রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্র নিয়ে হতাশ রোকেয়া প্রেমীরা

আব্দুর রহমান রাসেল,রংপুর ব্যুরো: বাঙালির আধুনিক যুগের ইতিহাসে যে নারীর নাম গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হয় তিনি বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলায় ১৯৮০ সালের ৯ই ডিসেম্বর জন্ম নেয়া সেই নারী পরবর্তীতে হয়েছিলেন বাংলার মুসলিম নারী জাগরণের অন্যতম একজন পথিকৃৎ। সেই মহিয়সি নারীর জন্মস্থান পায়রাবন্দ আজও হতাশায় ডুবছেন। রোকেয়ার জন্ম ও মৃত্যু দিবস আসলে শুধুই সজ্জিত নয় কোলকাতা থেকে তার মরদেহ আনার দাবিসহ সারা দেশে জাতীয়ভাবে দিবস পালন করা ও পরবর্তী প্রজন্মের জন্য স্থায়ীভাবে স্মৃতি কেন্দ্র ও গবেষণা কেন্দ্রের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন চায় এ অঞ্চলের মানুষ।
বেগম রোকেয়া উপ-মহাদেশের নারী সমাজকে কু-সংস্কারের দেয়াল ছেদ করে গৃহবন্দী নারীদের হাতে তুলে দিয়েছিল আলোর মশাল। সেই মহীয়সী নারীর মৃত্যুর ৯০তম বছরেও স্মৃতিবিজড়িত জন্মস্থান আজও অন্ধকারে। অবহেলা আর উদ্যোগহীনতার কারণে এখানে রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্র ও পর্যটন এবং গবেষনা কেন্দ্রের দ্বার এখনও অনেকটা আলো রুদ্ধ। মরদেহ ফিরিয়ে আনার দাবি যেন এখন আশ্বাসে সীমাবদ্ধ।
নারী বৈসম্য দূর করতে রোকেয়ার দর্শণ সমাজের সর্বাঙ্গনে তুলে ধরা দরকার। সাথে দর্শনার্থীদের জন্য রোকেয়া স্মৃতিবিজড়িত জন্মস্থানকে আরও আধুনিকায়ন করার দাবি দর্শনার্থীদের।
রোকেয়া শুধু বাংলাদেশের সম্পদ নয় বরং বৈশ্বিক সম্পদ। তাই তার সমাধি রংপুরে স্থান্তর করাসহ তার জন্মস্থানের বেদখল সম্পত্তি পূনরূদ্ধারের দাবি স্থানীয়দের।

জমিদার পরিবারে জন্ম নিয়েও নারী জাতিকে খানম-আর বেগম থেকে বের করে শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে পথের দিশা দিল যিনি তাকেই বেগমের ঘোমটা পড়ে পরিচিত করে রেখেছে বাঙ্গালি জাতী। অথচ তিনি কখনো নিজে বেগম শব্দ ব্যবহার করতেন না।
আজ ৯ ডিসেম্বর বেগম রোকেয়া দিবস। নানা আয়োজনে রোকেয়ার জন্মভূমিতে উদযাপিত হয় দিবসটি। এজন্য কয়েক দিন ধরে চলে নানা কর্মযজ্ঞ। এখানে রোকেয়ার নামে স্মৃতি কেন্দ্র হলেও স্মৃতি বিজড়িত কিছু না থাকায় হতাশ এখানে ঘুরতে আসা মানুষজন। স্থানীয় সহ রোকেয়া অনুরাগীদের দাবি রোকেয়ার ব্যবহারকৃত সকল কিছুই যেন স্থান পায় এখানে।
নারীরা যখন অবরোধবাসিনী, সেই সময় নারীর পরাধীনতার বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছিলেন বেগম রোকেয়া। এই উপমহাদেশে মুসলিম নারীর যে অগ্রগতি তা অর্জনে রোকেয়ার দর্শন ও কর্মময় জীবন অন্তহীন প্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করেছে। তার দেখানো পথে হেঁটে নারীরা আজ দেশের শীর্ষ পদ দখল করলেও পথপ্রদর্শকের জন্মস্থান রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দে নির্মিত স্মৃতিকেন্দ্রটি একটি ভবনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তাই দিনে দিনে ক্ষোভ বাড়ছে রোকেয়াপ্রেমী ও স্থানীয়দের মাঝে।
আজ বৃহস্পতিবার সরেজমিনে মিঠাপুকুরের পায়রাবন্দে গিয়ে দেখা যায়, রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্র ঘুরতে এসে শিক্ষণীয় বা রোকেয়া সম্পর্কিত তেমন কিছু দেখতে না পেয়ে হতাশ রোকেয়াপ্রেমীরা।
