
শাহীন রাজা : রাত অনেক। আশপাশ নিঃশব্দ। ঠিক তখনই দরজার কাছাকাছি ভারী জুতোর। দরজায় বিশ্রী কড়া নাড়া। শুনশান নীরবতায় অন্তিম ভয় এসে ভর করে। বাড়ির বয়স্করা ডুকরে ওঠে ছেলেটাকে বুঝি আর বাঁচানো গেল না। ঘটনাটি ইরানের শাহ্-এর আমলের নিয়মিত বিষয়। শাহ্’র লোকেরা ভিন্ন মতাবলম্বী বিশেষ করে বিপ্লবী ‘ তুদে ‘ পার্টির সদস্যদের রাতে আঁধারে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যেতো। যাদের তুলে নেয়া হতো, তাদের আর কখনোই ঘরে ফেরা হয়নি। শাহ্’র বিশেষ বাহিনী এই কাজে জড়িত ছিল। এই একমাত্র কারণেই ইরানের জনগণ শাহ্’কে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছিল।
চল্লিশ বছর আগের কাহিনী আবারও ইরানে ফিরে এসেছে। সম্প্রতি ইরানের ভিন্ন মতাবলম্বীদের এভাবেই উঠিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
একসময় শাহ্ ‘তুদে’ পার্টির আতঙ্কে ভুগতেন। এখন পশ্চিমা সাংস্কৃতির ভয়ে আতঙ্কিত। শাহ্ বিপ্লবীদের সকল প্রকার কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করেছিলেন। এখন ইরানে ‘ফেসবুক ‘ ‘ হোয়াটসঅ্যাপ ‘ ‘ ইউটিউব ‘ এবং ‘ টুইটার ‘ ব্যবহার বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এর ‘ডিস’ ব্যবহারও সীমারেখা টানা হয়। শুধুমাত্র সরকার অনুমোদিত চ্যানেল দেখা যাবে। বাইরের বাতাস আটকাতে জানালা বন্ধ নীতি গ্রহণ করে শাহ্’কে বিদায় নিতে হয়েছিল। বর্তমান সরকার ব্যবস্থার কি হয় তা সময়ই বলে দেবে ?
ইরানের গত একশো বছরের ইতিহাস হলো, ১৯২১ থেকে ১৯৪১ পর্যন্ত ‘রেজা শাহ্ পাহলভী’ রাজা হিসেবে ইরানে রাজত্ব করেন। তাঁর রাজত্বকালে ইরানকে পশ্চিমা সাংস্কৃতিক ধারায় গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। এসময় তিনি নগর উন্নয়নে বেশ কিছু সংস্কার করেন। কিন্ত এসময় দ্বিতীয় যুদ্ধের দামামা শুরু হয়ে যায়। মিত্রবাহিনীর সদস্য দেশ রাশিয়া এবং যুক্তরাজ্যের সেনাবাহিনী ইরানের ভার হাতে তুলে নেয়। যুদ্ধ শেষে ইরানের রাজা শাহ্-এর সাথে সখ্যতা গড়ে ওঠে। এটা পশ্চিমা শক্তি মেনে নিতে পারেনি। তাই যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্য যৌথ উদ্যোগে শাহ্-কে উৎখাত করে। এসময় সংসদীয় শাসন ব্যবস্থা চালু করা হয়।
‘ শাহ্ রেজা পাহলবী ‘র স্থলে তাঁর ছেলে ‘ মুহাম্মাদ রেজা শাহ্ পাহলভী ‘ স্থলাভিষিক্ত হন। নতুন শাহ্ স্থলাভিষিক্ত হওয়ার পর থেকেই ইরানের পার্লামেন্টের সদস্য বিশেষ প্রধানমন্ত্রী মুহাম্মদ মোসাদ্দেকের সাথে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। একসময় যুক্তরাষ্ট্রের সংস্থা সিআইএ এবং যুক্তরাজ্যের সংস্থা এমআই-সিক্স যৌথ উদ্যোগে ইরানে প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত মুহাম্মদ মোসাদ্দেককে উৎখাত করে। এর মধ্য দিয়ে নতুন শাহ্-এর ক্ষমতা নিরঙ্কুশ এবং শক্তিশালী হয়ে ওঠে। কৃতজ্ঞতা সরূপ নতুন শাহ্ আমেরিকার সাথে বন্ধুত্বের গাঁটছড়া বাঁধেন। আর আমেরিকার উপর সম্পুর্ন নির্ভরশীল হয়ে পড়ে
ইরানের শাহ্ একক ক্ষমতাবলে দেশটির শাসন কার্য চালিয়ে যাচ্ছিলেন। প্রতিবন্ধকতা হয়ে দেখা দেয় ১৯৭০ সালে জ্বালানি তেলের বাজারে ভারসাম্য নষ্ট হওয়ায়। ইরানের আর্থিক অবস্থায় মন্দাভাব দেখা দেয়। পরিস্থিতি উপলব্ধি করে তিনি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের বিকল্প ‘ শ্বেত বিপ্লব ‘ কর্মসূচি গ্রহণ করেন। এবং সীমিত পর্যায়ে গণতান্ত্রিক রাজনীতির অনুমতি দেন। শ্বেত বিপ্লবের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সবটাই নগরকেন্দ্রিক ছিল। নগরের বাইরে গ্রামীণ জনপদ এর বাইরে থেকে যায়। একারণে নগর এবং গ্রামীণ সাংস্কৃতি ভিন্ন গড়ে ওঠে। পরষ্পরের প্রতি ঘৃণা নিয়ে ইরান এগুতে থাকে।
