
রাজধানী ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ১২৯টি ওয়ার্ডে খেলার মাঠ রয়েছে ২৩৫টি। সিটি করপোরেশনের মালিকানার বাইরে আরো কিছু খেলার মাঠ আছে। কিন্তু এসব মাঠগুলোর বাস্তব অবস্থা কী?
সিটি করপোরেশনের এই মাঠগুলোর মাত্র ৪২টি মাঠ সাধারণ মানুষ ব্যবহার করতে পারেন। বাকিগুলো নানাভাবে দখল হয়ে আছে। শতকরা হিসেবে মাত্র ১৮ ভাগ মাঠ সাধারণ মানুষ ব্যবহার করতে পারেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দখলে আছে ৬০ ভাগ। আর সরাসরি সরকারের দখলে আছে সাত ভাগ। তবে সিটি করপোরেশনের মালিকানার বাইরের মাঠগুলো ধরলে সর্বোচ্চ ৩০ ভাগ মাঠ এখনো দখলমুক্ত আছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাধারণ সম্পাদক, নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মোহাম্মদ খান। কিন্তু সেই মাঠগুলোর সবগুলোতে সাধারণ মানুষ যেতে পারেন না।
মাঠ দখলের করুণ গল্প
দখল করা মাঠে নানা স্থাপনা, ক্লাব, মার্কেট এমনকি হাটবাজার পর্যন্ত গড়ে উঠেছে। পুরান ঢাকায় সিটি করপোরেশনের ধূপখোলা মাঠটি এখন বন্ধ। সেখানে মার্কেট করছে সিটি করপোরেশন নিজেই। তবে খোলা কিছু জায়গা রাখা হয়েছে মাঠের নামে। কিন্তু মার্কেট উঠে গেলে মাঠের বাকি অংশের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়তে পারে।
শ্যামলী ক্লাবের মাঠে বসানো হয়েছে কাঁচাবাজার, ইরাকি খেলার মাঠেও কাঁচাবাজার বসানো হয়েছে। মিরপুরে হারুন মোল্লা ঈদগাহ আগে ছিল খেলার মাঠ, এখন সেটা দখল করে পাইকারি পণ্যের আড়ৎ হিসেবে ভাড়া দেয়া হয়েছে। লালমাটিয়া বি ব্লকের নিউ কলোনি মাঠে অস্থায়ী দোকান বসানো হয়েছে। যেটুকু ফাঁকা জায়গা আছে তা শুক্রবারে আবার গাড়িবাজার হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
এছাড়াও জেনেভা ক্যাম্প এবং করাইল বস্তির কাছে নবীন সংঘ খেলার মাঠ ও টিঅ্যান্ডটি খেলার মাঠ উভয়ই মাদকাসক্ত ও মাদকদ্রব্য বিক্রেতাদের দখলে। শহীদ পার্ক খেলার মাঠে আসবাবপত্র বিক্রি হয়। রায়েরবাজার বৈশাখী খেলার মাঠ ঢাকা পড়েছে ময়লা আবর্জনায়।
ঢাকার উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৬ নম্বর ওয়ার্ড খেলাঘর মাঠের জামি সরকার অধিগ্রহণ করছে। বনানী খেলার মাঠ এবং বনানীর চেয়ারম্যানবাড়ি মাঠকে বাঁশের কাঠামো দিয়ে দোকান ও পার্টিকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এরকম আরো অনেক মাঠ দখল এবং মাঠের করুণ মৃত্যুর গল্প আছে ঢাকা শহরে। কোথাও কোথাও মেলার নামে ব্যবসাকেন্দ্রও করা হয়েছে।
নতুন কৌশল
স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন বলেন, মাঠ দখল করে সরাসরি মার্কেট বা স্থাপনা নির্মাণ ছাড়াও ক্লাবের নামে মাঠ দখলের নতুন কৌশল শুরু হয়েছে। মাঠ ঠিকই আছে, কিন্তু সেটা কোনো ক্লাবের নাম দিয়ে প্রকারান্তরে দখল করা হয়েছে। সাধারণ মানুষ আর সেই মাঠে যেতে পারেন না। তিনি উদাহরণ হিসেবে ধানমন্ডি মাঠকে শেখ জামাল ক্লাবমাঠে রূপান্তরের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘এই মাঠটিতে এখন আর সাধারণ মানুষ প্রবেশ করতে পারে না। আমি উচ্চ আদালতে রিট করে পক্ষে রায় পেয়েও সেটা বন্ধ করতে পারিনি। আদালত অবমাননার অভিযোগ নিয়ে গিয়েছিলাম, বিচারকেরা বিব্রত হয়েছেন।’
তিনি জানান, এই সময়ের আলোচিত তেঁতুলতলা মাঠকে ডিটেইল এরিয়া প্ল্যানে মাঠ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার একমাত্র মাঠ। ১৯৮০ সালে এখানে সরকার শিশুপার্ক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু এখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন এটা মাঠ নয়, পতিত জমি ছিল। সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা যদি একের পর এক মাঠ নিয়ে এরকম কাজ করেন, তাহলে মাঠ রক্ষা পাবে কিভাবে?
আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, এই মাঠ দখল প্রক্রিয়ায় সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক ক্ষমতাবান ব্যক্তি, পেশীশক্তির অধিকারীরা জড়িত। আছেন জনপ্রতিনিধিরাও।
তিনি বলেন, ধূপখোলা মাঠে সিটি করপোরেশন নিজেই মার্কেট বানাচ্ছে। ধানমন্ডিতে চারটি মাঠ, কিন্তু কোনো মাঠেই সাধারণের প্রবেশাধিকার নেই। আট নম্বর মাঠে সাধারণের প্রবেশের কোনো সুযোগ নেই। কলাবাগান মাঠে নিয়ন্ত্রণ আছে। আবাহনীসহ দুটি মাঠে প্রবেশ নিয়ন্ত্রিত। তাহলে সাধারণের জন্য কোনো মাঠ নেই। ধানমন্ডি পরিকল্পিত একটি আবাসিক এলাকা। সেখানকার চারটি মাঠই এখন দখল হয়ে গেছে। আমি ওই এলাকার বাসিন্দা হিসেবে কাউন্সিলরের কাছে গিয়েছিলাম। তিনি মাঠগুলোতে জনসাধারণের প্রবেশের ব্যবস্থা করবেন বলেছিলেন, কিন্তু করতে পারেননি। আট নম্বর মাঠ আদালতের নির্দেশে কিছুদিনের জন্য খুলে দেয়া হয়েছিল। পরে আবার বন্ধ করে দেয়া হয়।
তিনি আরো বলেন, ‘যদি খেয়াল করেন, দেখবেন, ধানমন্ডির চারটি মাঠের সাথেই বড় বড় রাজনৈতিক নেতা জড়িত। সাধারণ মানুষ তাই অসহায়। তেঁতুলতলা মাঠের ঘটনা থেকেই বোঝা যায় মাঠ কারা দখল করে।’
আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, ‘দুই ধরনের লোক মাঠ দখল করছেন। রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী এবং আর্থিক ও পেশীশক্তির অধিকারী যারা, তারা। আর বড় দখল দেখে ছোট দখলদারেরা উৎসাহিত হয়। বিভিন্ন এলাকায় মাঠ দখল করে মার্কেট, বাজার, কাঁচাবাজার স্থাপনের পিছনে স্থানীয় রাজনৈতিক ও পেশীশক্তি এবং তাদের পেছনে আরো বড় শক্তি আছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সভাপতি ড. মোহাম্মদ আবদুল মতিন বলেন, ‘ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উল্টো দিকের পার্কটি এখন বলতে গেলে বন্ধ। ওখানে উন্নয়ন করা হয়েছিল। লোকজনের বসার ও হাঁটার জায়গা করা হয়েছে। এখন নাকি সেখানে আন্ডারগ্রাউন্ড পার্কিং করা হবে। তার উপরে মাঠ হবে। সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের নাকি গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গা নেই, তাই এসব উদ্যোগ। আমি বুঝি না কিভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।’
তিনি বলেন, কিছু ঘটনা বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায় কারা মাঠ দখল করে। এটা একটা চক্র; এখানে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠানও আছে। তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতাসহ নানা ধরনের ক্ষমতা আছে।
বাপার সভাপতি আরো বলেন, ঢাকা শহরের চারপাশ হাউজিং কোম্পানিগুলোকে দিয়ে দেয়া হচ্ছে। জলাধার, নদী– এসব ভরাট করে তারা ভবন নির্মাণ করছে। সাধারণ মানুষের ক্ষতি করে তাদের হাতে ধরে ধনী বানানো হচ্ছে।
শিশুরা কোথায় যাবে?
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ রয়েছে রাজধানীর প্রতিটি ওয়ার্ডে দুটি করে মাঠ থাকতে হবে। কিন্তু কাগজে-কলমেও ঢাকার ৪১টি ওয়ার্ডে কোনো মাঠ নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, শহরে প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য ৯ বর্গমিটার খোলা জায়গা দরকার। কিন্তু ঢাকা শহরে আছে এক বর্গমিটারেরও কম।
আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, এই শহরের নাগরিকদের কথা না ভেবে খোলা জায়গাগুলো দখল করা হচ্ছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুরা। তারা সঠিকভাবে বেড়ে উঠতে পারবে না।
মোবাশ্বের হোসেন বলেন, যার ফলে আমরা ভবিষ্যতে একটি হৃদয়হীন ও অসামজিক প্রজন্ম পাবো। যাদের দুনিয়া হবে টিভি ও মেবাইল ফোন। তারা বাস্তব দুনিয়া চিনবে না।
আর আব্দুল মতিন বলেন, খোলা মাঠ আর সবুজ না থাকলে এক সময় জীবনও থাকবে না।
সূত্র : ডয়েচে ভেলে