অন্যদিকে সংরক্ষণের অভাবে রোকেয়ার জন্মস্থানের ধ্বংসাবশেষ ক্রমেই মাটির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। একটি জানালা ও কয়েকটি পিলার এখন পর্যন্ত মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। রোকেয়া কেন্দ্রের জমি নিয়েও চলছে বিরোধ। সমাধানের জোরালো কোন উদ্যোগ নেই।
বেগম রোকেয়ার মরদেহ ভারত থেকে আনার দাবী দীর্ঘদিনের। স্থানীয়সহ রোকেয়া প্রেমীদের প্রত্যাশা যেন রোকেয়ার মরদেহ ভারত থেকে নিয়ে এসে পায়রাবন্দের মাটিতে সমাহিত করা হয়। এ দাবী যেন জেলা প্রশাসন, পরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় এবং সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে ফাইল চালাচালির মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
তিন একর ১৫ শতক জমির ওপর নির্মিত স্মৃতি কেন্দ্রটি ঘুরে দেখা যায় বেশির ভাগ রুমের জানালার কাচ ভাঙ্গা। অনেক রুমের দেয়ালে পড়ে আছে শেওলা। সেই সঙ্গে ধুলোয় মোরানো রুমের ভেতরের জিনিসপত্র এবং আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন উপকরণ নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। করোনাকালীন ২ বছর তিনদিনব্যাপী আয়োজন বন্ধ থাকলেও এবারে তিনদিনব্যাপী রোকেয়া দিবসের অনুষ্ঠান থাকছে। যার কারনে কয়েকদিন থেকে পরিস্কার পরিছন্ন ও ধোঁয়া মোছা এবং প্রবেশ পথে সংস্কারের কাজও চলছে পুরোদমে।
জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে ১৯৯৭ সালের ২৮ জুন ৩ একর ১৫ শতক জমির উপর রোকেয়ার বসতভিটা রংপুরের পায়রাবন্দে বেগম রোকেয়া গবেষণা ও স্মৃতিকেন্দ্রের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন এবং ২০০১ সালে ১ জুলাই স্মৃতি কেন্দ্রটি উদ্বোধন করেন।
প্রথমে স্মৃতি কেন্দ্রটি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকলেও ২০০৪ সালের ৪ অক্টোবর স্মৃতি কেন্দ্রটির দায়িত্ব নেয় বাংলা একাডেমি। স্মৃতি কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিলো বেগম রোকেয়ার জীবন ও কর্ম সম্পর্কে গবেষণা, তার গ্রন্থাবলির অনুবাদ, প্রচার ও প্রকাশনা, সংস্কৃতি চর্চা এবং স্থানীয় তরুণ তরুণীদের নানা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া। মাঝে চারদলীয় জোট ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অবহেলা আর ভ্রান্তনীতির কারণে এর প্রাণ সঞ্চার হয়নি।
উল্টো ২০০৮ সালে তৎকালীন তত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বেগম রোকেয়ার স্মৃতি কেন্দ্রটি মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে হস্তান্তর করা হয়। ওই বছরের ১৭ মার্চ অলিখিতভাবে স্মৃতি কেন্দ্রটি বিকেএমইর শ্রমিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের জন্য অনুমতি প্রদান করা হয়। শুরু হয় সেখানে পোশাক শ্রমিক তৈরীর প্রশিক্ষণ। এর উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন সেনাপ্রধান মঈন উ আহমেদ।
স্মৃতি কেন্দ্রটির মুল উদ্দেশ্য ব্যহত করে সেখানে পোশাক শ্রমিক তৈরীর প্রশিক্ষণ বন্ধ এবং বিকেএমইকে উচ্ছেদ করার জন্য পায়রাবন্দ স্মৃতি সংসদের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম দুলাল ২০১২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টে রিট করেন। প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট বেগম রোকেয়ার স্মৃতি কেন্দ্রের মর্যাদা অক্ষুন্ন রেখে নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং শ্রমিক তৈরীর কারখানা বন্ধের আদেশ দিলে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন ২০১২ সালের ১ মে বিকেএমইএকে উচ্ছেদ করে।