এর ফলে, গ্রামীণ জনগণ দিন দিন শাহ্’র উপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। শাহ্ এটা উপলব্ধি করে ভূমি সংষ্কারের উদ্যোগ নেন। কিন্তু ধর্মীয় নেতাদের বিরোধিতার কারণে এই উদ্যোগ থেকে সড়ে আসেন। ধর্মীয় নেতাদের বিরোধিতার অন্যতম কারণ ছিল, ভূমির অধিকাংশই তাদের দখলে ছিল। গ্রামের আর্থিক অসচ্ছলতা এবং ক্ষুধার যন্ত্রণায় দলে দলে শহরমুখী হয়ে ওঠে। তুদে পার্টির কার্যক্রমও দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। তুদে পার্টি নিয়ন্ত্রণ করতে যেয়ে শাহ্ সারাদেশে নিপিড়ন চালাতে থাকে। একদিকে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর আর্থিক অসচ্ছলতা এবং শাহ্’র দানবীয় রাষ্ট্র শাসন গোটা দেশের জনগণ তাঁর বিরুদ্ধে চলে যায়। ঠিক এমন সময় ইরানের ধর্মীয় নেতা ” আয়াতুল্লাহ রুহুল্লা খোমেনি ” শাহ্’কে উৎখাতের ডাক দেয়। ঐ সময় ইরানে প্রচুর মাদ্রাসা ছিল। মাদ্রাসার শিক্ষার্থী এবং গ্রাম থেকে আসা জনগণ শাহ্ বিরোধী আন্দোলনে বিশাল ভুমিকা রাখে। ইরানের সকল দল এমনকি সুশীল সমাজের প্রতিনিধির খোমেনিকে সমর্থন দেয়। অবশেষে ১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারী ‘ মুহাম্মদ রেজা শাহ্ পাহলভী ‘ ইরান ত্যাগে বাধ্য হন।
চল্লিশ বছর পর আবারো ইরান একই পথে চলছে। জানালা বন্ধ নীতি ইরানের জনগণ আর মানতে চাইছে না। জনগণ বুক ভরে মুক্ত বাতাস নিতে উন্মুক্ত হয়ে উঠেছে। তারা আর কোন পরাভব মানতে চাইছে না। মেয়েরা হিজাব থেকে মুক্ত হয়ে খোলা আকাশে পাখা মেলতে চায়।
এদিকে দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে। ইরানের প্রধান আয় জ্বালানি তেল, গ্যাস এবং বিদ্যুৎ রপ্তানি দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা থাকার কারণে ইউরোপীয় এবং এশিয়ার প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলো ইরানে বিনিয়োগে অনিহা দেখায়।
দূর্নীতিও ইরানে ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় দেশের সর্বত্রই দূর্নীতিগ্রস্থ। টিআইবির পরিসংখ্যানে বিশ্বের ১৮০টি দেশের মধ্যে ইরানের অবস্থান ১৪৯। ইরানের ‘ পার্লামেন্ট রিসার্চ সেন্টার ‘ এর সমীক্ষায় বলা হয়, ইরানে ব্যাঙ্ক সঞ্চয়ী হিসাব অনুযায়ী প্রতিবছর আট বিলিয়ন ডলার মুনাফা দেয়া হয়। এর ৮৫ শতাংশ লাভ কার ২.৫ শতাংশ লোক। ঐ সমীক্ষায় আরো বলা হয়েছে, ৩০ শতাংশ লোক দারিদ্র্য সীমার নীচে মানবেতর জীবন যাপন করে। একই প্রতিষ্ঠানের ২০২০ এর হিসেবে, মধ্যবিত্ত শ্রেণি ৭৮ শতাংশ দারিদ্র্য সীমায় বসবাস। জ্বালানি তেল সমৃদ্ধ দেশ ইরানে এখন একজন সাধারণ কর্মজীবীর আয় ১০০ থেকে ১৫০ ডলার। যা দিয়ে বর্তমান জীবন খুবই কষ্টকর। যে জীবন ইরানের মেয়েদের কাছ থেকে নিয়ে গেছে সকল শৌখিনতা।
করোনা পরবর্তীতে রাশিয়া – ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন ঢেউ এনেছে। যা ইরানের জনপদেও আঘাত এনেছে। হিজাব ইস্যু এই ঢেউয়ে নতুন গতির সঞ্চার ঘটিয়েছে। এই ঢেউ কতবড় বা ব্যাপক তা সময়ই বলে দেবে।




