু করে। গুলিতে শহিদ হন শফিউর রহমান, ২৬ বছর বয়সি আবদুল আউয়াল নামের একজন নিরীহ রিকশাচালক এবং ৯ বছর বয়সি অহিউল্লাহ নামের এই দুরন্ত ছেলেটি। ঘাতকের বুলেটে ৯ বছরের অহিউল্লাহর মাথার খুলি উড়ে যায়। এ অবস্থায় ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় মিছিলটি। ঘাতকরা তিনটি লাশই নিয়ে যায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। হাসপাতালে নেওয়ার সময় শহীদ অহিউল্লাহর পরিচয় নিশ্চিত হতে প্রচেষ্টা চলে। হাসপাতালে অহিউল্লাহর লাশটির প্রত্যক্ষদর্শী ডা. মেজর (অব.) মাহফুজ হাসান লাশের বুক পকেটে প্রজাপতি, ফুল, পাখি, জীবজন্তু আঁকা কিছু কাগজ পান। তিনি প্রথমে শিশুটির নাম জানতে পারেন শফিউল্লাহ। কিন্তুু ঘণ্টা দুয়েক পর নিশ্চিত হওয়া যায় নিহত ওই শিশুটির নাম শফিউল্লাহ নয়, তার নাম অহিউল্লাহ। নাম নিশ্চিত হওয়ার পর শিশুটির পিতা মোঃ হাবিবুর রহমানকে পুরান ঢাকার নবাবপুর এলাকা থেকে খবর দিয়ে আনা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। তিনি নিজের ছেলের হাতে আঁকা ছবিগুলে দেখে তার ছেলে অহিউল্লাহর লাশ শনাক্ত করেন। অহিউল্লাহর পিতা হাবিবুর রহমান নিজ ছেলের লাশ নিতে চাইলেও পুলিশ অহিউল্লাহার লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেনি। ছেলে অহিউল্লাহ পুলিশের বুলেটে শহিদ হওয়ার পর লাশটিও পাননি দরিদ্র পিতা। অহিউল্লাহর লাশ পুলিশ সেদিনই রাতের অন্ধকারে অত্যন্ত গোপনে আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করে। অহিউল্লাহ এর পরিবার কখনোই জানতে পারেনি তাদের ৯ বছরের একমাত্র সন্তানের মরদেহ আজিমপুর কবরস্থানের কোথায় দাফন করা হয়েছে। পিতার অনেক স্বপ্ন ছিল একমাত্র ছেলেকে ঘিরে। ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সালে পিতার স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়।

এর পর সময় বয়ে যায় সময়ের গতিতে। ১৯৫২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি সর্বপ্রথম ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকায় শহীদ অহিউল্লাহর মৃত্যুর ঘটনাটি প্রকাশিত হয়েছিল। সর্বশেষ ভাষা আন্দোলনের দুই বছর পর ১৯৫৪ সালের মার্চে ভাষা আন্দোলনের মুখপত্র হিসেবে প্রকাশিত হয় ‘সৈনিক’ নামের একটি পত্রিকা। ওই পত্রিকায় ভাষা শহীদদের তালিকায় অহিউল্লাহর নাম ছিল। এরপর পেরিয়ে যেতে থাকে দিন মাস বছর।

ভাষা আন্দোলনের প্রায় অর্ধ শতাব্দীর পর অর্থাৎ ৫৪ বছর পর ২০০৬ সালে ঢাকাইয়া ভাষা শহীদ অহিউল্লাহ বিষয়ক কিছু লেখা নজরে পড়ে ভাষা গবেষণা কেন্দ্র ও জাদুঘরের ট্রাস্টি এম আর মাহবুবের। মাঝে এতটা বছর বাঙালির ইতিহাস থেকে মন মস্তিষ্ক থেকে অন্তরালে চলে গিয়েছে অহিউল্লাহ নামক পুরান ঢাকার সর্বকনিষ্ঠ ভাষা শহীদ। এম আর মাহবুব বিভিন্নভাবে ভাষা শহিদ অহিউল্লাহ সম্পর্কে নানা তথ্য সংগ্রহ করেন। অনেক চেষ্টা করেও তিনি ভাষাশহিদ অহিউল্লাহর কোনো ছবি সংগ্রহ করতে পারলেন না। এম আর মাহবুব ঢাকা সিটি করপোরেশনের আজিমপুর কবরস্থানের নথিপত্র ঘেঁটে পেয়ে গেলেন অহিউল্লাহর নাম এবং শহিদ হওয়ার তারিখ। কিন্তুু অনেক চেষ্টা করেও কবরস্থানের ঠিক কোথায় তার কবর, তা চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি তার পক্ষেও। অহিউল্লাহর কবর চিহ্নিত করতে না পারলেও তার একটি ছবি ইতিহাসের পাতায় থাকা প্রয়োজন বলে মনে করলেন এম আর মাহবুব। অহিউল্লাহর বাড়িতে তার কোনো ছবি বা স্মৃতিচিহ্ন নেই। ফলে তার ছবি আঁকার বিষয়টি তিনি অধিক গুরুত্বের সঙ্গে নিলেন। এ ব্যাপারে তিনি দায়িত্ব দিলেন প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী শ্যামল বিশ্বাসকে। চিত্রশিল্পী শ্যামল বিশ্বাস ওই বছরই ভাষাশহিদ অহিউল্লাহর পরিবারের লোকজন, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী প্রবীণদের কাছে অহিউল্লাহর শারীরিক বর্ণনা শুনে ছবি আঁকার কাজ শুরু করেন। ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ভাষাশহিদ অহিউল্লাহর ছবি আঁকার কাজ শেষ করেন চিত্রশিল্পী শ্যামল বিশ্বাস।

আমাদের মাতৃভাষা বাংলার জন্য ভাষা শহীদ হিসেবে রফিক, জব্বার, সালাম, বরকত, শফিউরদের নাম সর্বত্র উচ্চারিত হয়। প্রতিবছর তাদের স্মরণ করেন পুরো বিশ্বের বাংলা ভাষাভাষী। কিন্তুু পুরান ঢাকার ভাষা শহীদ অহিউল্লাহ হারিয়ে গেছেন বিস্মৃতির আড়ালে।
অন্যান্য ভাষা শহীদদের পাশাপাশি পুরান ঢাকার ভাষা শহীদ অহিউল্লাহকে ও স্মরণ করতে হবে আমাদের। এইজন্য পুরান ঢাকার মানুষকে একত্রিত হয়ে অহিউল্লাহকে জাতিয়ভাবে ভাষা শহীদের মর্যাদা দেয়ার জন্য সরকারের কাছে জোর দাবী জানাতে হবে।

পুরান ঢাকার লেখক ও গবেষক ফোরাম.
প্রতিবেদনের আংশিক তথ্য -শহীদ অহিউল্লাহর পারিবারিক সদস্যদের কাছথেকে সংগ্রহীত।
প্রবন্ধটির সর্বসত্ব পুরান ঢাকার লেখক ও গবেষক ফোরাম গ্রুপ কর্তৃক সংরক্ষিত।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button