বেগম রোকেয়া বিশ^বিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন,রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্র এবং বেগম রোকেয়া বিশ^বিদ্যালয়কে একিভুত করে নারীদের নিয়ে অতিত বর্তমান, সংকট, সম্ভাবনা নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা কেন্দ্র হতে পারে, সেই সাথে বিশ^বিদ্যালয়ে রোকেয়া স্ট্যাডিজ বাধ্যতামুলক করা দরকার। না হলে রোকেয়ার শিক্ষা অসম্পুর্ণ থেকে যাবে।
পায়রাবন্দ রোকেয়া স্মৃতি সংসদের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম দুলাল বলেন, ৯ ডিসেম্বর এলে ঘষামাজার কাজ শুরু হয়, নানা আয়োজন হয় রোকেয়াকে নিয়ে কিন্তু ১১ ডিসেম্বরের পর আবারো রোকেয়া ১ বছরের জন্য হারিয়ে যায়। রোকেয়া যেন হারিয়ে না যায় এজন্য বেগম রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্রটি পুরোপুরি চালু রাখা, রোকেয়ার নামে হাসপাতালটি চালু করা এবং রোকেয়ার নামে স্কুল কলেজগুলো সরকারীকরণ করা। তাহলে রোকেয়া সম্পর্কে মানুষ জানতে পারবে এবং স্মৃতি কেন্দ্রে ঘুরতে আসলে মানুষ অনেক কিছু শিখতে পারবে।
ঘুরতে আসা দর্শনার্থী মনিরা পারভীন বলেন, ‘নারী জাগরণের অগ্রদূত রোকেয়ার স্মৃতিকেন্দ্রে রোকেয়ার একটি ভাস্কর্য ছাড়া দেখার কিছুই নেই। এখানকার লাইব্রেরিতে রোকেয়া সম্পর্কিত পর্যাপ্ত বইও নেই। রোকেয়াকে নিয়ে জানার তেমন কিছুই নাই।
পীরগাছা থেকে আসা আতিকুর রহমান জানান, ‘পায়রাবন্দে রোকেয়াকে জানার যে আগ্রহ,প্রত্যাশা নিয়ে মানুষ ছুটে যায়, সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্রটি আরও সৃজনশীলভাবে গড়ে তুলতে হবে। সেই সঙ্গে জন্মভিটার ধ্বংসাবশেষ সংরক্ষণ করতে হবে। রোকেয়ার দেহবশেষ ভারত থেকে নিয়ে আসতে হবে এবং বেদখলে থাকা রোকেয়া পৈত্রিক জমি উদ্ধার করতে হবে।’
মিঠাপুকুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাতেমাতুজ্জোহরা জানান, করোনাকালীন রোকেয়া দিবসকে ঘিরে ৩ দিনব্যাপী আয়োজন বন্ধ ছিলো, সেটি এবারে চালু করা হয়েছে, রোকেয়ার মরদেহ ভারত থেকে আনার ব্যাপারে কার্যক্রম চালু রয়েছে। এছাড়া বেদখল জমি ফিরিয়ে নিতে আপিল করা হয়েছে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি এসব বিষয়ে।
বেগম রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্রের উপ-পরিচালক আব্দুল্যাহ আল ফারুক বলেন, প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে নানা প্রতিকূলতা গিয়েছে। এখন স্মৃতি কেন্দ্রটি সমৃদ্ধ করতে আমরা উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। কয়েকটি প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায়। সেগুলো পাশ হয়ে এলে এবং কার্যক্রম শুরু হলে আলোর মুখ দেখবে স্মৃতি কেন্দ্রটি।’
এদিকে নবাগত জেলা প্রশাসক ড. চিত্রলেখা নাজনীন প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন,রক্ষনাবেক্ষণ কিংবা বিভিন্ন দিকগুলো বাস্তবতার আলোকে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে এ বিষয়ে আমার সর্বোচ্চ আন্তরিকতা থাকবে।




